বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্কিংটা যেমন

ছবি: লেখক

‘বন্ধু, আজকের ক্লাসটা কোন রুমে?’ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অসংখ্য গল্পের শুরু হয় এমনই একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে। দেশের দুই প্রান্তের দুটি অচেনা পরিবারের দুটি মানুষের পরিচয়। তারপর একসঙ্গে ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার চাপ, ক্যানটিনের আড্ডা, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর বন্ধুত্বে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) প্রতিটি ব্যাচেরই রয়েছে এমন শত শত গল্প, যেখানে একটি ছোট প্রশ্নের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বন্ধুত্ব। আর এই সম্পর্কগুলোর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এমন একধরনের নেটওয়ার্ক, যা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়জীবন নয়, ভবিষ্যতের পথচলাকেও করে তোলে আরও সহজ, শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময়।

বুটেক্সের জীবন শুধু ক্লাস, ল্যাব আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বুটেক্সের পকেট গেট–সংলগ্ন প্যারিস রোডখ্যাত রাস্তার সেই চিরচেনা আড্ডা, টং ও বিটাক মোড়ের চা, গ্রুপ স্টাডি কিংবা ক্লাবের কার্যক্রম, এসব ছোট ছোট মুহূর্তই একসময় হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি এবং গড়ে ওঠে একে অপরের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক।

অনেকেই ‘নেটওয়ার্কিং’ শব্দটিকে জটিল বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে, কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়জীবন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নেটওয়ার্কিং বলতে শুধু পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোকে বোঝায় না, এটি এমন সম্পর্ককে ইঙ্গিত দেয় , যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, শেখা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সহপাঠী, সিনিয়র, শিক্ষক, অ্যালামনাই কিংবা বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের সদস্য প্রত্যেকেই এই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকেই একটি ইতিবাচক ও কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে অনেক পথ সহজ হয়ে যায়। ক্লাসের নোট, পরীক্ষার প্রস্তুতি, গ্রুপ স্টাডি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সেমিনারে অংশগ্রহণ, এমনকি ইন্টার্নশিপ ও চাকরির খবর পাওয়ার ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্ক নিয়ে বুটেক্সের ৪৬তম ব্যাচের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের গ্র্যাজুয়েট তানজিম আফসানা দ্বীনা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব শুরুই হয় ক্লাস নোট আদান–প্রদানের মাধ্যমে। এরপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গভীর হয় একে অপরকে পরীক্ষার আগে পড়াশোনায় সাহায্য করে। অনেক জটিল কোর্স বন্ধুরা সহজে বুঝিয়ে দিত। ল্যাবগুলোতেও একসঙ্গে এক্সপেরিমেন্ট করা, ল্যাব রিপোর্ট লেখা ইত্যাদি নানান জায়গায় বন্ধুদের সাহায্য করেছি এবং একই সঙ্গে সাহায্য পেয়েছি। পড়াশোনার বাইরে একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া, ক্যানটিনে যাওয়া, কাজ শেষে হাতিরঝিল ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি আজ আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সেরা স্মৃতি। একই সঙ্গে আমি ডিবেট ক্লাবের সঙ্গেও সংযুক্ত ছিলাম, সেখানেও কাটিয়েছি সেরা মুহূর্তগুলো। স্নাতক শেষ হওয়ার পরও সেই বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট রয়েছে। আমরা নিয়মিত একে অপরের খোঁজ নিই, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করি এবং প্রয়োজনে পরামর্শ দিই। বর্তমানে কর্মজীবনে এসে আরও বেশি উপলব্ধি করেছি যে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক শুধু চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখা, দক্ষতা বাড়ানো এবং নিজেকে আরও উন্নত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন হোক কিংবা কর্মজীবন, সঠিক বন্ধুত্ব ও ইতিবাচক নেটওয়ার্কিং একজন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি।’

বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্কিং নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম ব্যাচের ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গ্র্যাজুয়েট ও প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার মো. সাহরিয়ার আলম পাভেল বলেন, ‘একজন মানুষকে জানতে হলে আগে তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে হয়। কারণ, একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, অভ্যাস ও ব্যক্তিত্বের ওপর তার বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ভালো বন্ধু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো বন্ধুরা প্রয়োজনের সময় পাশে থাকে সব সময়, পড়াশোনার ম্যাটারিয়ালস দিয়ে সাহায্য করে, উৎসাহ দেয় এবং সঠিক পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। অন্যদিকে খারাপ বন্ধু ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে। অনেকে বলে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া যায় না। তবে আমি এ কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই এমন অনেক বন্ধু পেয়েছি, যারা ক্লাস নোট ও বিভিন্ন একাডেমিক বিষয়ে আমাকে সাহায্য করেছে। তাই সঠিক মানুষকে বন্ধু হিসেবে বেছে নিতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব আজীবনের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। টেক্সটাইল খাতে ভালো চাকরির সুযোগ তৈরি করতে সিনিয়রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা খুবই প্রয়োজন। নিয়োগ, ফ্যাক্টরি, কাজের পরিবেশ বা ক্যারিয়ার নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা সিনিয়রদের থেকেই জানা যায়।’

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব ও করপোরেট জীবনে নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব নিয়ে একই ব্যাচের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গ্র্যাজুয়েট এবং আরএইচ করপোরেশনের ল্যাব ট্রেইনি ওয়াসিমা তাসনিম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। সবার চিন্তাধারা, মতামত আর ব্যক্তিত্ব আলাদা। কিন্তু পরীক্ষার সময় নোট শেয়ার করা, একসঙ্গে পড়াশোনা, আড্ডা দেওয়া কিংবা পরীক্ষা শেষে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা, এসব ছোট ছোট মুহূর্তই বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে তোলে। করপোরেট–জীবনে প্রবেশ করার পর বাস্তবতা অনেক বদলে যায়। চাকরির ব্যস্ততায় পর প্রায় ছয় মাস বা তারও বেশি সময় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় না। আগের মতো আড্ডাও হয় না, যোগাযোগটা বেশির ভাগ সময় শুধু মেসেজেই সীমাবদ্ধ থাকে। তখন বুঝতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো কতটা মূল্যবান ছিল। নেটওয়ার্কিংয়ের কথা বলতে গেলে, বুটেক্সের জুনিয়র-সিনিয়র সম্পর্ক সত্যিই অন্যতম শক্তিশালী দিক। আমার নিজের চাকরিজীবনের অল্প সময়ের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বুটেক্সের সিনিয়র ভাইয়া-আপুরা সব সময় সহযোগিতা করেছেন। কখনো সাহায্য চাইলে ফিরিয়ে দেননি বা উপেক্ষা করেননি; বরং ছোট বোনের মতো দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, ভুল হলে শাসন করে ঠিক পথও দেখিয়েছেন। একজন বুটেক্স শিক্ষার্থী হিসেবে জব লাইফে আমি এটাকে অনেক বড় প্রাপ্তি বলে মনে করি।’