লুই কানের নকশার সংসদে আইনের শাসন নিয়ে কথা হবে কবে

প্রথম আলোর সংবাদে পড়েছি, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আনীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি বাতিল করা হবে। যার মধ্যে ৪টি অনতিবিলম্বে বাতিল, আর ১৬টি আইনে পরিণত না করার সুপারিশ করা হয়েছে বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে। (২ এপ্রিল, ২০২৬; https://www.prothomalo.com/politics/rb9ccfanve) এই বাতিলের পেছন কী কারণ আছে, তা আমরা সাধারণ মানুষ কি জানি?

সংসদ, আইনের শাসন ও সংবিধানের পাঠ নিয়ে আলোচনার আগে একটু আইনের শাসন নীতি নিয়ে জানা দরকার। এই নীতি অনুসারে, সমাজে শাসক ও শোষিত সবাইকেই আইনের অধীনে থাকতে হবে। সবাইকে ও সব প্রতিষ্ঠানকে বিচারব্যবস্থার সম্মুখীন করতে হবে। আইনজ্ঞ এ ভি ডাইসি মনে করেন, আইনের প্রাধান্য, আইনের চোখে সমতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যদি আইনের শাসন নীতি নিয়ে আরেকটু গভীরভাবে আলোচনা করি, তাহলে আরেক আইনজ্ঞ লর্ড থমাস বিংহ্যামের বিখ্যাত বই দ্য রুল অব ল (২০১০)। সেখানে বেশ কয়েকটি সংশ্লিষ্ট নীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, আইন সহজলভ্য, স্পষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে। এ ছাড়া আইনি অধিকার ও দায়দায়িত্ব আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে, ইচ্ছাধীন ক্ষমতা দিয়ে নয়। একটি কথা মনে রাখতে হবে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। এ ছাড়া সরকারি ক্ষমতা সৎ উদ্দেশ্যে ও আইনের সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। মানবাধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া ন্যায্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে।

আমি গবেষক হিসেবে, আইনের শাসনসংশ্লিষ্ট নীতি গভীরভাবে বিশ্লেষণে দেখি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার অন্যতম শর্ত হলো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্বাধীন ও সার্বভৌম কাজ করার সক্ষমতা। এসব ক্ষমতা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা তখনই অর্জন করতে পারবেন, যখন দেশে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বতন্ত্র বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

লেখক

আমাদের প্রশ্ন হলো, স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা না করে নির্বাহী বিভাগের অধীনে রেখে রাজনৈতিক নেতারা কীভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করবেন, তা স্পষ্ট নয়। কোনো আলাদিনের চেরাগে সমাধান আছে কি না, তা জানি না। সমাজে আইনের শাসন কী দিয়ে নিশ্চিত করবেন, একজন আইনের গবেষক হিসেবে এ বিষয় কোনোভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না আমাদের।

একটি কথা মনে রাখতে হবে, সমাজে আইনের প্রসার বা প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সনদ হচ্ছে সংবিধান। আমাদের দেশের লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতাকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে আমাদের সংবিধান। সংবিধান আমাদের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের কথা বলে। আমাদের দেশ পরিচালনার নানা কাঠামো সংবিধানের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৭২ সাল প্রণীত সংবিধানে মৌলিক মূলনীতিতে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ বা স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। এর ৩৭ বছর পর, ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত আমরা বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ বা স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। এর মধ্যে আবার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, এইচ এম এরশাদের সামরিক সরকারের আমলে আনীত অষ্টম সংশোধনী। সেখানে ১০০ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা হবে। সেই সংশোধনী তো পরে উচ্চ আদালত বাতিল করে দেন।

২০২৪–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্বতন্ত্র বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জুলাই–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক ওই অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিহাস থেকে এটা প্রতীয়মান, বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ মামলা হিসেবে অধিক পরিচিত মাসদার হোসেন মামলা ১৯৯৫ সালে দায়ের করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে চূড়ান্ত রায় হলেও তা ২০০৭ সাল পর্যন্ত কোনো বাস্তবতার মুখ দেখেনি। পরে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক চূড়ান্তভাবে বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়। যা পরবর্তী সময়ে তৎকালীন নির্বাচিত সরকার কর্তৃক সংসদে বিল উত্থাপনের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধন ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে বিচার বিভাগ স্বাধীন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ নিয়ে আইন অঙ্গনে অনেক আলোচনা থাকলেও কোনো সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এরপর ২০২৪–পরবর্তী শাসনব্যবস্থায় আমাদের প্রত্যাশা অনেক ছিল। তারুণ্যনির্ভর আন্দোলনের মর্মবাণী, জনগণের জন্য শাসনব্যবস্থার প্রত্যাশা আমাদের। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আপামর জনগণের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা আমাদের। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন নির্বাচিত সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশে বিচার বিভাগীয় স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করবে। এর মাধ্যমে বিশ্বে আলোচিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সংবিধানে অনেক কিছু বলা থাকলেও আমরা ৩০-৩২ বছরের গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় আইনের শাসন পাইনি। এর জবাবদিহি রাজনৈতিক দলগুলোর করা উচিত।

আমরা প্রত্যাশা করেছি, নতুন সরকার অন্ততপক্ষে বিচার বিভাগকে স্বাধীন, শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র একটি কাঠামো হিসেবে রাষ্ট্রের সুচারু কার্যক্রমে শামিল করবে। এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কিন্তু অতীব দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, আজকে আমাদের শুনতে হচ্ছে সরকার অধ্যাদেশটি অচিরেই বাতিল করবে।

আমরা জানি না, জাতি হিসেবে আমরা কবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দেখতে পাব। তবে বলতে পারি, আমরা জাতি হিসেবে সুন্দর, সার্বভৌম ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অমিয় সুযোগ হারাচ্ছি কি না, তা ভাবা দরকার। আমরা জাতি হিসেবে রক্ত দিয়ে ভাষা এনেছি, রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি, বারবার রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা জাতি হিসেবে এই বারবার রক্তদানের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেনি। এই সুফল বারবার ভোগ করেছে নির্দিষ্ট একশ্রেণির মানুষ।

মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের প্রশাসন, রাজনৈতিক দল বা সমাজ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী নয়। জনগণের ভোটে লুই কানের নকশার সংসদে ঢুকে সবাই জনগণের কথা ভুলে যায় বারবার।

*লেখক: মোহা. রিদোয়ানুল হক, গবেষক, এসএইউ মেরিট স্কলার, সাউথ এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় (এসএইউ), ভারত

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]