স্মৃতিচারণায় বিশ্বকাপ ফুটবল

ছবি: এএফপি

আমাদের পরিবারে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আছে। সেটা হলো ফুটবলভক্তির দিক দিয়ে বিবেচনা করলে পুরোই ব্লেন্ডেড ফ্যামিলি!

এই যেমন আব্বা ফ্রান্সের সাপোর্টার ছিলেন, ইরানেরও সাপোর্ট করতেন। তিন দুলাভাই আর্জেন্টিনার কঠিন সাপোর্টার। বড় বোন ইতালি (ফর রবার্তো বাজ্জিও) এবং ইংল্যান্ড (এক্স ফ্যাক্টর ডেভিড বেকহাম হাহাহা), মেজ আপু জার্মানির ডাইহার্ড ফ্যান আর আমরা বাকি তিন বোন এবং আমার মি. ইমরান ব্রাজিলের পাঁড় ভক্ত। ভাগনেরা ব্রাজিলটিনা (যেহেতু বাবা আর্জেন্টিনা আর খালারা ব্রাজিল)!

তবে সবচেয়ে মজার হলেন আমার আম্মাজান। তিনি সবার অ্যান্টি পার্টি!

এই যেমন ধরেন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা জার্মানি প্রতিপক্ষের জালে চারবার বল পাঠিয়েছে। খেলার সময় বাকি আছে দুই মিনিট, তখন আম্মা এসে দাঁত-মুখ খিঁচে বলবে, এই মাত্র চার গোল দিয়া কি খেলা জিতা হাবো (মানে জিততে পারবে কি)? অথবা এমবাপ্পের দৌড় দেখে বলবে, অর চেয়ে তো শিমলাপাড়ার অরিক ভালা দৌড়া হায় (মানে ভালো দৌড়াতে পারে আরকি)!

আমাদের ভাইবোনেরা খেলার এত ভক্ত যে বাতিস্তুতার ৯ নম্বর, কাফুর ২ নম্বর, বালাকের ১৩ নম্বর কিংবা লুই ফিগোর ৭ নম্বর জার্সিও আমাদের মুখস্থ ছিল।

২০১০, ১৪, ১৮ আর ২২–এর বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলাগুলো সবাই একসঙ্গে দারুণ উপভোগ করেছি। এই সময়টাতে আরও পাশে পেয়েছি মেজ আপুর শ্বশুরবাড়ির কিছু আত্মীয়স্বজন, যারা আমাদেরই দাদা আর ভাই। ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে যুক্তিতর্ক, হাসিঠাট্টা অনেক হয়েছে, তবে তা কখনোই তর্কযুদ্ধ কিংবা মনোমালিন্যের পর্যায়ে যায়নি।

নাগরিক সংবাদ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রথম ব্রাজিলের পতাকা কিনতাম। মেজ আপুর জন্য কিনতাম জার্মানির পতাকা। এমনকি বন্ধুদেরকেও জার্মানি, আর্জেন্টিনার পতাকা উপহার দিতাম।

২০১৮ আর ২২–এ সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন আর যাঁর যাঁর ফ্ল্যাটে স্মার্ট টিভি থাকলেও সব একজোট হয়ে আম্মা অথবা মেজ আপুর বাসায় ফুটবল খেলা দেখতাম।

দেখতে দেখতে চারটা বছর চলে গেছে। কত কিছুই বদলে গেছে। আব্বা আর আমাদের মাঝে নেই। আম্মাকে অসীম ধৈর্য নিয়ে পেনাল্টি, অফসাইড বোঝানোরও কেউ নেই। পরিবার নিয়ে সবাই স্বাভাবিক ব্যস্ত আর দাদা-ভাইয়েরা কেউ কেউ প্রায়ই অসুস্থ থাকেন।

সময় জীবন থেকে হারিয়ে যায় তবে শিক্ষণীয় ব্যাপার গুলো মনে গেঁথে যায়। এই যে বিনোদনের আড়ালে গণতান্ত্রিক মনোভাব, সহমর্মিতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর ধৈর্যধারণের শিক্ষা সবাই—একসঙ্গে না হলে এত সুন্দরভাবে হয়তো শেখা হতো না।

এ তো গেল পরিবারের কথা। ২০১৪ অথবা ২০১৮–এর বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে এক জরিপে দেখেছিলাম, দেশে অপরাধপ্রবণতা শতকরা ৫০ ভাগের বেশি কমে গিয়েছিল। কারণ, খেলা দেখা আর দিনে খেলার আলোচনা নিয়ে ব্যস্ততা!

আসলে বুঝে না বুঝে প্রিয়-অপ্রিয় দল নিয়ে অশ্রাব্য তর্ক কিংবা অপ্রীতিকর আচরণের ঘটনা না ঘটালে খেলাধুলা হলো বিনোদনের একটা চমৎকার মাধ্যম।

২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা ইতিমধ্যেই উঠে গেছে। আশপাশে পতাকা, গায়ে গায়ে প্রিয় দলের জার্সি আর ফেসবুকে জমেছে কথার লড়াই। আর মাত্র তিন দিন বাকি।

সবার পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় করে বিশ্বকাপ দেখা উপভোগ্য হোক।

হ্যাপি ফুটবল ওয়াচিং!