১টি মশার কয়েল জ্বালালে ৫১টি সিগারেট জ্বালানোর পরিমাণ বিষাক্ত জৈব বাষ্প

ডেঙ্গু মশাপ্রতীকী ছবি

মানুষের জীবন তার পরিবার বা ঘরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পরিবারের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনাকে কেন্দ্র করে ঘটা নানা ঘটনাই মানুষকে একসুতায় বেঁধে রাখে। পরিবারের সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই বেশির ভাগ মানুষের অগ্রাধিকার। বিশেষ করে আমরা আমাদের শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করি। দেখা যায়, এর অংশ হিসেবেই আমরা বাসায় মশার কয়েল জ্বালিয়ে পরিবারকে সুরক্ষা দিই। কিন্তু আমাদের এ সুরক্ষার প্রচেষ্টা পরিবারের জন্য আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে কি না, তা-ও ভেবে দেখা প্রয়োজন!

মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে—এমন বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম মশা। খুবই ছোট এই পতঙ্গ আসলে ক্ষতির দিক থেকে এতটা ছোটও নয়! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদনে মশাকে ‘আতঙ্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মশাবাহিত রোগে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশও দীর্ঘ সময় ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগে ভুগেছে; এখনো চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু নিয়ে সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষা শুরুর আগে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে।

সাধারণত মশার হাত থেকে বাঁচতে সহজ সমাধান হিসেবে আমরা বাসাবাড়ি ও অফিসে কয়েল জ্বালিয়ে ফেলি। কিন্তু কয়েলে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাইওয়ানভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, ১টি মশার কয়েল জ্বালালে যে পরিমাণ ফরম্যালডিহাইড–জাতীয় বিষাক্ত জৈব বাষ্প তৈরি হয়, তা প্রায় ৫১টি সিগারেট জ্বালানোর সমান। ১টি কয়েল থেকে উৎপাদিত সূক্ষ্ম কণা ৭৫ থেকে ১৩৭টি সিগারেট জ্বালানোর সমতুল্য। পাশাপাশি এতে উৎপন্ন হওয়া সূক্ষ্ম ও অতিসূক্ষ্ম ভাসমান কণা (পার্টিকুলেট ম্যাটারস ২.৫) ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। ফলে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এগুলো শুধু যে ফুসফুস, হার্ট, মস্তিষ্ক ও রক্ত সংবহনতন্ত্রের ক্ষতি করে তা–ই নয়; দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে ক্যানসারের আশঙ্কাকেও ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তোলে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১টি সিগারেট মানুষের জীবন থেকে গড়ে প্রায় ২০ মিনিট আয়ু কেড়ে নেয়। বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই ধূমপান। দীর্ঘমেয়াদি ধূমপায়ীদের দুই-তৃতীয়াংশই ধূমপানের কারণে মারা যায়। কেবল যুক্তরাজ্যেই প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ধূমপানের কারণে মারা যান। এখন দিনে যদি আমরা ঘরে একটি কয়েলও ব্যবহার করি, আমাদের ক্ষতির পরিমাণ হবে প্রায় ১ হাজার ২০ মিনিট। অর্থাৎ ১টি কয়েলের কারণে আমরা আমাদের জীবন থেকে প্রতিদিন ১৭ ঘণ্টা করে আয়ু হারাচ্ছি।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ এই হিসাব দেখে বিচলিতবোধ না-ও করতে পারেন। কিন্তু আমাদের পরিবারে থাকা শিশু, বয়স্ক বা ইতিমধ্যে নানান শারীরিক রোগ বা জটিলতায় ভুগছেন—এমন মানুষদের কথা বিবেচনা করে দেখুন। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের কয়েল ব্যবহার করলে এর দূষিত ধোঁয়া থেকে শ্বাসকষ্ট, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, ক্যানসার; এমনকি গর্ভের শিশুর বিকলাঙ্গতা ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য ক্ষতি কমাতে মশার কয়েল ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

তাহলে মশা তাড়াতে কোনো বিকল্প কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা-ও ভাবা হচ্ছে। মশা থেকে বাঁচতে প্রথমেই আমাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। মশার জন্মস্থান হিসেবে ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল ইত্যাদিতে যেন দীর্ঘদিন পানি জমে না থাকে, তা খেয়াল করতে হবে। তারপরও ঘরে ঢুকে পড়া মশার হাত থেকে বাঁচতে লিকুইড ভ্যাপোরাইজার মতো আধুনিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মশা তাড়ানোর বহু আধুনিক বিকল্প বাজারে এসেছে, এগুলো ব্যবহারে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। অন্তত পরবর্তী প্রজন্মের সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে হলেও আমাদের কয়েলের মতো ক্ষতিকর বস্তু ব্যবহারের অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে কয়েল জ্বালিয়ে ইতিমধ্যে দেশের জনস্বাস্থ্যের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। এখন কয়েল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করার মাধ্যমে আমাদের এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজন আরও গবেষণার এবং সব অংশীজন মিলে একসঙ্গে কাজ করার।

*লেখক: মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান, কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট