উনচল্লিশের আমি
খুলনা সরকারি করোনেশন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে বিএল কলেজে ভর্তি হই ১৯৭৭ সালে। আমার পাঁচ মামার মধ্যে সবার ছোট ‘মনি মামা’, যাকে আমরা বেশ ভয় পেতাম। আমার সেই মামা তখন বিএল কলেজের অঙ্কের শিক্ষক—অধ্যাপক মুজিবর রহমান।
যখন আরও ছোট ছিলাম, তখন ভয়টা এতই ছিল যে মনি মামার সামনেই পড়তে চাইতাম না। নানিকে আমরা সবাই বলতাম ‘বু’ (দাদি বা নানি সম্পর্ক নির্বিশেষে) এবং যে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, সেটা ছিল বুর বাড়ি; খুলনা শহরের শ্রীশনগরে একটি দোতলা বাসা। এই ভাড়া বাড়ির দোতলায় মনি মামা আর মনিমা (মামি) থাকতেন। আমরা বুর বাড়ি গেলেও মনি মামা বাসায় থাকলে দোতলায় উঠতাম না। দোতলার সঙ্গে খোলা ছাদে একটা আমগাছ ছিল। আম পাড়ার শখ, কিন্তু মামা ঘরে আছেন। আমার দুষ্টু ভাইগুলো পা টিপে টিপে পাচিল বেয়ে উঠত, যেন শব্দ না হয়। টের পেলেই মামা হুংকার দিতেন, ‘কে ওখানে?’
বাড়ির সামনে খোলা মাঠ; এক পাশে একটা বড় পুকুর, বছরের বেশির ভাগ সময়ই যেটা বড় বড় কচুরিপানায় ভর্তি থাকত। কিন্তু তার মধ্যেই ছিল গোসল ও ঝাঁপাঝাঁপি। পাড়াটাই ছিল কোনো এক জমিদারের—বুর ভাড়া বাড়িটাও নাকি তাই।
বড় তিন মামা ব্যবসায়ী, ৪ নম্বর মামা ইঞ্জিনিয়ার, যার সাথে ক্বচিৎ দেখা হয়েছে। ছোট মামা গণিতে মাস্টার্স, গোল্ড মেডেলিস্ট। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়েও যাননি; বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি নাকি রাজনীতি, আরেকটি তাঁর মায়ের প্রতি ভালোবাসা।
আমার নানা সরকারি চাকরি করতেন। সেই ১৯৭৭ সালে, ছোট মামা ছাড়া বাকি মামা এবং মা-খালাদের শহরে নিজস্ব বাড়ি আছে তখন। মনি মামা বিএল কলেজের অঙ্কের কনিষ্ঠতম অধ্যাপক। কোনো প্রাইভেট পড়ান না। অবশ্য তখন অনেকেই প্রাইভেট পড়াতেন না, অনুরোধ ফেলতে না পারলে পড়াতেন, কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। আমার নানার শহরে নিজের বাড়ি ছিল না—এ অবস্থায় বাড়ির পরামর্শে মনি মামা আলজেরিয়ায় লিয়েন নিয়ে যাবেন বলে ঠিক করলেন। মামা যাওয়ার আগে আমরা ভাইবোনেরা ঠিক করলাম, তাঁর জন্মদিন পালন করব।
তখন মামার উনচল্লিশ বছর।
আমাদের সাংস্কৃতিক উইংয়ের প্রধান ছিলেন দীপু দাদা। তাঁর নির্দেশনায় আমরা মাঝেমধ্যে নাটক করতাম। রচনা, প্রযোজনা, সংলাপ, নির্দেশনা—সবই দীপু দাদা করতেন। সবাইকে ভালো পার্ট দিলেও দাসী-বাঁদির চরিত্র সীমা ও আমার জন্য নির্ধারিত ছিল। কবিতা লিখলেও একই অবস্থা।
একটি উদাহরণ দিই—
দীপু নামে ছেলে ছিল,
কবি কবি ভাব
সে তো কবি নয়
........
সীমা নামে দাসী ছিল,
দাসী দাসী ভাব,
সে তো দাসী নয়,
ঝোরা নামে ঝাড়ু ছিল,
ঘোড়া ঘোড়া ভাব,
সে তো ঘোড়া নয়।
দীপু দাদার নেতৃত্বে শুরু হলো মনি মামার ৩৯তম জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি। আমরা কী কী অনুষ্ঠান করেছিলাম, সত্যি বলতে আমার এখন আর মনে নেই। বড়দের মধ্যে নানদা, রীতা আপা ছিল, আর দীপু দাদার পরে আমরা সব ভাইবোন ছিলাম—এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। নিচের দিকের ভাইয়েরা তখন অতি ছোট। বাসার চৌকি একসঙ্গে করে দোতলার বারান্দায় স্টেজের পাটাতন বানানো হলো। মা ও মামিদের শাড়ি দিয়ে স্টেজের সৌন্দর্য এবং স্ক্রিন—সে এক এলাহি কাণ্ড। আমাদের সঙ্গে পাশের বাসার টুটুল ছিল সার্বক্ষণিক সঙ্গী। টুটুলের সঙ্গে সাম্মির নিয়মিত মারামারি হতো, আবার ভাবও হয়ে যেত।
আসলে বুর বাড়িতে একসঙ্গে থাকাই একটা অনুষ্ঠান—প্রতিদিনই তার একেকটা পর্ব। দিনে কার্ড, মনোপলি, ক্যারম, রাতে অন্ধকারে লুকোচুরি খেলা, কেউ ঘুমিয়ে গেলে কলম দিয়ে তার মুখে দাড়ি–গোঁফ আঁকা। আরও যখন ছোট ছিলাম—কুমির কুমির, দাঁড়িবান্ধা, গোল্লাছুট, রুমাল চুরি, ইচিংবিচিং। এসব খেলায় পাড়ার ছেলেমেয়েরাও এক হয়ে যেত আমাদের সঙ্গে। ঢাকা থেকে যখন বাবলু দাদা-চিত্রা আপা খুলনা আসতেন, তখন তো মহাফুর্তি! অবশ্য বড় খালা-খালু না থাকলেই মজা বেশি—বড় খালা ছিলেন খুব রাশভারী। আমার আবদার ছিল মামিদের কাছে।
প্রতিবছরই সামনের খোলা মাঠে স্টেজ করে অনুষ্ঠান হতো। আমরা দু-তিন দিনের জন্য বুর বাড়িতে সাময়িক ঘাঁটি গাড়তাম, সারা দিন হইচই, বিকেলে খেলাধুলা, তিন বেলা সিঁড়িঘরে পাত পেড়ে খাওয়াদাওয়া, সন্ধ্যায় আবার হুটোপুটি, সামনের ঝুপড়ি ঘর থেকে বাদাম ভাজার গন্ধ, সেই ঝুপড়িতে গিয়ে গরম বাদাম তুলে খাওয়া—আহা! মনে হয় যেন সেই সন্ধ্যার স্বপ্ন নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিই!
আমরা মামার জন্মদিন উপলক্ষে একটা হাতে লেখা পত্রিকা বের করেছিলাম, যেটার শিরোনাম ছিল, ‘উনচল্লিশের আমি’। ২৩ জুলাই রাতে আমার বুর একমাত্র জীবিত সন্তান আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তখন তাঁর বয়স ৮৯!
এবার চলে এল আমাদের পালা।
*লেখক: ডা. সানিয়া তহমিনা ঝোরা, অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]