ভিড়, ভয় ও অস্বস্তি: নারীর চোখে বাংলাদেশের শহর পরিবহন ও নিরাপদ যাত্রার স্বপ্ন

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে নারীর পরিবহন: সুবিধা কোথায় আর নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলাদেশের রাস্তা আজও নিস্তরঙ্গ নয়। প্রতিদিন সকালে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা বন্ধু ঘরে যাওয়া–আসা করতে হাজারো মানুষ ট্রাফিকের ভিড় পেরিয়ে চলেন। কিন্তু এই ভিড়ে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় আছেন নারীরা। বাস, মেট্রো, লেগুনা বা যেকোনো গণপরিবহনে তাঁদের যাত্রা যেন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। আমি নিজেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁদের অপেক্ষা, ভিড়, অস্বস্তিকর স্পর্শ এবং মানসিক চাপ দেখেছি। এটা আমার ব্যক্তিগত গবেষণা ও আমার চোখের দেখা বাস্তবতা। দেশের লক্ষাধিক নারী প্রতিনিয়ত এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে।

পরিসংখ্যান: ভয় বের হওয়া সংখ্যা—

সরকারি ও স্বতন্ত্র গবেষণা প্রকাশ করেছে কিছু হতাশাজনক, বরং উদ্বেগজনক তথ্য। বিভিন্ন সার্ভে ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনের সামারি, সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে পাওয়া যায়:

১. ঢাকাস্থ নারীর মধ্যে ৬৩.৪ শতাংশ দাবি করেছেন যে গত ছয় মাসে গণপরিবহনে তাঁরা আচরণগত হয়রানির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে যৌন প্রকৃতির শব্দ, অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ বা অশালীন মন্তব্য প্রাধান্য পায়।

২) দেশব্যাপী সমীক্ষায় ৮৭ শতাংশ নারীর কোনো না কোনো সময়ে হয়রানি হয়েছে এবং ৩৬ শতাংশ নারী নিয়মিত এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।

৩) ঢাকায় নারীর ৭৯ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা গত বছরে অন্তত একবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

৪) কিছু গবেষণায় দেখা গেছে বাস, মেট্রো, কিংবা লেগুনায় নারীদের প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ ভ্রমণটাই অসম্মান বা অস্বস্তিতে ভরা।

এই সংখ্যা কেউ গোপন করছে না বরং সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে।

বাস, মেট্রো, লেগুনা: আমার দেখা বাস্তবতা

আমি নিজেও বহুবার এই অভিজ্ঞতা নিয়েছি:-

সকালে বিভিন্ন রুটের বাসে নারীরা এমনভাবে চাপা পড়ে যান যে হাতেই পা ওঠা যায় না।

- মেট্রোরেলের সংরক্ষিত বগিতে পুরুষদের অনুপ্রবেশ, ভিড়ে টানাপোড়েন, কানে অশালীন শব্দ—সবটাই চোখের সামনে।

- লেগুনায় চলাফেরা করলে নারীরা প্রায়ই অচেনা স্বরের অশোভন মন্তব্যসহ অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ সহ্য করেন।

নারীরা ভিড়ে কখনো ঠেলাঠেলি, কখনো মানসিক চাপ অথচ মুখে একটা শান্ত ভাঁজ! তাঁদের চোখে ভয়, কিন্তু মুখে এক অশান্তি। কেন? কারণ ভয় দেখাতে হয় না, সেটা নীরবে সহ্য করেই জীবন চালিয়ে নিতে হয়।

এই অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়। অনেক নারীই স্বীকার করেন, তাঁরা প্রতিদিন এমন অস্বস্তি অনুভব করেন, মাঝেমধ্যে ডিপ্রেশনে যেন ট্রাফিকও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

সমস্যা কোথায়, কেন বাড়ছে?

১. ভিড়; নারীর জায়গা নেই—

বাংলাদেশের জেলা শহরগুলোতে গণপরিবহনর সর্বদা ভিড়। যেখানে প্রতিটি সিটই অধিকাংশ সময় ওঠানামা করে ফাঁকা থাকে না; বরং দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ঠেলাঠেলিতে পুরে পূর্ণ। এমন ভিড়, এই নারীর ব্যক্তিগত স্পেস থাকে না।

২. আইন নেই বললেই চলে—

হয়রানির বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নেই। মামলা হয়, কিন্তু দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া, সময়, মূল্য, সাহস—সব মিলিয়ে অনেকেই মামলা করার আগে ফিরে যান।

৩. পর্যাপ্ত মনিটরিং সিস্টেমের অভাব—

কিছু কিছু বাস, মেট্রো বা লেগুনায় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা কার্যকরভাবে মনিটর বা ব্যবহৃত হয় না।

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

৪. সঠিক ট্রেনিং নেই—

চালক, সহকারী বা পরিবহনকর্মীদের লিঙ্গ সেবাশিল্পে ট্রেনিং নেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই।

৫. সমাজের মানসিকতা—

বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন, ‘এটা তো ছোট ব্যাপার’ বা ‘আপনার ধারণা ভুল’—এই মানসিকতা সমস্যাটিকে ছোট করে দেয়।

স্যাটায়ার: বাস্তবতা আর ব্যঙ্গ

প্রচুর স্যাটায়ারিক ভুল–বোঝাবুঝিও আছে। যেমন ধরি, বাসে উঠলে নারীর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। তবে শুধু ‘নারী আসন’ সিট বোর্ডে, আর স্ট্যান্ডিংয়ে এবার নাম্বার লাগল। ‘সাড়ে সাতজন মেয়ের কাছে ১০ জন পুরুষ না!’

হাস্যকর মনে হলেও এটিই বাস্তবের ব্যঙ্গাত্মক ছবি—সমস্যার সমাধানে শুধু ঘোষণা হয়, বাস্তব উদ্যোগ দেখা যায় না।

সমাধান: আজই শুরু করতে হবে

১. নিরাপত্তা সিস্টেম শক্ত করা। বাস, মেট্রো, লেগুনায় প্রতিটি ভান্ডারে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ লাইভ মনিটরিং।

যোগাযোগব্যবস্থা দৃঢ় করা যাতে নারীরা পুলিশ বা হেল্পলাইন দ্রুত পায়।

২. ট্রেনিং ও সচেতনতা

চালক, সহকারীদের লিঙ্গসচেতনতা শেখানো এবং পরিবহন স্টাফদের প্রশিক্ষণ: সহায়তা, সহানুভূতি, নিরাপত্তা বার্তা।

৩. আইনে দ্রুত ফলাফল

হয়রানি–সম্পর্কিত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, সংযমহীন কিংবা অপরাধীকে কঠোর শাস্তি এবং সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা।

৪. পরিবহন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ

মেয়েদের পরিবহনব্যবস্থায় পরিকল্পক/পরিচালক/পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখা। শহর সড়ক উন্নয়ন বোর্ডে নারীর প্রতিনিধি সোচ্চার করা।

ভবিষ্যৎ কাঞ্চন চিত্র—

একদিন প্রতিটি নারীর মুখে যেন এই শব্দ থাকে: ‘ভয় লাগে না’। আমরা চাই নারীরা যেন হাসিমুখে বাসে ওঠে, মেট্রোয় চড়ে, লেগুনায় বসে যেন তাঁদের যাত্রা নিরাপদ, সম্মানজনক ও মানসম্মত হয়। হারিয়ে যাক ভিড়ের চাপ, অশালীন মন্তব্য, অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ আর রুখে দাঁড়াক সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের আলোয়। এটা শুধু সংস্কার নয়, এটা মানবিক দায়বদ্ধতা।

শেষ কথা—

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়ন করছে, কিন্তু নিরাপদ গণপরিবহন এবং নারীর নিরাপত্তা উন্নয়নের পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্য পূরণ করা এখনো বাকি। আপনার, আমার, আমাদের সবার উদ্যোগের ফলে যদি একদিন এ দেশটি এমন পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে যেখানে নারীরা ভিড় না ভয়ে, নিরাপদে ও হাসিমুখে চলাচল করতে পারে, সেটা হবে দেশের প্রকৃত অগ্রগতি।