নাগরিক সেবা পেতে কতটুকু ‘ভিআইপি’ হতে হয়
গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) রাজধানীর অন্যতম সুরক্ষিত ও কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হলেন গণমাধ্যমকর্মী রনি রেজা। গ্রিনটিভির একটি টক শো শেষ করে গুলশান ১–এর ১১৬ নম্বর সড়ক দিয়ে রিকশায় ফিরছিলেন তিনি। গন্তব্য থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরে, প্রকাশ্য রাত ১০টায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর দুটি মোবাইল ফোন, ওয়ালেট, ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড, অফিস আইডি এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হাতছাড়া হয়ে যায়।
ঘটনার পর রনি রেজা যখন অনলাইন এডিটরস অ্যালায়েন্সের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহেল, ঢাকা ওয়াচের সম্পাদক সাখাওয়াত সজীব এবং দৈনিক ইনকিলাবের হেড অব ডিজিটাল তানভীর খোন্দকারকে সঙ্গে নিয়ে গুলশান থানায় যান, তখন পুলিশের পক্ষ থেকে চিরাচরিত নিয়মে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করানো হয়। ভুক্তভোগী নিজেই যখন সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ছিনতাইকারীদের মোটরসাইকেল নম্বর ট্র্যাক করার আধুনিক ও কার্যকর পরামর্শ দিলেন, তখন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হুসাইন অত্যন্ত আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘মোবাইল পেয়ে যাবেন। চিন্তার কারণ নেই।’
ওসির এই আশ্বাসে আশ্বস্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ছিল। কারণ, আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা দেখেছি, মোহাম্মদপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক মহাপরিচালকের ছিনতাই হওয়া মোবাইল কত দ্রুত উদ্ধার হয়। আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার, যা ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব, তা চুরির পর চোরকে গ্রেপ্তার ও তার উদ্ধারে পুলিশ কতটা পারঙ্গমতা দেখিয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের পুলিশের অপরাধী চেনার বা খুঁজে বের করার দূরদর্শিতা সত্যি প্রশংসনীয়।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে অন্য জায়গায়। ঘটনার পর বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও যখন কোনো অগ্রগতির দেখা মেলে না, তখন সেই চিরাচরিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈষম্যটাই আবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যে দ্রুততা ও আন্তরিকতা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা ‘ভিআইপি’র ক্ষেত্রে দেখা যায়, সেই একই তৎপরতা একজন সাধারণ নাগরিক বা গণমাধ্যমকর্মীর বেলায় কোথায় হারিয়ে যায়?
গুলশানের মতো একটি সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় যদি প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে ছিনতাই হতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটা ঠিক কোথায়? তথ্যপ্রযুক্তির বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত আধুনিক সেবার গল্প শুনি। কিন্তু বাস্তবে একটি মোবাইল উদ্ধার বা ছিনতাইকারীকে ট্র্যাক করার মতো সাধারণ নাগরিক সেবা পেতেও কি তবে নির্দিষ্ট কোনো ‘মর্যাদা’ বা ‘ভিআইপি’ ট্যাগ লাইনের প্রয়োজন পড়বে?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখার স্বার্থেই এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। সেবা পাওয়ার মাপকাঠি যেন কখনো পদমর্যাদা না হয়; বরং প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই হোক পুলিশের মূল লক্ষ্য। আমরা আশা করব, গুলশান থানা–পুলিশ কেবল আশ্বাসের বাণীতে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনবে।