গল্পটা বেস্ট ফ্রেন্ড–এর রিসিপশনের

ছবি: লেখকের পাঠানো

অনুষ্ঠান এতটাই আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল যে তার ফাঁকে কোথাও ঘুরে আসব মন শায় দেয়নি। সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণ আগে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান প্রায় শেষ, তখন এসে দীপুকে বললাম, তুমি ফ্রি থাকলে চলো তোমাদের এলাকার আশপাশটা একটু ঘুরে দেখি। বের হয়ে ওদের বাড়ি থেকে কয়েক কদম সামনে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। ফিরতি পথে সুন্দর একটা বাড়ি চোখে পড়তেই দাঁড়ালাম। বাড়ির মালকিন সামনেই ছিল। অনুমতি নিয়ে বাড়িটার ছবি নিলাম। আমার চোখে যে বাড়িটা সুন্দর, সেই বাড়িটাই ওনার কাছে সংকোচ মনে হচ্ছিল। এটার অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। সেই প্রসঙ্গে আর যাচ্ছি না।

তবে এই বাড়িটা যে আসলেই সুন্দর, কথাটার জোর বাড়াতে আমি আরও অনেক কথা বলে ফেললাম। যেই দীপুকে বললাম, এখানে আমাকে একটা ছবি তুলে দাও। তখন ওনার চোখমুখ দেখে মনে হলো, এখন কথাটা অল্প হলেও উনি ওন করছেন। সত্যি কথা বলতে গেলে বাড়িটার মধ্যে আমি আমার গ্রামের কিছু বিষয় রিলেট করতে পারছিলাম। যেমন টিনের চালের ঘর, গাছপালা, সন্ধ্যা হয়ে আসছে তাই মুরগিগুলোও খোঁয়াড়ে (মুরগি রাখার স্থান) যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যেহেতু আমি গ্রামেই বড় হয়েছি, তাই এই বিষয়গুলো আমাকে খুব টানে। অন্ধকার হয়ে আসছে, তাই দেরি না করে আমরাও অল্প কিছুক্ষণ থেকে বিদায় নিলাম।

সামনেই চায়ের একটা দোকান আছে। যাওয়ার সময় দীপু আর জুলিকে বলেছিলাম, ফিরতি পথে আমরা চা খাব। আমি চা–প্রেমী নই। তবে বিশেষ সময়ে চা আড্ডা বেশ ইনজয় করি। ব্যাপারটা এমন যে মন চাইলে খাই না চাইলে নাই। চায়ের দোকানটা বরের ঘরের গাঁ ঘেঁষেই বলা যায়। তাই আমাদের সময়ের খুব একটা তাড়া নেই বললেই চলে। শুধু উর্মিকে একবার ফোনকল দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে আমরা এখানে আছি। তারপর চা অর্ডার করলাম। কিন্তু কী আজব, দীপুর কথা হচ্ছে আমি আর জুলি ওদের এলাকার মেহমান, তাই ও চায়ের বিল দেবে। বড় হিসেবে আমি মোটামুটি উঁচু গলায় ওকে দমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]  

এর মধ্যেই চা চলে এসেছে। চায়ের চুমুকে মন ভালো হয়ে গেল। একটু আদা, লেবু আর লবণ, লাল পানির স্বাদ অনেক গুণ বাড়িয়ে দিল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দোকানি মামাকে জানালাম চা বেশ ভালো হয়েছে। শুধু ভালো নয় বরং বরাবর আমরা যে চা খাই, তার চেয়ে একটু বেশিই ভালো মনে হলো। আমার কথা শুনে দোকানি মুখে কিছু না বলে মুখ একটু নিচু করে মুচকি হাসছেন। দোকানে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও বেশ খুশি হলেন। চা আমাদের পছন্দ হবে কি না, এ নিয়ে ওনারাও কিছুটা শঙ্কায় ছিলেন। আমরা আসার পর থেকেই ওনারা আমাদের নিয়ে বিভিন্ন রকম মজা করছিলেন। একজন তো বলেই ফেললেন আপনি কিছু মনে করবেন না যেন। আমরা কিন্তু মজা করছি।

ছবি: লেখকের পাঠানো

উত্তরে বললাম আমি বুঝতে পারছি। আপনাদের এগুলো আমি ভালোভাবেই নিচ্ছি। আমার ভালোই লাগছে। তারপর আমাদের সাথে ওনাদেরও চা খাওয়ার জন্য বললাম। ওনারা অল্প কিছুক্ষণ আগেই চা খেয়েছে, তাই এখন আর খাবে না। ওনাদের সাথে কথা শেষ করে দীপু আর জুলির সাথে গল্পে তাল মেলাই। কে কবে ব্যাক করবে, দীপু কিসে পড়ে, কোথায় পড়ে—এসব বিষয় নিয়েই আমাদের কথা হচ্ছিল। দীপু দীপুর বাড়িঘর, মানুষ সম্পর্কে বলছিল। ওরা এখন আর এখানে থাকে না। আগের বাড়ি কোথায় এবং দোকানে উপস্থিত মানুষগুলো সম্পর্কে ওর কে কী হয়, এগুলো বলছিল।

আমাদের গল্প চলমান, খাওয়া এখনো শেষ হয়নি, কিন্তু কে যেন বিল দিয়ে জিগ্যেস করছে আমরা আর কিছু নেব কি না। যেই আমি বিল দিতে নিষেধ করলাম দীপু বলল, উনি আমার দুলাভাই হয়। আপনি বিল দেওয়ার বেকার চেষ্টা করে লাভ নেই। হয় ভাই দেবে না হয় আমি দিব। লাভ যে নেই এতক্ষণে আমিও এটা বুঝে গিয়েছি। চা শেষ করে উঠতেই দেখলাম আরেক দোকানে লোভনীয় গোলগোল্লা বানানো হচ্ছে। দেখলে যে কারও লোভ হবে। আমারও হচ্ছিল কিন্তু উদরপূর্তি অবস্থায় এগুলোর প্রকৃত স্বাদ পাব কি না, এ নিয়ে শঙ্কায় ছিলাম। তাই দোকানিকে জিগ্যেস করলাম কতক্ষণ থাকবেন, রাতে পাওয়া যাবে? উনিও সময় জানিয়ে দিলেন।

ছবি: লেখকের পাঠানো

এই ফাঁকে অনেক কিছুই ঘটল। তারপর রাতের দিকে আবার এখানে এলাম। তখন ভাইয়ার বোনকেও সাথে নিয়ে এসেছিলাম দীপুকে তখন পাইনি। এসে আমরা গোলগোল্লা নিলাম। খাওয়া শেষ না করতেই আরেকজন এসে বিল দিয়ে দিল। পাশেই একজন দাবা নিয়ে বসে আছেন। ওখানকার এক ভদ্রলোক এটা নিয়ে পোজ দিলেন কিছু। কীভাবে খায়, কী করে এগুলোও দেখালেন। আবার বলছে আমি খারাপ চোখে দেখছি কি না। আমি বললাম না এটা তো আপনাদের কালচার। এটা দেখতেও অনেক ইন্টারেসটিং।

যাহোক, গোলগোল্লা খেতে এত মজা ছিল মনে মনে ভাবছিলাম যাওয়ার সময় বান্ধবীর জন্যও দুইটা নিয়ে যাব। কিন্তু মুশকিল হলো যা অর্ডার করি তা-ই শেষ করার আগেই বিল হয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখে আর কিছুর দিকে নজর দেওয়ার ইচ্ছা হয়নি। ভাগ্যবশত আমাদের জন্য যেগুলো নিয়েছিলাম, সেগুলো থেকে একটা বেঁচে গিয়েছিল। এটাই ওর জন্য প্যাক করে নিয়েছিলাম। যদিও আমরা যেমন স্বাদ অনুভব করেছি ও হয়তো তার চেয়ে একটু ভিন্ন স্বাদ অনুভব করেছে। কারণ খাওয়া শেষে আমরা রাতের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করেছি। বাঁদরামি করেছি আনলিমিড।

ছবি: লেখকের পাঠানো

সময় যাওয়ার সাথে সাথে রাস্তায় ঠান্ডার মাত্রাও বাড়ছিল। তাই মনে হলো এখন যাওয়া উচিত। যেতে যেতে একটা লুডু ঘরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম। কিন্তু এত অল্প সময়ে লুডু ঘর ম্যানেজ করার কোনো পথ নেই। তাই সোজা রুমে গিয়ে একেকটা চিতপটাং হয়ে শুয়ে পড়ি। গল্প-আড্ডায় খাওয়ার সময় হয়ে যায়। তারপর খেয়েদেয়ে আরেক দফা এলোমেলো আড্ডা শেষে ঘুমেরও সময় চলে আসে। সকালে বাস, তাই ব্যাগ গোছগাছ করে ঘুম দেওয়ার মাধ্যমে সুন্দর দিনটার ইতি টানার ইচ্ছা না থাললেও টানতে হলো। সুন্দর সময়গুলো স্মৃতি হিসেবে থাকুক। আর নতুন নতুন এমন আরও সুন্দর সুন্দর সময় কাটানোর সুযোগ হোক।

লেখক: মুসলিমা জাহান তন্বী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়