রুম হিটার: উষ্ণতার আড়ালে এক বাবার নির্ঘুম রাত

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

শীত মানেই আরাম নয় সবার জন্য।

কারও কারও কাছে শীত মানে নির্ঘুম রাত, বুকভরা উৎকণ্ঠা আর সন্তানের জন্য নীরব প্রার্থনা। হৃদয়—ছদ্মনাম, এক কন্যাসন্তানের বাবা। মেয়েটাই তাঁর পৃথিবী। মেয়ের হাসিতে তাঁর দিনের শুরু, আর রাতে ঘুমোনোর আগে মেয়ের সুস্থতা নিশ্চিত করেই তবে তাঁর চোখে ঘুম নামে।

এই শীতে মেয়েটির ঠান্ডা লেগেছিল। হালকা কাশি, মাঝেমধ্যে নাক দিয়ে পানি পড়া—শীতকালে শিশুদের খুবই পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু বাবার মন মানে না। ঠান্ডা যেন আর এক বিন্দুও মেয়েকে স্পর্শ করতে না পারে, এই ভাবনা থেকে রাত নামলেই দরজা-জানালা বন্ধ করে রুমহিটার চালু করতেন হৃদয়।

ঘর উষ্ণ থাকত। মেয়েটিও নিশ্চিন্তে ঘুমাত। কিন্তু এক গভীর রাতে হঠাৎ সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেল। কাশির ফাঁকে ফাঁকে মেয়ের নাক দিয়ে বেরিয়ে এল রক্ত। একটু নয়, পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ার মতো রক্ত।

বাবার বুকটা মুহূর্তেই কেঁপে উঠল।

ভয়, আতঙ্ক আর অজানা আশঙ্কায় সময় যেন থমকে গেল।

পরদিন আর দেরি নয়, হৃদয় ছুটে গেলেন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক ধৈর্য নিয়ে সব শুনলেন—শীত, কাশি, ঘর বন্ধ রাখা, রাতভর রুম হিটার ব্যবহার।

তারপর খুব শান্ত স্বরে যে কথাটা বললেন, সেটাই এ ঘটনার মূল শিক্ষা—

‘শীতে দরজা-জানালা বন্ধ রেখে দীর্ঘ সময় রুমহিটার চালালে ঘরের বাতাস অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যায়। এতে শিশুর নাকের ভেতরের নরম পর্দা শুকিয়ে ফেটে যেতে পারে। এই শুষ্কতাই নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সম্ভাব্য কারণ।’

হৃদয়ের চোখে তখন শুধু বিস্ময়। যে জিনিসটা তিনি মেয়েকে আগলে রাখতে ব্যবহার করছিলেন, সেটাই অজান্তে মেয়ের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে!

কেন শীতকালে শিশুরা বেশি সংবেদনশীল?

শিশুদের শরীর আমাদের মতো শক্ত নয়। তাদের—

• নাক ও গলার ভেতরের পর্দা অত্যন্ত নরম

• শ্বাসনালি সহজেই শুষ্কতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়

• ত্বক দ্রুত আর্দ্রতা হারায়

দীর্ঘ সময় রুমহিটার ব্যবহার করলে ঘরের আর্দ্রতা কমে যায়। এর ফলে দেখা দিতে পারে—

• নাক দিয়ে রক্ত পড়া

• কাশি বেড়ে যাওয়া

• গলা শুকিয়ে যাওয়া

• ত্বক খসখসে হওয়া

• শিশুর অস্বস্তি ও ঘুমের ব্যাঘাত

বিশেষ করে ঘর সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

তাহলে শীতে কীভাবে যত্ন নেবেন?

*শীত থেকে বাঁচাতে গিয়ে যেন শিশুকে নতুন সমস্যার মুখে না ফেলি, এই সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি।

*রুমহিটার সব সময় নয়, প্রয়োজনে ব্যবহার করুন

*দিনে বা রাতে কিছু সময় জানালা খুলে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন

*শিশুর ঘরে হিটার থাকলে কম তাপে ও সীমিত সময় চালান

*ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে পানিভর্তি পাত্র বা হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন, শিশুকে হিটারের খুব কাছে রাখবেন না

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

শেষ কথা

হৃদয়ের মেয়েটি এখন সুস্থ। বাবার বুকের সেই ভয় কেটে গেছে। কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনা আমাদের একটি বড় সত্য মনে করিয়ে দেয় যে ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, ভালোবাসা দায়িত্ব—যেখানে যত্নের সঙ্গে থাকে সচেতনতার ছায়া। শীত আরাম দেয় ঠিকই, কিন্তু পরিমিতি ও সচেতনতা না থাকলে সেই আরামই হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তির কারণ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে—উষ্ণতার পাশাপাশি দরকার আর্দ্রতা, সচেতনতা ও পরিমিতিবোধ এই শীতে তাই ঘর গরম করুন, কিন্তু ভালোবাসাটুকু রাখুন বুদ্ধির আলোয়।

*চিন্ময় কুমার সেন, ফার্মাসিস্ট