থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রতি কিছু পরামর্শ

ছবি: সংগৃহীত

থ্যালাসেমিয়া একধরনের রক্তশূন্যতা, যা বংশগতভাবে বিস্তার লাভ করে। থ্যালাসেমিয়ায় স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরির হার কমে যায়। তবে কতটা কমে, তা নির্ভর করে একটি অথবা দুটি জিনই খারাপ কি না, তার ওপর। সাধারণত শরীরে যেকোনো বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য দুটি জিন দায়ী। এর একটি বাবা থেকে, আরেকটি মা থেকে আসে। যদি হিমোগ্লোবিন তৈরির একটি জিন ভালো এবং একটি মন্দ থাকে, তবে হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিকের চেয়ে (১০-৫০ শতাংশ) কম তৈরি হবে। এ ধরনের রোগীকে লাসেমিয়া মাইনর বলে। তাদের মধ্যে রোগের লক্ষণ কম মাত্রায় প্রকাশ পায় বিধায় রোগ সহজে ধরা যায় না। কারণ, তারা চিকিৎসকের কাছে দেরিতে আসে। তাদের থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বা কেরিয়ার বলে। আর যাদের দুটি জিনই মন্দ, অর্থাৎ যাদের মা ও বাবা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক, তাদের মধ্যে রোগের লক্ষণগুলো শিশুকালেই প্রকাশ পায় এবং সহজেই রোগনির্ণয় করা সম্ভব হয়। তাদের থ্যালাসেমিয়া মেজর বা বিশেষ ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া ইন্টার্মেডিয়া বলে। তারা শিশুকাল থেকেই নানা সমস্যায় ভোগে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সংমিশ্রণও হতে পারে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাবা বা মা অথবা উভয়েই দায়ী। বাংলাদেশে হিমগ্লোবিন–ই এবং হিমগ্লোবিন বিটা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইটের প্রকোপ বেশি।

রোগের লক্ষণগুলো নির্ভর করে রোগটির কেরিয়ার না ডিজিজের ওপর। কেরিয়ারের বেলায় কমবেশি রক্তশূন্যতা থাকে, অনেক সময় হালকা জন্ডিসও থাকতে পারে। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া মেজর বা ইন্টার্মেডিয়ার বেলায় রক্তশূন্যতা, জন্ডিস ও প্লীহা বড় থাকবে। জন্ডিসের লক্ষণ থাকায় অনেকে লিভারের সমস্যা মনে করেন। এ ছাড়া বাচ্চাদের শরীর বৃদ্ধির ব্যাঘাত ঘটে এবং ঘন ঘন ইনফেকশন হতে পারে। পিত্তে পাথর হওয়ার প্রবণতা থাকে। শরীরে অধিক পরিমাণে আয়রন জমা হয়ে ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা ও লিভার সিরোসিসের মতো জটিলতা দেখা দেয়। কেরিয়ারদের বেলায় বেশি বেশি আয়রণ গ্রহণের ফলে শরীরে অধিক আয়রন জমা হয়ে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তা ছাড়া একজন কেরিয়ার না জেনে আরেকজন কেরিয়ারকে বিয়ে করলে তাঁদের সন্তানদের জীবন হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। তবে চিকিৎসার জন্য একজন রক্তরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে ঘন ঘন ব্লাড ট্রান্সফিউশন ও আয়রন চিলেশনের প্রয়োজন হয়। কিউরেটিভ চিকিৎসা হিসেবে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ও জিন থেরাপি লাভজনক, যদিও ব্যয়বহুল ও আমাদের দেশে সুযোগ কম। রোগের বিস্তার রোধের দিকে অধিক মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০-১২ শতাংশ লোক এ রোগের বাহক এবং ভবিষ্যতে তা আরও বৃদ্ধি পাবে যদি না আমরা সতর্ক হই।

রোগীর প্রতি কিছু পরামর্শ

*থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ, যা প্রতিরোধযোগ্য।
*পারিবারিক বিবাহ পরিহার করুন এবং বিয়ের পূর্বে রক্ত পরিক্ষা করে নিন।
*একজন কেরিয়ার (ট্রেইট) অন্য একজন কেরিয়ারকে বিয়ে করবেন না।
*মা ও বাবা উভয়েই কেরিয়ার হলে প্রিনেটাল ডায়াগনোসিসের ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
*চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন–জাতীয় ওষুধ খাবেন না। অধিক আয়রনজনিত জটিলতা এড়ানোর জন্য ৩-৬ মাস পরপর রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

**লেখক: অধ্যাপক ডা. এম এ খান, রক্তরোগ ও বিএমটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক