রক্তে ভেজা সাদা শার্ট
১.
১৮ জুলাই। বৃহস্পতিবার দুপুর। ফাহিম বসে আছে বারান্দায়। উদাস মনে চেয়ে আছে রাস্তার দিকটায়। বাসায় থাকতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু সে কিছুতেই বের হতে পারছে না। তার মা তার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কোনোভাবেই যেন সে বাইরে আজ না বেরোয়। ফাহিমের ছোট একটা আদরের বোন আছে—আয়েশা। ওরা পিঠাপিঠি। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সে খুব কড়াভাবে তার দায়িত্ব আনজাম দিচ্ছে। ভাইয়ের প্রতি তার অসম্ভব ভালোবাসা—তা দেখলেই বোঝা যায়।
ফাহিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আয়েশার রুমে উঁকি দিল। আয়েশা উপুড় হয়ে গল্পের বই পড়ছে। ফাহিম ডাক দিতে চেয়েও দিল না। সে তার রুমে চলে এল। কিছুই ভালো লাগছে না। খুব যেতে ইচ্ছা করছে মিছিলে। ঘরে বসে থাকতে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। সে ছাড়া মা–বোনকে দেখার মতো আর কেউ নেই এ পৃথিবীতে। বাবার ছায়া দীর্ঘ হয়নি তাদের ওপর। পুরো জীবনের গ্লানি টানছে তার মা একাই। ফাহিমকে সব সময় চোখে চোখে রাখে। ও আড়াল হলেই যেন সূর্য আড়াল হয়ে যায়, পুরো পৃথিবীতে নেমে আসে অন্ধকার। পায়ের তলার মাটি পর্যন্তও সরে যায়।
ফাহিম আয়েশাকে তার রুমে ডাকল। আয়েশা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভাইয়া, কী বলবি বল, আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি।’ অন্য সময় হলে হয়তো সে বলত, ‘মেয়েদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী, হ্যাঁ? যা এক গ্লাস পানি এনে দে। খাই।’
সে আজ বলল না। তার মন পড়ে আছে বাইরে। ভেতর পুড়ে কয়লা হয়ে যাচ্ছে। ভেতর থেকে পোড়া পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। কেউ টের না পেলেও ফাহিম স্পষ্ট টের পাচ্ছে।
মা মেহনাজ বেগম ফ্রিজ খুলে এক গ্লাস গরম-ঠান্ডা মিক্সড পানি এনে দিয়ে বলল, ‘ফাহিম নে।’
ফাহিম বলল, ‘তুমি কীভাবে বুঝলে যে আমার পানির তৃষ্ণা পেয়েছে।’
‘মায়েরা সব বুঝে, বুঝলি?’
সে এক নিশ্বাসে পুরো গ্লাসের পানি পান করল। ‘আরে, এত তাড়াহুড়ো করছিস ক্যান? ট্রেন কী চলে যাচ্ছে?’
সে গ্লাস নামিয়ে মায়ের হাতে দিল।
অকপটে বলে ফেলল, ‘মা, আমি যুদ্ধে যাইতেছি।’ ছেলের কথা শুনে শরীরে কেমন জানি কাঁপুনি উঠে গেল। হাত থেকে গ্লাস পড়ে গেল মেঝেতে। ছেলের হাতটা ধরে মেহনাজ বেগম বলল, ‘বাজান, আমার যদি দুইডা ছেলে থাকত, তাইলে তোরে আমি যাইতে দিতাম। একজন গেলে আরেকজন তো আমার বুকে ফিরা আইত। আমার তো একটাই মাত্র পোলা, তোরে যাইতে দিলে আমি কী নিয়া থাকুম, বাজান? তুই তো আমার একমাত্র ভরসা।’ ফাহিমের ডান হাতটা তখন তার মায়ের মুষ্টির ভেতর আবদ্ধ। সে তার মায়ের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না মা, কোথাও যামু না, আমি ক্যানটিনেই থাকমু। কোথাও যামু না। তুমি চিন্তা কইরো না।’
বিশেষ করে ঢাকা শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোয় ‘গ্যাসের চুলা বাড়ানো’ বা ‘লিফট সংস্কার’-এর মতো ঠুনকো অজুহাতে মাঝবছরেও ভাড়া বৃদ্ধির সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত সিকিউরিটি মানি বা অগ্রিম গ্রহণের বোঝা।
২.
বৃহস্পতিবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। সব পাখি নীড়ে ফিরে এল, কিন্তু ফাহিম এল না। মেহনাজ বেগম সারা রাত না ঘুমিয়ে ডাইনিং টেবিলে খাবার নিয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। খাবার টেবিলে কখন যে ঘুমিয়ে গেল, বুঝতেই পারল না। শেষ রাতে একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নও দেখল।
আয়েশা মায়ের কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘মা, তুমি বিছানায় যাওনি?’
মেহনাজ বেগমের ঘুম ভেঙে গেল। দুঃস্বপ্ন কেটে গেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘আয়েশা, মা আমার। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে। চিন্তা হচ্ছে ফাহিমের জন্য। মনে হচ্ছে, ওর কিছু একটা হয়েছে। আচ্ছা, ও কী ফোন দিয়েছিল?’
ফোন দেবে কীভাবে, গতকাল থেকে পুরো ঢাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা হচ্ছে। তুমি অত চিন্তা করো না। ভাইয়ার কিচ্ছু হবে না।’
মেহনাজ বেগম দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘যেন কিচ্ছু না হয়!’
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পরদিন সন্ধ্যা। ফাহিমের মোবাইল থেকে একটা কল এল। আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার দিকে। আয়েশা নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় ওর ফোনে কল এল। আয়েশা রিসিভ করেই বলল, ‘ভাইয়া, বাসায় চলে এসো। মা খুব অসুস্থ। তোমার জন্য বড্ড চিন্তা করছে।’
ফোনের ওপাশ থেকে বলল, ‘আমি চিকিৎসক ইমরান বলছি। ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে। ফাহিমের অবস্থা খুবই খারাপ। শিগগির কাউকে পাঠান।’
আয়েশা বলল, ‘হ্যালো, হ্যালো স্যার, শুনুন। ফোনটা কেটে গেল।’
আয়েশা নির্বাক হয়ে চেয়ে রইল বাইরে। বিস্বাদ সন্ধ্যা নেমে এল পৃথিবীর বুকে। তার বুকটা সওর পাহাড়ের চেয়েও ভারী মনে হতে লাগল। সে জড়পদার্থের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মেহনাজ বেগম বারবার জিজ্ঞেস করছে, ‘কার ফোন? কে ফোন করেছিল, আয়েশা?’
আয়েশা বুকভর্তি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ দম নিল। চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘মা, কথা বলার সময় নেই। আমাদের এক্ষুনি হসপিটালে যেতে হবে।’
৩.
অস্ত্রোপচারের কক্ষে শুয়ে আছে ফাহিম। সাদা কাপড়ে ডাকা।
পাশেই মেহনাজ বেগম ও আয়েশা দাঁড়িয়ে আছে। সাহস হচ্ছে না, চাদর সরাতে। মনে মনে বারবার বলছে, এই মুখ যেন ফাহিমের মুখ না হয়। চাদর দুহাতে সরাতেই ভেসে উঠল হাসি হাসি একটা মুখ। না, এটা অন্য কারোর না। এটা তার ফাহিমেরই মুখ।
মেহনাজ বেগম হাসপাতাল কাঁপিয়ে এক চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারাল।
লোকেরা মেহনাজ বেগমের চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরাবার কসরত করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সংবিৎ ফিরে পেতেই ‘ফাহিম ফাহিম…’ বলে চিৎকার জুড়ে দিল। বলতে লাগল, ‘আমার বাজানের শরীর দিয়া রক্তের নদী বইতাছে। রক্তে ভিজে গ্যাছে সাদা শার্টটা। ডাক্তার সাব, ডাক্তার সাব, ওরে বাঁচান, ওরে ছাড়া আমি কেমনে বাঁইচে থাকমু আল্লাহ! তুমি আমার মানিকটাকে ক্যান উঠায়ে নিলা মাবুদ! আমার…আমার ফাহিম এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে না। বাবা ফাহিম...!’
লেখক: কবি ও গল্পকার