‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় সাইলেন্সার কেন ৫ সেপ্টেম্বর লিখেছিলেন
প্রতিবছর ৫ সেপ্টেম্বর এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করেই একটি বিশেষ তারিখ ও দেয়ালের ছবি ভেসে ওঠে। বলিউডের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর দর্শকমাত্রই দৃশ্যটির সঙ্গে পরিচিত। রাজকুমার হিরানি পরিচালিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অমি বৈদ্য অভিনীত ‘সাইলেন্সার’ (চতুর রামালিঙ্গম) চরিত্রটি বন্ধুদের তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে রাতের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কংক্রিটের দেয়ালে ৫ সেপ্টেম্বর তারিখটি লিখে রেখেছিল। উপরিউক্ত তথ্য ও তৎকালীন পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সাধারণ একটি তারিখ কেবল একটি সিনেমার নাট্যদৃশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মানসিকতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
সেদিন সিনেমায় ৫ সেপ্টেম্বর তারিখটি বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক এক বিশেষ উপলক্ষ। ভারতে প্রতিবছর ৫ সেপ্টেম্বর দিনটি স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন স্মরণে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। রাধাকৃষ্ণন নিজে একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ ছিলেন। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর শিক্ষার্থীরা যখন তাঁর জন্মদিন উদ্যাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তিনি প্রস্তাব দেন, তাঁর ব্যক্তিগত জন্মদিনের বদলে ৫ সেপ্টেম্বর দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করতে। সেই ঐতিহ্য থেকেই ভারতের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই দিনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার গল্পে এই শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানই হয়ে ওঠে এক বড় মোড়। চতুর ওরফে সাইলেন্সার ছিল অন্ধ মুখস্থবিদ্যা ও তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের প্রতীক। অর্জিত জ্ঞানের গভীরতা বা অর্থ না বুঝে কেবল পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ও তোষামোদি করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে ডিন ‘ভাইরাস’-কে সন্তুষ্ট করতে সাইলেন্সার হিন্দি ভাষায় এক দীর্ঘ ভাষণ মুখস্থ করে উপস্থাপন করার প্ল্যান করে। এই প্ল্যানে জল ঢালে র্যাঞ্চোর দাস চঞ্চল। সাইলেন্সারের ভাষণের পাণ্ডুলিপিতে থাকা কয়েকটি শব্দের পরিবর্তন করে দেয়। যেমন ‘চমৎকার’ শব্দটির জায়গায় ‘ধর্ষণ’ বা ‘বলাৎকার’ বসিয়ে দেওয়া। ভাষার অর্থ না বুঝে কেবল তোতাপাখির মতো মুখস্থ বক্তব্য দিয়ে পুরো মিলনায়তনের সামনে চরম হাস্যকর ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়ে সাইলেন্সার।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শিক্ষক দিবসের সেই চরম নাজেহাল অবস্থা সাইলেন্সারের অহংবোধে তীব্র আঘাত হানে। অনুষ্ঠান শেষে র্যাঞ্চো দাস ও তার বন্ধুদের সামনে দাঁড়িয়ে সাইলেন্সার একটি খোলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। সে ঘোষণা করে, ঠিক ১০ বছর পর এই ৫ সেপ্টেম্বর তারা আবার এই ক্যাম্পাসে এক জায়গায় মিলবে এবং দেখবে, কে জীবনে বেশি সফল। আনন্দের সঙ্গে জ্ঞানার্জন করা র্যাঞ্চো, নাকি মুখস্থবিদ্যা দিয়ে সাফল্য অর্জনের পেছনে ছোটা সাইলেন্সার। সেই প্রতিশ্রুতির স্মারক হিসেবেই সে ক্যাম্পাসের দেয়ালে খোদাই করে লিখে রেখেছিল ৫ সেপ্টেম্বর। ফলে সিনেমার পরিপ্রেক্ষিতে এই তারিখ শ্রদ্ধার্ঘ্যের শিক্ষক দিবসের চেয়েও সাইলেন্সারের ব্যক্তিস্বার্থ, অহংকার ও ‘প্রতিশোধের’ প্রতীকে রূপান্তরিত হয়।
সিনেমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘটনাটি কৌতুকাবহ হলেও এর পেছনে রাজকুমার হিরানি যে সামাজিক বার্তাটি দিতে চেয়েছেন, তা অত্যন্ত নিখুঁত। সিনেমার দীর্ঘ ১৭ বছর পর আজও ৫ সেপ্টেম্বর এলে মানুষ যে এই দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করে তার কারণ, এটি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার গলদগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
লেখক: শিক্ষক