বাংলার শিল্প–আভিজাত্য ও জামদানি

জামদানি শাড়ি
ফাইল ছবি

আবহমান বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, শিল্প আভিজাত্য ও সম্মানের সাথে উচ্চারিত এক নাম বাংলার জামদানি শিল্প। বাংলার তাঁত শিল্পীদের শৈল্পিক মনন ও শিল্পযাদুর ছোঁয়ায় তৈরি এক অনবদ্য সৃষ্টকর্ম জামদানি। রৌদ্রঘামে চকচকে বাংলার তাঁতশিল্পীদের জীবন ও শিল্পকর্মের এক ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণপত্র। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও অমিয় গ্রামীণ জীবন চিত্রগাঁথা ওঠে এসেছে জামদানির বয়ন ঐতিহ্য ও নকশার নান্দনিকতায়। তাঁতশিল্পীদের কৌশলগত দক্ষতা, নকশার ঐশ্বর্য, সূক্ষ্মতা, নিপুণতা, গুণগতমানের কারণে জামদানি আজও বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য বিস্ময়। ইতিহাসখ্যাত মসলিনের একটি প্রজাতি হিসেবে জামদানি শ্মরণাতীত কাল থেকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়ে এসেছে। মসলিনের অনেকগুলো ধরণের মধ্যে মসলিনের উপর জ্যামিতিক/নান্দনিক নকশাদার বুটিদার শাড়িই জামদানি। মসলিন ছিলো বৃহত্তর ঢাকার ফুটি কার্পাস নামক এক প্রকার তুলার আঁশ দিয়ে তৈরিকৃত তাঁতীদের শিল্পিত হস্তের এক অতি সূক্ষ্ম বস্ত্রবিশেষ। কালের আবর্তে, নানাবিধ সমীকরণে সেই মসলিন হারিয়ে গেলেও ঐতিহ্যবাহী মসলিনের উত্তরাধিকার হিসেবে জামদানি শিল্প আজও বিকশিত হচ্ছে।

বাংলার জামদানিশিল্পের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ঐতিহাসিকের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব যুগেই বর্হিবিশ্বে বাংলার তাঁতবস্ত্রের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। বিভিন্ন পর্যটকের বিবরণ, ঐতিহাসিক গ্রন্থ, প্রাচীন বিভিন্ন লোকগাঁথা ও কিংবদন্তী থেকে বাংলার তাঁতবস্ত্রের এসব সমৃদ্ধির কথা জানা যায়। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে আরব বনিকেরা সুতিবস্ত্র পৌছে দেন ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যে। দ্বিতীয় শতকে আরব ও গ্রীক ব্যবসায়ীরা ভারত ও লোহিত সাগরের পথে মিশর ও ইথিওপিয়াতে বাণিজ্য করতেন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মহেঞ্জোদারো খনন কার্যের সূত্রে যেসব নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে মনজিৎ থেকে আহরিত লাল রঙে রঞ্জিত বস্ত্রের অংশবিশেষ, সুতা কাটার টাকু ও সূঁচ সেই ইতিহাসেরই সাক্ষ্যবহ।

‘পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সি’ বইটিতে মৌর্য আমলে সূক্ষ্ম মিহি বস্ত্র মসলিনের উল্লেখ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গুরুত্বপূর্ণ মানব বসতির যে চিহ্ন পাওয়া গেছে তা হলো নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর। বিভিন্ন সাহিত্যিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে সৌনাগড়া বা গঙ্গাঋদ্ধি থেকে প্রচুর উন্নত শ্রেণির তাঁত বস্ত্র বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হতো। বিভিন্ন গবেষকরা এই প্রত্নস্থানকে মিশরীয় ও গ্রীক সূত্রে বর্ণিত সৌনাগড়া বা গঙ্গাঋদ্ধি হতে পারে বলে প্রস্তাব করেছেন।

নবম শতকে আরব ভূগোলবিদ সোলায়মান কর্তৃক লেখা ‘সিল-সিলাত-উত-তাওয়ারিখে’ উল্লেখিত রাহমি নামক রাজ্যে (বাংলা) সূক্ষ্ম ও মিহি সুতিবস্ত্রের বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁর বিস্তারিত বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘রাহমি নামক রাজ্যে (বাংলা) তৈরি সুতি বস্ত্র এতটাই সূক্ষ্ম ছিলো যে, এর তৈরি গোটা একটি পোশাক একটি আংটির মধ্য থেকে গলিয়ে বের করা যায়।’ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলা মুসলমান শাসকদের অধীনে আসে, তখন বর্হিবাণিজ্যের প্রধান অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে মসলিন, যা আরব বণিকদের হাত ধরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিলো। চতুর্দশ শতকে আগত মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে সোনারগাঁও–য়ের সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পরবর্তীতে আগত চৈনিক পরিব্রাজক মাহুয়ান ও অন্যান্যরা বাংলার সূক্ষ্ম বস্ত্রের ভূয়সী প্রশংশা করেছেন। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে মোগল শাসনামলে মসলিন তথা জামদানি শিল্পের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়। মোগলরা জামদানি শিল্পের প্রসার ও বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বঙ্গের এই অত্যাশ্চর্য সুতি বস্ত্রের বিশ্ব বাণিজ্যে আধিপত্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় মসলিন তথা জামদানি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ছিলেন এর প্রধান পৃষ্টপোষক। আর মুসলমান তাঁতীরাই এ শিল্পের উন্নয়ন ও লালনকারী বলে ধারণা করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইংরেজ পরিব্রাজক র‌্যাডলফ চীফ ও মেগাস্থিনিস রাজসভায় ফুলেল নকশার মসলিনের অনবদ্য পোশাকের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সপ্তদশ শতকে ঢাকা যখন বাংলার রাজধানী তখন জামদানি শিল্পের ব্যাপক উৎকর্ষ ঘটে। আঠারো শতকের ইংরেজ শাসনামলে প্রয়োজনীয় পৃষ্টপোষকতার অভাব ও বানিজ্যিক রাজনীতির মেরুকরণের কারণে বাংলার মসলিনশিল্প হারিয়ে গেলেও মসলিনেরই উত্তরাধিকার হিসেবে আজও টিকে রয়েছে বাংলার জামদানি শিল্প।

জামদানির নকশা ও বুনন কৌশলেই রয়েছে জামদানির নিজস্বতা। এর কোনো লিখিত সূত্র নেই। জামদানি তাঁতীরা জামদানিতে নকশা আঁকেন তাঁদের কল্পনা ও স্মৃতি থেকে। তাঁতীরা বংশ পরম্পরায় তাঁদের পূর্বসুরীদের কাছ থেকে শোনা শ্রুতি ও স্মৃতি থেকে টানা ও ভরনার গাণিতিক নিয়ম ও বিশেষ কৌশল অনুসরণ করে একান্তই দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে জামদানি তৈরি করে থাকেন। পূর্বসুরীদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন বুলি/স্লোক তাঁতীরা তাঁদের স্মৃতিতে ধরে রাখেন। এসব বুলি/স্লোকের ভাষা একান্তই গ্রামীন আবহের স্বকীয়তা বিরাজমান। ‘হামান বোন--হইরে বাড়ে--প্যাচে বাড়ে--ঘাটে বাড়ে--ঘাটাইল খেও--উদা ঘাটে।’ ওস্তাদ তাঁতী ও সাগরেদ তাঁতী এসব বুলি/স্লোক তাঁদের স্মৃতি ও শ্রুতির সমন্বয়ে জামদানি কাপড়ে নকশায় ফুটিয়ে তোলেন সমান্তরালে ভরনা বরাবর আলাদা সূঁচ ব্যবহারের মাধ্যমে। তাঁতীরা তাঁদের শিল্পভাবনাগুলোকে নকশার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন জামদানি শাড়ির বুননে বুননে। জামদানির নকশাসমূহ একান্তই বাংলাদেশের তাঁতীদের নিজস্ব সৃজন। জামদানি শিল্পীরা তাদের চারপাশের দেখা পরিবেশ দেখে নকশা আঁকেন। পরিবেশ, প্রকৃতি, বৃক্ষ-লতা, ফুল, নকশাচিত্র হলো জামদানির নকশার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। বংশ পরম্পরায় তাঁতীরা ধরে রেখেছেন এ বয়নঐতিহ্যকে। জামদানি বুননের অতুলনীয় পদ্ধতি ও ঐতিহ্যবাহী নকশার কারণে ইউনেস্কো কর্তৃক ২০১৩ সালে জামদানিকে একটি অনন্য সাধারণ নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ) হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২০১৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যা প্রকারন্তরে আবহমান বাংলার তাঁতশিল্পীদের গর্বিত শিল্পসত্তার স্বীকৃতি।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো, সোনারগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় আদিকাল থেকেই কারুশিল্পীদের বংশানুক্রমিক বসবাস ছিলো। যুগ যুগ ধরে বর্তমান শীতলক্ষ্যা নদীর পার বরাবর পুরাতন সোনারগাঁ অঞ্চলটিই জামদানি শিল্পের ব্যাপক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষা নদীর পানি থেকে ওঠা বিশেষ আর্দ্র বাষ্প ও আর্দ্র আবহাওয়া জামদানি সুতা প্রস্তুত ও কাপড় বুননের উপযোগী। জামদানি শিল্পীদের অন্যত্র নিয়ে জামদানি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিলো, কিন্তু এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি। কারণ এ শিল্প বংশানুক্রমিকভাবে পারিবারিক পরিমন্ডলের সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে ওঠেছে, যা বিশ্বের আর কোথাও নেই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও এবং সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বয়নশিল্পীরা এ শিল্পের বহমানতা বজায় রেখেছেন এখন পর্যন্ত। তাঁতীরা বংশ পরম্পরায় তাঁদের বাপ-দাদার ঐতিহ্যে লালিত শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখার এবং দেশীয় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই এ শিল্পের ইতিহাস, অভিঘাত, যন্ত্রনা, সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য বাসনাকে অস্বীকার করা যায় না। পুঁজিবাদের উচ্চচাপ, উচ্চধাপের সাম্রাজ্যবিস্তার, বাজার সম্প্রসারণ, সাম্রারাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে হার মেনেছিল মসলিন ও বুনন শিল্পীদের সূঁচতীক্ষ্মের রক্তাক্ত জীবন। বাতিল, পরিত্যক্ত হলেও ভয়ানকভাবে ক্রমবর্ধমান ঘটমান স্বপ্ন ও শিল্প স্বকীয়তা নিয়ে আজও বিকশিত হচ্ছে বাংলার জামদানিশিল্প। তাই জামদানি শিল্পের ধারাবাহিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য পুর্ণগঠন আজ সময়ের দাবি। সেই সাথে প্রয়োজন আদি বুননশৈলী, নকশাসমূহের জরুরি পুনরুদ্ধার এবং জামদানি শিল্পীদের জীবনমানের উন্নয়ন তথা এ শিল্পের লালন, বিকাশ ও প্রসার। এসব প্রচেষ্টাকে টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পৃষ্টপোষকতা গ্রহণ ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরি।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:

১.
চন্দ্রশেখর সাহা, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, মনিরা এমদাদ, রুবি গজনবী, শাহিদ হোসেন শামীম, শেখ সাইফুর রহমান, হামিদা হোসেন, ঐতিহ্যবাহী জামদানি নকশা, ঢাকা, বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ, মার্চ, ২০১৮
২.
হোসনে আরা শাহেদ, শাড়ি, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ডিসেম্বর, ১৯৮৫
৩.
সমর মজুমদার, জামদানি নকশা, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি-২০১০
৪.
ড. এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ২০০৮
৫.
মুনতাসীর মামুন, ঢাকা স¥ৃতি বিস্মৃতির নগরী. ঢাকা, বাংলা একাডেমি, সেপ্টেম্বর, ১৯৯৪
৬.
হাকীম হাবিবুর রহমান, ঢাকা পঞ্চাশ বছর আগে, ঢাকা, বাংলা একাডেমি, ডিসেম্বর, ১৯৯৫
৭.
নাজলী লায়লা মনসুর, অজন্তা, ঢাকা, প্রথমা প্রকাশন, জুলাই, ২০১৬

৮.
ড. আবদুল মমিন চৌধুরী, প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি, মাওলা ব্রাদ্রার্স, নভেম্বর, ২০১৭
৯.
উইকিপিডিয়া-৫ম খন্ড
১০.
শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (মধ্যযুগ), দিব্যপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ঢাকা, সেপ্টেম্বর-২০১৭,
১১.
ড. আবদুল করিম, ঢাকাই মসলিন, ঢাকা, বাংলা একাডেমি,১ম প্রকাশ ১৯৬৫, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৯০,
৩য় প্রকাশ ২০১১,৪র্থ প্রকাশ ২০১৬
১২.
মোহাম্মদ সাইদুর, জামদানি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, জুন-১৯৯৩

*লেখক: সায়মা রহমান, সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস, সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জামদানি গবেষক