লাল ঘোড়া আর কচুপাতার দিনগুলো

অলংকরণ: মাসুক হেলালগ্রাফিকস: প্রথম আলো

স্মৃতি মানুষের জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে শৈশবের সেই ধুলোমাখা দিনগুলো যখন ফিরে দেখি, তখন মনে হয় জীবনটা কতই না সহজ-সরল, আনন্দময় ও প্রকৃতিনির্ভর ছিল। আজকের যান্ত্রিক নাগরিক জীবনের কোলাহলে সেই দিনগুলো যেন এক একটি স্নিগ্ধ সজীবতার আখ্যান।

আমার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল আমাদের এলাকার আলোকবর্তিকা রূপাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রূপাখাড়া গ্রামে ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এ অঞ্চলের দেড় শ বছরের বেশি সময়ের জ্ঞানালোকের উৎস।

সময়টি ছিল ১৯৭৮ সালের এক গ্রীষ্মের সকাল। আজ স্মৃতির ডায়েরির পাতা উল্টে মনে পড়ছে আমার স্কুল জীবনের সেই প্রথম দিনটির কথা। বয়সে ছোট থাকলেও সেই দিনের অনুভূতির তীব্রতা ছিল প্রখর। সকালে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে পান্তাভাত খেয়ে মেজ মামার হাত ধরে আমি প্রথম স্কুলের আঙিনায় পা রাখি। বড়দের হাত ধরে অজানার পথে পা বাড়ানোর সেই মিশ্র অনুভূতিÑভয় আর উত্তেজনা আজও আমাকে শিহরিত করে। মামার সেই ভরসার হাতটিই আমাকে চিনিয়েছিল এক নতুন ও অচেনা জগৎকে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

স্কুলের আঙিনায় পা দিয়েই সেদিন আমি অবাক হয়েছিলাম। প্রথম দিনেই কোনো বই-খাতার নীরস চাপ নয়, বরং আমি সাক্ষী হলাম এক জাঁকজমকপূর্ণ ‘বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানের। বড় ভাই-বোনদের কেউ গান গাইছে, কেউ আবৃত্তি করছে, আবার কেউবা মগ্ন হয়ে অভিনয় করছে। সেই শৈশবে প্রথম দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম, স্কুল মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের চারদেয়াল নয়; স্কুল মানে শিল্প, সংস্কৃতি আর নিজেকে আত্মপ্রকাশের এক বিশাল আকাশ।

আমাদের সময় স্কুল ছিল সত্যিকারের এক উৎসবের নাম। স্কুলঘরটি ছিল মাটির তৈরি, ওপরে টিন। জানালা-দরজার কপাটগুলো ছিল অবারিত। আমরা অনেক সময় দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে জানালা দিয়েই লাফিয়ে ক্লাসে ঢুকতাম। দ্রুত বইপত্র বেঞ্চে রেখে বিশাল মাঠে দৌড়ে গিয়ে শুরু করতাম খেলাধুলা। ঘণ্টা পড়ার আগ পর্যন্ত চলত এই অদম্য দস্যিপনা। তখন আশপাশে কোনো দোকানপাট ছিল না, এমনকি ‘টিফিন’ মানে যে সুস্বাদু জলখাবার, তা–ও আমাদের জানা ছিল না। আমাদের কাছে টিফিনের বিরতি মানেই ছিল প্রখর রোদের মধ্যে প্রাণভরে ধুলোমাখা খেলা। আর বর্ষায় যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামত, তখন মা–বাবার শাসন অমান্য করে মাথায় কচুপাতার প্রাকৃতিক ছাতা দিয়ে, শার্ট খুলে বইয়ের চারপাশ দিয়ে বেঁধে আমরা ভিজতে ভিজতে স্কুলে যেতাম।

আমাদের স্কুলের শিক্ষকেরা ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, তবে শাসনে ছিলেন কড়া। তাঁরা প্রায় সবাই আশপাশের গ্রাম থেকে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে স্কুলে আসতেন। রূপাখাড়া গ্রামটি আগে থেকেই এ অঞ্চলের মধ্যে আলোকিত গ্রাম ছিল এবং এই গ্রামেরই আমাদের চারজন শিক্ষক ছিলেন। প্রধান শিক্ষক সুদর্শন সাত্তার স্যার ছিলেন অত্যন্ত রাগী মানুষ; অনিয়ম তিনি বিন্দুমাত্র বরদাশত করতেন না। আমরা তাঁকে রীতিমতো বাঘের মতো ভয় পেতাম। ঠিকমতো পড়া না পারলে জুটত জোড়া বেতের পিটুনি।

তবে আমাদের শৈশবের সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্র ছিলেন মান্নান স্যার। ছোটখাটো মানুষটি সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ছোট আকৃতির এক লাল রঙের ঘোড়ায় চড়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে স্কুলে আসতেন! স্কুল মাঠের গাছের সঙ্গে ঘোড়াটিকে বেঁধে রাখতেন তিনি। ঘোড়াটি দেখতে অনেকটা গাধার মতো মনে হলেও আমাদের শিশুচোখে তা ছিল রূপকথার বাহন। আমরা সুযোগ পেলেই সেই ঘোড়াটির সঙ্গে দুষ্টুমি করতাম। স্যার কানে কিছুটা কম শুনতেন, তাই অনেক সময় সঠিক উত্তর দিলেও কপালে পিটুনি জুটত। তাঁর সেই ঘোড়ায় চড়ে আসার দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।

অন্যদিকে ধুবিল গ্রামের সিরাজ স্যার ছিলেন খুব নরম প্রকৃতির, আমাদের খুব যত্ন করতেন। স্কুলের পাশের বাড়ির সুন্দর চেহারার জলিল স্যার কথা কম বলতেন, কিন্তু দুষ্টুমি করলে পেনসিল দিয়ে পেটে চিমটি কাটতেন। আর আমার চাচা ও শিক্ষাগুরু আজিজুল হক ছিলেন আমাদের সবচেয়ে আধুনিক পোশাকধারী শিক্ষক। তিনি অত্যন্ত যত্ন করে আমাদের হাতে-কলমে শিক্ষা দিতেন; বিশেষ করে ইংরেজি পড়াতেন চমৎকার। আর আমাদের একমাত্র মিনি আপা ছিলেন একেবারে মায়ের মতো স্নেহময়ী।

সকালের রোদে পিটি করা, টিফিনের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে ধুলোবালি মাখা আর শিক্ষকদের সেই শাসন ও সোহাগ—সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ। আজকের দিনের প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনার যান্ত্রিকতায় সেই অবারিত আনন্দ হয়তো অনেকটাই ম্লান। কিন্তু আমাদের কাছে স্কুল ছিল এমন এক ঠিকানা, যেখানে যাওয়ার জন্য কোনো তাড়া ছিল না, ছিল কেবল এক অদম্য টান।

রূপাখাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আজও তার ঐতিহ্য নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু আমার মনে ১৯৭৮ সালের সেই বিচিত্রা অনুষ্ঠানের সুর আজও প্রতিধ্বনিত হয়। মেজ মামার হাত ধরে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। জীবনের এই প্রান্তে এসেও আমি যখনই চোখ বন্ধ করি, সেই মাটির ঘরের জানালার পাশে ফিরে যাই; যেখানে শুরু হয়েছিল আমার স্বপ্নের পথচলা। সেই সহজ-সরল, আনন্দময় ও প্রকৃতিনির্ভর শৈশবই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা