বাঙালির আড্ডাপ্রিয়তা
বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড্ডা। বাঙালির আড্ডা মানেই এক প্রাণবন্ত এবং সজীব সংস্কৃতি। চায়ের কাপ, তর্কবিতর্ক, রসিকতা আর হাস্যরস ইত্যাদি আড্ডার উপাদান। আড্ডা বাঙালির এক অফুরান প্রাণশক্তির উৎস। সমাজে এমন কোনো বাঙালি পাওয়া যাবে না যে জীবনে একবারও আড্ডা দেয়নি। আড্ডার মাধ্যমে মানব মনে গড়ে ওঠে নিবিড় সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহানুভূতি।
আড্ডাকে অন্য কোনো শব্দ দিয়েই বোঝানো কঠিন। আড্ডার আভিধানিক অর্থ ঠিকানা, বাসা, মিলনস্থল, অসাম্প্রদায়িক আখড়া ইত্যাদি। যদি আড্ডাকে সভা বলা হয়, তবু এর আসল অর্থটা অপ্রকাশিতই রয়ে যায়। সাধারণত আড্ডা বলতে বোঝানো হয় খোশগল্প, কথাবার্তা বা গল্পসল্প ইত্যাদি। বঙ্গীয় শব্দকোষ ঘেঁটে জানা যায়, আড্ডা হলো অনর্থক গল্পগুজবে সময় কাটানো। এ যেন এক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়! বিষয়ের নানা দিক, অভূতপূর্ব সব ব্যাখ্যা, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি—এসব মিলিয়ে এক অসাধারণ ব্যাপারই বটে। আড্ডা হতে পারে নানা ধরনের। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা থেকে শুরু করে ভ্রমণ বর্ণনা, রোমাঞ্চ, প্রেম, দেশ, ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, চলচ্চিত্র, সমসাময়িক প্রসঙ্গ, সমাজ, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের যেকোনো কিছুই হতে পারে আড্ডার উপাদান।
বাঙালির আড্ডার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। সেই মহাভারতের সময় থেকে চলছে। জানা যায় যিশুখ্রিষ্টের জন্মের চার-পাঁচ শ বছর আগে প্লেটো করতেন—একাডেমিক, সিনকোজিম, ব্যাংকেটিং, সেও আড্ডার মতো করেই হতো। বিশ্বের অনেক দেশে আড্ডার প্রচলন আছে, তবে তার ধরন আলাদা। রোমানরা নাকি সাংঘাতিক আড্ডাবাজ ছিল। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে মূল বাজার এলাকায় ফোরাম বলে একটি জায়গা থাকত। এই ফোরামই ছিল তাদের আড্ডার জায়গা। প্রতিটি রোমান শহরের কেন্দ্রে একটি করে ফোরাম থাকত বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়।
‘নাগরিক সংবাদ’-এ নানা সমস্যা, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
যুগে যুগে বিশ্বের সর্বত্র শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বিজ্ঞানীসহ সব স্তরের বুদ্ধিজীবীরই আড্ডার ইতিহাস রয়েছে। বাঙালি জীবনে বাংলাদেশে বা পশ্চিম বাংলায়ও জাঁহাবাজ সব আড্ডাবাজ ছিলেন। যেমন বুদ্ধদেব বসু, কমলকুমার মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সত্যজিৎ রায়, কবিতা সিংহ আরও অনেকে। আড্ডায় বসেই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালির ভাবনার সূত্রপাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডি এল রায়, কাজী নজরুল ইসলাম—তাঁরাও আড্ডাপ্রিয় ছিলেন। ঢাকার বাংলাবাজারে বিউটি বোর্ডিংয়ে, হাসান হাফিজুর রহমানের সমকাল অফিসে এবং পুরানা পল্টনে কবি শহীদ কাদরীর বাসায় ছিল সেরা কিছু মানুষের আড্ডা। এসব ছিল মূলত সাহিত্য আড্ডা। একসময় বাংলা একাডেমিতে রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, ফরহাদ খান, মুহম্মদ নুরুল হুদা—এঁদের প্রত্যেকের কক্ষে ঘিরে থাকতেন আড্ডাবাজেরা।
বাঙালি মাত্রই আড্ডাপ্রিয়। বাঙালির জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে আড্ডা। সামাজিক, রাজনৈতিক, পেশাগত এমনকি ধর্মীয় কারণেও এক জায়গায় জড়ো হলে বাঙালিরা কোনো এক ফাঁকে আড্ডা জমাতে চায়। পৃথিবীর কোনো দেশের, জাতির মানুষের সঙ্গে এই আড্ডার তুলনা হয় না। ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী বিনয় কুমার সরকার বলেন, ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের ফলেই বাঙালি সমাজে আড্ডা এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সাহিত্যে নোবেলজয়ী জার্মান ঔপন্যাসিক গুন্টার গ্রাস বলেছেন, বাংলা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এক বড় উদ্দীপনা শক্তি বাঙালির আড্ডা। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, আড্ডা শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, এটি বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সৃষ্টিশীলতার উন্মেষ এবং সমাজভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে এবং কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা উদ্দেশ্যের সীমাবদ্ধতা থাকে না। বিশ্বখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন অবশ্য চেয়েছেন, অন্য মেলার মতো আড্ডা মেলাও হোক। যেমন ছবিমেলা, বইমেলা, কবিতামেলা, বাণিজ্যমেলা, শিক্ষামেলা—তেমনি আড্ডা মেলা। এ থেকেই জন্ম নিতে পারে অনেক ভালো কিছুর। আবার আড্ডা না দিলেও খানিক আড্ডার মেজাজে একটা বই লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে বইয়ের নাম ‘পঞ্চভূত’। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, বাঙালির আড্ডার মেজাজ নেই অন্য কোনো দেশে, কিংবা থাকলেও যথোচিত পরিবেশ নেই। অন্য দেশের লোক বক্তৃতা দেয়, রসিকতা করে, তর্ক-বিতর্ক করে, ফুর্তিতে রাত কাটায়, তবে আড্ডা দেয় না। বাংলার ঋতুগুলো যেমন কবিতা জাগায়, তেমনই আড্ডাও জমায়। এখানকার চৈত্রসন্ধ্যা, বর্ষার সন্ধ্যা, শরতের জ্যোৎস্না রাত, শীতের উজ্জ্বল সকাল—সবই আড্ডার নীরব ঘণ্টা বাজিয়ে যায়, কেউ শুনতে পায়, কেউ পায় না। সত্যজিৎ রায় মনে করেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিস দেশের এথেন্সের জিমনেসিয়ামে অনেক উন্নত মানের আড্ডা হতো। সে যুগে এথেন্সবাসী একই জায়গায় শরীর ও মনের অনুশীলন করত। ওই সব আড্ডায় আসর জমাতেন সক্রেটিস কিংবা প্লেটোর মতো বিখ্যাত চিন্তাবিদ। আর সেই আড্ডা থেকে সৃষ্টি হতো উন্নত মানের শিল্পসাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারণা।
বাংলাদেশে আড্ডা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের গ্রামে-গঞ্জে, রাস্তার মোড়ে, চায়ের আড্ডা, পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা, বাড়িতে আড্ডার ইতিহাস বেশ পুরোনো। এসব আড্ডা থেকে মানুষ তার মনের খোরাক পেয়েছে যুগে যুগে। বাঙালি জীবনে আড্ডার মাত্রা আস্তে আস্তে কমে এলেও তা বন্ধ হয়ে যায়নি। বর্তমানে আড্ডার জন্য ক্লাব, জিমনেসিয়াম, খেলার মাঠ, চায়ের দোকান, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত হাট-বাজার বা স্কুল-কলেজের খোলা মাঠকে কেন্দ্র করেই আড্ডা জমে ওঠে। গ্রামবাসীরা দিন শেষে হাট-বাজারে চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়া ও টিভি দেখার জন্য একত্র হয়। অনেক সময় চায়ের দোকানের সামনে ক্যারম বা লুডু খেলাকে কেন্দ্র করে আড্ডা জমে ওঠে। গ্রামের সমবয়সী কিশোর-কিশোরীরা বিকেলে মাঠে খেলাধুলা করে ও আড্ডা দিয়ে থাকে। আর শহুরে জীবনে মানুষ ক্লাব, ক্রীড়াচক্র, জিমনেসিয়াম, চায়ের দোকান, রাস্তার মোড়ে বসে আড্ডা জমায়। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা ক্লাবে দীর্ঘ সময় ধরে খেলাধুলা ও চা-আড্ডা দেন। অনেক সময় তাঁরা দলবেঁধে দূরে কোথাও ঘুরতে গিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন। এতে তাঁদের সারা দিনের ক্লান্তি দূর হয় এবং কর্মশক্তি বৃদ্ধি পায়।
ইদানীং কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের বদৌলতে বাঙালির আড্ডায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আজকাল সামাজিক মিডিয়ায় প্রচুর আড্ডা হয়। তাই ইন্টারনেট ব্রাউজ করলে আড্ডার অনেক ওয়েবসাইট চোখে পড়ে। যেমন ‘আমাদের আড্ডা’, ‘বাংলার আড্ডা’, ‘দেশি আড্ডা’, ‘আড্ডালোচনা’ ইত্যাদি। অনেক দিন বন্ধুরা সবাই কোনো উপলক্ষে একত্র হলেও আড্ডা যেন সেভাবে জমে ওঠে না। এই যুগ তো আবার ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’র মতো আড্ডার ছলে সেলফি আর ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকার যুগ।
সুতরাং নিঃসংশয়ে বলা চলে, বাঙালির আড্ডার ঐতিহ্য গৌরবময়। আড্ডা থেকে চিন্তার জন্ম হয়। আড্ডা প্রতিভা বিকাশের সহায়ক। তবে সৃষ্টিশীল আড্ডা কমে যাচ্ছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সেসব বিখ্যাত আড্ডা অনেকটাই যেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। আড্ডার গুণগত মান বজায় রেখে এটি সমাজে সুস্থ, সুন্দর এবং নৈতিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। আড্ডা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমস্যার সমাধানে আরও মজবুত হোক, আড্ডাকে অবহেলা নয় বরং ভালোবাসুন।
লেখক: সমাজ গবেষক, শিক্ষক, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর