দলকে জিতিয়ে রুপনা চাকমা কী দারুণভাবে বলে দিলেন, ‘আজ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের এই সেরা গোলরক্ষকের অর্জনটা আমার মায়ের জন্য এবং দেশবাসীর জন্য উৎসর্গ করলাম। আমি যে পরিবার থেকে উঠে এসে আজ এই অর্জনটা করলাম, তা হয়তো বলে শেষ করা যাবে না। আমার মা ছাড়া যাঁরা আমার জন্য সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। আশা রাখি, আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতা পাব। দেশের হয়ে আরও সুনাম বয়ে আনতে পারব। আপনাদের আশীর্বাদ ও অনুপ্রেরণাই আমার পথচলা এবং সুদূরে এগিয়ে যাওয়া!’

তাঁদের প্রশংসায় আমরা পঞ্চমুখ নয় শুধু, লাখোমুখ হয়ে যাচ্ছি। বহুত্ববাদের সুপার আইকন সাবিনা-কৃষ্ণা-রুপনারা শিরোপা জেতার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কেউ বলছে না, নারীদের ফুটবল খেলা ঠিক হয়নি। তাঁদের পোশাক নিয়েও কথা নেই। ফেসবুক ফিডে ভাসমান নারীর প্রতি সাইবার বুলিং, ভর্ৎসনা, টিপ্পনী ও গালাগালের জায়গা নিয়েছে হার্দিক অভিবাদন।

এই কয় দিনে এ এক বিস্ময়কর বদল আমাদের! নারীরাই পারবেন তাঁদের অর্জন দিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে। যদি তাঁদের মনপছন্দ জায়গাটি খুঁজে নেওয়ার স্বাধীন ইচ্ছাতে বেড়ি পরানো না হয়।

default-image

তাঁদের জয়ে পুরো বাংলাদেশ আজ এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে। বীরকন্যাদের আমরা রাজসিক সম্মাননা দিতে পেরে নিজেরাই ধন্য হয়ে গেছি। বাংলাদেশে এমন দৃশ্য এর আগে দেখা যায়নি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় শিরোপাজয়ী নারী ফুটবলাররা ছাদখোলা বাসে রাজধানী ঢাকা শহরে চ্যাম্পিয়ন প্যারেড করছেন, হাজারো মানুষ সেই গাড়ির পেছনে বাংলাদেশের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন। বর্ণিল ও বিচিত্র প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ, স্কুলের শিশু কিংবা বেখেয়াল পথচারীরা পর্যন্ত। এ যেন নারীশক্তির এক অনির্বচনীয় সুন্দর প্রদর্শনী।
নারীদের জন্য এ পথটুকু পাড়ি দেওয়াটা মোটেও সহজসাধ্য ছিল না।

এ ফুটবলশিল্পীদের আমরা কী দিতে পেরেছি?
না, কোনো সম্মানজনক অর্থনৈতিক সাপোর্ট, না কোনো বিশ্বমানের কোচিং! রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বাইরে নন এই মেয়েরা। ছেলেরা খেলাধুলা করে যেখানে বাড়তি আয়ের বাইরেও শুধু বার্ষিক বেতন পান কয়েক লাখ, সেখানে নারী অ্যাথলেটদের মাসিক আয় কয়েক হাজার। ছেলেদের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালে করপোরেট হাউসগুলো। কিন্তু নারীদের বেলায় নামী কোনো স্পনসর আসে না। অথচ এই মাটির অমৃত সন্তান ওই নারীরাই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরায় নিয়ে গেছেন।

নেপালের কাঠমান্ডুতে ২০১৮ সালে পাকিস্তানকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ স্বর্ণকিশোরীরা আমাদের ফুটবল অঙ্গন মাতিয়ে দিয়ে বিশ্বসভায় তাদের জাত চিনিয়েছিল। বিশ্বের ৫টি দলকে টানা হারিয়ে দিয়ে অপরাজিত থেকে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। সেই তাদেরকেই কিনা চরম অসম্মান ও লাঞ্ছনা উপহার দেওয়া হয়েছিল। খেলা শেষে কোনো নিরাপত্তা না দিয়ে একটি লোকাল বাসে করে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুরে তাদের আঁতুড়ঘরে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেশির ভাগ সদস্যের বাড়িটা ওখানেই।

গাড়িতে অভিভাবকহীন এসব কীর্তিমতী ফুটবলারকে একা পেয়ে উত্ত্যক্তও করে ছেড়েছিল কিছু কাপুরুষ। এলাকায় যাওয়ার পরও অনেক ফুটবলার লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার শিকার হয়েছিলেন। অল্প বয়সী এই মেয়েদের প্রতি এতটা অসম্মান, অযত্ন, উপেক্ষা, অনাদর ও অবহেলা কেন দেখানো হয়েছিল? এ প্রশ্নই সে সময় ঘুরপাক খাচ্ছিল সর্বত্র। বাঙালির অন্যতম সুপার কোচ গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে সে সময় কলসিন্দুরেই মেয়েরা প্রশিক্ষণ নিত। সেই মেয়েদের অধিকাংশই এখনো জাতীয় দলের খেলোয়াড়, যাঁরা রাজধানী ঢাকায় একটা বিশেষায়িত মাঠ না পাওয়া সত্ত্বেও দেশের জন্য বিজয়গৌরব এনে দিয়েছেন।

default-image

এখন দিন বদলেছে। এমন মেয়েদের নিয়ে এতটুকু সমালোচনা আর চলে না। এখন শুধু গর্বে সবার বুক ভরে ওঠার পালা। যে প্রান্তিক পরগনায় ওদের জন্ম, তারা অনুভব করছে এই মেয়েদের মর্ম। ঘরে ঘরে এমন একজন কন্যাসন্তানকে না চাইবে? নারী যদি সামান্য সুযোগও পায়, অসামান্য কারিশমা সে দেখিয়ে দিতে পারে।

আমাদের চিন্তাশৈলীর এই যে পরিবর্তন বাঙালি সমাজে এনে দিলেন আমাদের বীরকন্যারা, তাঁদের প্রতি দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করাটাই আমাদের সমুচিত কর্তব্য। তাঁরা না চাইলেও নিজ দেশে তাঁদের আগমনে রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে লাল–সবুজে মোড়ানো পতাকার সম্মাননাই তাঁদের প্রাপ্য ছিল। এই বিজয়ী নারীরাই হতে পারেন আমাদের ঝুলে যাওয়া পশ্চাৎপদ সমাজব্যবস্থার সত্যিকারের পরিবর্তনের সারথি।

আমাদের মেয়েরা শুধু মাঠেই ফুটবলের শিল্প গড়েন না, তাঁরা কথাও বলেন ভীষণ প্রাজ্ঞতায় মেপে। ফাইনালের আগে স্ট্রাইকার সানজিদা খাতুন তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘আমাদের সমাজদর্পণ তো ওদেরই হওয়া উচিত।’ ফাইনালের মঞ্চে নামার আগে সানজিদা আক্তার তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘যাঁরা আমাদের এই স্বপ্নকে আলিঙ্গন করতে উৎসুক হয়ে আছেন, সেই স্বপ্নসারথিদের জন্য এটি আমরা জিততে চাই। নিরঙ্কুশ সমর্থনের প্রতিদান আমরা দিতে চাই। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনীকে এক পাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই।’

পাহাড়ের কাছাকাছি স্থানে বাড়ি আমার। পাহাড়িদের ভাইবোনদের লড়াকু মানসিকতা, গ্রামবাংলার দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের হার না–মানা জীবনের প্রতি পরত খুব কাছাকাছি থেকে দেখা আমার। ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে লড়ব এমন নয়, ১১ জনের যোদ্ধাদল মাঠে থাকবে, যে দলের অনেকে এই পর্যন্ত এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে।

আমরা জীবনযুদ্ধেই লড়ে অভ্যস্ত। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে যাব। জয়পরাজয় আল্লাহর হাতে। তবে বিশ্বাস রাখুন, আমরা আমাদের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখব না ইনশা আল্লাহ। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।

সাবিনা, শিউলি, শামসুন্নাহার, আঁখি, মাসুরা, মণিকা, সানজিদা, মারিয়া, কৃষ্ণা, সিরাত, তহুরা, নীলুফার, ঋতুপর্ণা, রুপনা চাকমারা তাঁদের দেওয়া কথা ঠিকঠাক রেখেছেন। আর কিছুই চাওয়া নেই তাঁদের। তাঁদের শুধু দরকার সুন্দর খেলার মাঠ, ন্যূনতম আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বমানের কোচিং।

যাঁরা এখনো পোশাক, শিক্ষা, কর্ম নিয়ে বিভ্রান্তিকর গবেষণা করছেন, টিপ্পনী মারছেন, তাঁরা প্রগতিবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাস্যাস্পদ সাজবেন না! আমাদের মায়েরা তাঁদের সমস্ত অর্জন সবার সঙ্গে সমানভাবে ভাগ করে নিলেন। প্রকৃতিগতভাবে আপনি পুরুষ বলে সামাজিক ও ঐশ্বরিক সুবিধাবাদ বেশি পান বলে নারীর প্রাপ্য মর্যাদা কেন দেবেন না! এক বাংলাদেশের মানুষ হয়ে কেন মানবেন না যে মায়েরা জিতে গেলে জয়ী হয় মানুষ।

* লেখক: সাংবাদিক

আয়োজন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন