ত্রাণের নামে গোপনীয়তা লঙ্ঘন: বিপন্ন মানুষের আত্মসম্মান রক্ষায় চাই আইন
সম্প্রতি প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশজুড়ে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ফেনী, কুমিল্লা ও দেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন পানির নিচে। এই চরম দুর্যোগে লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কিন্তু এই ভয়াবহ সংকটের মধ্যেও এক অদ্ভুত ও হৃদয়বিদারক চিত্র সামনে আসছে—বন্যাকবলিত এলাকার অনেক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ তীব্র খাবার ও পানির সংকট থাকা সত্ত্বেও ত্রাণ নিতে সামনে আসতে চাচ্ছেন না। এর কারণ হতে পারে ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ভয়’। এক শ্রেণির কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার ও তথাকথিত সমাজসেবীরা ত্রাণের এক প্যাকেট চাল বা শুকনা খাবার দেওয়ার বাহানায় অসহায় মানুষের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। বন্যার পানির চেয়ে এই লোকদেখানো প্রচারণাকে বেশি ভয় পাচ্ছেন বন্যাদুর্গত ব্যক্তিরা। কারণ, সামান্য ত্রাণের বিনিময়ে তাঁদের অসহায়ত্বের দৃশ্য ইন্টারনেটে চিরদিনের জন্য বন্দী হয়ে যাচ্ছে, যা তাঁদের আত্মসম্মানকে চরমভাবে ধূলিসাৎ করছে।
এই বন্যাদুর্গত মানুষেরা কোনো পেশাদার সাহায্যপ্রার্থী নন, তাঁরা প্রকৃতির নির্মমতার শিকার হওয়া স্বাধীন ও মর্যাদাবান নাগরিক। কিন্তু ত্রাণের নামে এই দারিদ্র্য প্রদর্শনের নোংরা প্রতিযোগিতা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক, কমেন্ট ও ভিউ পাওয়ার সস্তা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বন্যার্ত ব্যক্তিদের মলিন ও বিপর্যস্ত মুখের ভিডিও আপলোড করে প্রচারের এই আলো তৈরি করা হচ্ছে। এটি শুধু সাময়িক লজ্জাই দিচ্ছে না; বরং ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তি ও তাঁদের সন্তানদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জীবনধারণের অধিকার সুরক্ষিত থাকলেও ত্রাণের এ প্রচারণায় মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও প্রাইভেসি চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বর্তমান সাইবার নিরাপত্তা বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা না থাকায় ‘জনসচেতনতা’ বা ‘মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার’ অজুহাত দিয়ে এই আইনি ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাচ্ছেন ভিডিও নির্মাতারা।
এই অনৈতিক ও অমানবিক প্রবণতা বন্ধ করতে হলে বাংলাদেশে অবিলম্বে সাহায্যগ্রহীতার পরিচয় ও সম্মান রক্ষাসংক্রান্ত একটি সুস্পষ্ট ও স্বাধীন আইন পাস করা এখন সময়ের দাবি। প্রস্তাবিত এই আইনের মূল লক্ষ্য হতে হবে সাহায্যপ্রার্থী মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি শতভাগ নিশ্চিত করা। আইনটিতে মূলত দুটি কঠোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। প্রথমত, ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সাংগঠনিক, যেকোনো পর্যায়ে ত্রাণের ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশের ক্ষেত্রে সাহায্যগ্রহীতার মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ব্লার (অস্পষ্ট) রাখা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই তাঁর পরিচয় প্রকাশ না পায়। দ্বিতীয়ত, অনুমতি ছাড়া কিংবা জোরপূর্বক কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষের মুখমণ্ডল ভিডিওতে প্রদর্শন বা প্রচার করে তাঁর প্রাইভেসি লঙ্ঘন করলে মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা ও অনাদায়ে কঠোর কারাদণ্ডের মতো সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান থাকতে হবে।
বিশ্বের বহু উন্নত দেশ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন: ইউনিসেফ বা ইউএনএইচসিআর) দুর্যোগকবলিত মানুষের ছবি তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ‘এথিক্যাল ফটোগ্রাফি’ বা নৈতিক নির্দেশিকা মেনে চলে, যেখানে মানুষের আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন হয়, এমন ছবি প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলাম ধর্মেও লোকদেখানো দানকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের এই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা অনুযায়ী গোপনে দান করাই হওয়া উচিত প্রকৃত মানবিকতার মূল ভিত্তি। ত্রাণ দেওয়া ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ, কিন্তু মানবিকতার এই কাজের আড়ালে কারও আত্মসম্মান ও প্রাইভেসিকে হরণ করা একধরনের সামাজিক অপরাধ। সরকারকে অনতিবিলম্বে বর্তমান বন্যা পরিস্থিতির এই বাস্তব সংকটকে আমলে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ত্রাণ বিতরণের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষের শতভাগ প্রাইভেসি রক্ষায় একটি যুগোপযোগী ও সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। কারণ, রাষ্ট্র যদি আইনের মাধ্যমে তার নাগরিকদের এই ন্যূনতম মৌলিক সম্মানটুকু নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তা হবে সামগ্রিকভাবে একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের পরাজয়।
*লেখক: মো. মাহমুদুর রেজা, শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]