একটা ফিলিস্তিনি ফুল
১.
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঝিঁঝিপোকা ডাকছে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা হাসনাহেনার ঝোপে। হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ ফাতেমার কাছে ভালো লাগে। আজ বড্ড বিরক্ত লাগছে। মাথা ঘোরাচ্ছে। কপালের এক পাশে সূক্ষ্ম একটা ধূলিকণার মতো চিকন একটা ব্যথা চিনচিন করে উঠছে। চারপাশে অন্ধকার মনে হতে লাগল। এমনিতেই সময়টা ফিলিস্তিনের জন্য একদম ভালো যাচ্ছে না। আদরের একমাত্র ছোট্ট ছেলে খালেদ। সহসাই কেন যেন খালেদের জন্য দুশ্চিন্তা হতে লাগল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে সেই কখন! এখনো ঘরে ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। সে ফিরছে না কেন? নাকি কোনো বিপদ হলো তার? সে কি বন্ধুদের সঙ্গে ফিরবে নাকি একাই ফিরবে? একাই ফিরতে পারবে কি না—কে জানে। নানা রকম দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে দেয়াল ধরে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল ফাতেমা। দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে বালিশে মাথা রাখতেই কলিং বেল বেজে উঠল। এক, দুই, পরপর তিনবার। ফাতেমা দরজা খুলতেই দেখে খালেদের কয়েকজন বন্ধু তার আদরের সন্তান খালেদকে নিয়ে এসেছে রক্তাক্ত অবস্থায়। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। গলগল করে বেয়ে পড়ছে সিঁড়িতে ও মেঝেতে!
ফাতেমা যেন আসমান থেকে পড়ল। কোনো প্রশ্ন করতে পারল না। হতভম্ব হয়ে শুধু চেয়ে রইল তার সন্তানের মুখের দিকে। শিশু খালেদের ঝরে পড়া ফুলের কণ্ঠে বলছে, আম্মি আম্মি আম্মি…!
খানিক পরে যেন ফাতেমার সংবিৎ ফিরে পেল। সব বুঝেও ফাতেমা চিৎকার করে বলল, তোমার এ অবস্থা কীভাবে হলো বাপজান আমার? বলো বাবা বলো!
পাশ থেকে আহত সামির বলল, আমরা ঈদের নামাজ পড়ে ঈদগাহে খেলছিলাম। হঠাৎ ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী আমাদের ওপর হামলা করে। কয়েকজনকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। আমরা এক বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে কি না, তা দেখার জন্য বাইরে আসতেই আমাদের ওপর ওরা গুলি করে। ওমর, সাকিব ও রাফে ওদেরকে শহিদ করে ফেলেছে। আর খালেদের মাথার এক পাশে...
সামিরের কথা শেষ না হতেই ফাতেমা চিৎকার করে বলে উঠল, আল্লাহ…!
২.
মধ্যরাত। ২টা বেজে ৩৩ মিনিট। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে খালেদ। ওর জ্ঞান ফিরেনি এখনো। ডক্টর ফাদি হাসসুনা বলেছেন, বেশি বেশি দোয়া এবং দরুদ পাঠ করতে। কখন কী হয় কে জানে। ফাতেমা খালেদের শিথানে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে।
জীবনটা যেন তার যুদ্ধময় হয়ে গেছে। এক যুদ্ধের দিনে বিবাহ, আরেক যুদ্ধের দিনে খালেদের জন্ম। জনমভর যেন লেগে আছে যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার নয়। বুকের ভেতর দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। খালেদ যদি আর না ফেরে ফাতেমা সেই আগুনে নিজে পুড়বে এবং ইসরায়েল বাহিনীকেও পোড়াবে। সন্তানের বাঁচা-মরার লড়াইয়ের এ তার প্রতিজ্ঞা।
ফাতেমা উদাস নয়নে চেয়ে আছে জানালার পথের দিকে। খালেদ কেঁপে ওঠল, ফাতেমা তার কপালে দুই ঠোঁট ছুঁয়ে মিষ্টি একটা হাসি দেয়, এ হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকে এক গভীর দুঃখ, এক অদৃশ্য শোক ও প্রতিশোধ।
খালেদের বাবা হামেদ ফারুক কোত্থেকে যেন দৌড়ে এল। ফাতেমাকে পেছন থেকে ডাকল, হঠাৎ কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেল ফাতেমা।
হামেদকে দেখে উঃ মাগো! বলে দুহাতে মুখ ঢাকল ফাতেমা।
কী হয়েছে? দ্রুত পায়ে কাছে এগিয়ে এল হাসান।
কিছু না! ও কিছু না! ফাতেমার আর্তনাদ যেন থামছেই না।
চোখে কিছু পড়ল নাকি? হামেদের কণ্ঠে উদ্বেগ।
-হ্যাঁ, পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। হয়তো ধুলা, নয়তো পোকা।
হামেদ বলল, দেখি দেখি কী পড়েছে?
চোখ থেকে হাত সরায় না ফাতেমা।
আহ-হা, সরাও হাত। একবার দেখতেই দাও না চোখটা।
ফাতেমা বলে, না, না, না।
হামেদ ফাতেমার দুই চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। তুমি কাঁদছ কেন ফাতেমা? চোখ মোছো। আমাদের খালেদ তো ফিলিস্তিনি একটা ফুল। সে জান্নাতে গিয়ে আমাদের জন্য সুগন্ধি ছড়াবে।
ফাতেমা মুখটা বিছানায় গুঁজে নিয়ে কাঁদতে থাকে। সন্তানের শোক সহ্য করতে পারে না। এরপর নিঃশব্দ কয়েকটি মুহূর্ত কাটে। কাঁদতেই থাকে। মাথা আর তোলে না ফাতেমা। কোত্থেকে যেন সুন্দর মিষ্টি একটা ঘ্রাণ এসে তার নাকে লাগে। সে কান্না থামিয়ে গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা করে, অবশেষে বুঝতে পারে এটা তার ছেলে খালেদের গায়ের ঘ্রাণ। আজ যেন সে ঘ্রাণে জান্নাতি খুশবো এসে মিশেছে! যে ঘ্রাণে ম-ম করতে থাকে গোটা ফিলিস্তিন…।
*শিক্ষার্থী: এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ঢাকা, বাংলাদেশ
‘নাগরিক সংবাদ’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]