শিক্ষকের পেশাগত সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা: সমৃদ্ধ আগামীর ভিত্তি

শিক্ষকতাছবি: ফ্রিপিকডটকম

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বে সবার জন্য শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের কারিগর হিসেবে নিয়োজিত শিক্ষকসমাজের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯৪ সাল থেকে দিবসটি উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে। দিবসটির লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী শিক্ষকদের নৈতিক সমর্থন জোগানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটানো এবং বিষয়টি বিশ্লেষণ করে শিক্ষকদের মাধ্যমে কতটুকু দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে তা মেটানো সম্ভব, সেই নিশ্চয়তা বিধানে ভূমিকা রাখা। ইউনেসকোর মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের অবদান, সচেতনতা, বোধগম্যতা ও উপলব্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক বৈশ্বিক ভূমিকা রেখে চলেছে।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষার পেশাজীবী সংগঠনের (এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল) ভবিষ্যৎ বাণীতে পাওয়া যায় যে বিশ্ব শিক্ষক দিবস একদিন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভের পাশাপাশি বিশ্বের সব দেশে একযোগে উদ্‌যাপিত হবে। তাদের মতে, শিক্ষকদের মর্যাদার প্রশ্নটি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৬৬ সালে আইএলও ও ইউনেসকোর মধ্যে যে স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, প্রতিটি দেশ তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। ১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে প্যারিসে এক আন্তসরকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে আইএলও ও ইউনেসকো শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদাবিষয়ক একটি যৌথ সুপারিশমালা প্রণয়ন করে, যা শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক অবস্থানে নেওয়াসহ তাদের মৌলিক ও অব্যাহত প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বিধানের প্রক্রিয়া, পেশাগত স্বাধীনতা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন, দায়িত্ব ও অধিকার, শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, দেনদরবারের কৌশল–সংক্রান্ত দক্ষতা, কার্যকর শিক্ষাদান ও শিক্ষণের পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মাইলফলক হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে। মূলত ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনে সংস্থার তৎকালীন মহাপরিচালক ফ্রেডারিক এম মেয়র এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের অনুরোধে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদ্‌যাপিত হয়। সেখানে সবাই ঐকমত্য প্রকাশ করেন যে বর্তমান বিশ্বে শিক্ষকেরা একটি বহুসাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে মেধা ও শ্রম দিয়ে চলেছেন। এ জন্য তাঁদের সেই অবদানের বিষয়টি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অন্যান্য পেশাজীবী যেন সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তার ওপর গুরুত্বারোপের জন্য ইউনেসকো ও এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল দিনটি উদ্‌যাপনের উদ্যোগ নেয়। প্রতিবছর শিক্ষা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের অবদান তুলে ধরার জন্য এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল একটি জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানও চালিয়ে থাকে।

২০২৬ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াই: পেশা রক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছর’। এ জন্য প্রতিপাদ্যটি একদিকে যেমন বিগত ৬০ বছরের অর্জনকে স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যদিকে বর্তমান বৈশ্বিক শিক্ষা সংকট মোকাবিলায় শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানায়। এই প্রতিপাদ্যকে প্রধান তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়:

১. পেশা রক্ষা: বিশ্বজুড়ে মানসম্মত শিক্ষকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ মিলিয়ন অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন। প্রতিপাদ্যটিতে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও টেকসই পেশা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাবিদ হিসেবে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে স্বাধীনভাবে শেখানোর অধিকার ও নীতি-নির্ধারণে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত নিরাপদ কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলা।

২. মর্যাদা বৃদ্ধি: সমাজে শিক্ষকদের অবস্থান, সম্মান এবং তাঁদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত প্রদানের সুযোগ এবং তাঁদের দক্ষতা মূল্যায়নের পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মানজনক বেতন স্কেল, কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিক মানসম্মত প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন জরুরি।

৩. ভবিষ্যৎ গঠন: শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি শিক্ষক। সুতরাং দক্ষ শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা অসম্ভব। শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নেতৃত্বে উন্নীত করার মাধ্যমে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ঘটে। জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে শিক্ষকই প্রধান ভূমিকা রাখতে পারেন।

বিশ্বব্যাপী বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট বিদ্যমান, সেই পটভূমিতে প্রতিপাদ্যটি যুক্তিসংগত; বিশেষত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি জাতির মেধা, মনন ও ভবিষ্যৎ গঠনের মৌলিক ভিত্তিও বটে। যেকোনো সমাজের টেকসই উন্নয়ন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। বহু দশক ধরে শিক্ষকদের পেশাগত সংগ্রাম, মর্যাদা রক্ষা এবং মেধার স্বীকৃতি আদায়ে যে নিরন্তর পথচলা অব্যাহত রয়েছে, তা রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আবশ্যক।

দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভাষায়, ‘শিক্ষকসমাজ হচ্ছে প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক।’ ইউনেসকো বলছে, বর্তমান বিশ্বে একধরনের শিক্ষা সংকট চলছে। ২৫০ মিলিয়ন শিশু শিক্ষার প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক দেশে শিক্ষক–স্বল্পতার কারণে শিক্ষার মান ব্যাহত হচ্ছে। পরসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন শ্রেণিশিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে তাঁদের মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাব। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণের কাজটি দ্রুততম সময়ে শেষ করার ব্যাপারে ইউনেসকো দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি, যা প্রতিটি দেশকে বাস্তবায়নের জন্য ইউনেসকো সুপারিশ ও সমর্থন জোগাবে, তা হলো:

  • পেশা, পেশাগত দক্ষতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ, উন্নত বেতনকাঠামোসহ চাকরির সুবিধাজনক পরিবেশ।

  • প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার উন্নত পরিবেশ।

  • শিক্ষকদের জন্য উচ্চমানের প্রশিক্ষণ।

  • শিক্ষক নিয়োগ ও দক্ষতা বৃদ্ধি বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।

ইউনেসকোর প্রত্যাশা, সেসব দেশে ব্যাপকসংখ্যক শিশুরা শিক্ষার বাইরে অবস্থান করে, তাদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন দেশের সরকার সম্মিলিতভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে শিক্ষা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই অবগত। একটি দেশ স্বাধীনতা লাভের ছয় দশক পর জাতীয় শিক্ষানীতি পেয়েছে। এই দীর্ঘ সময় দেশের সামগ্রিক শিক্ষা কোনো সুনির্দিষ্ট নীতির আলোকে পরিচালিত হয়নি। দীর্ঘদিন কোনো শিক্ষানীতি না থাকার জন্য নিশ্চয় শিক্ষকসমাজ দায়ী ছিল না। বাস্তবিক ভিত্তি থেকে শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়, কিন্তু তাকে দৃঢ় ও সোজা রাখতে এবং এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য যা প্রয়োজন, তা প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিক্ষকেরা বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার, শুধু তাই নন; মর্যাদার প্রশ্নেও তাঁরা অন্যান্য পেশাজীবী গোষ্ঠীর তাচ্ছিল্য ও ঔদাসীন্যের শিকার। দীর্ঘদিন শিক্ষকদের বঞ্চিত রাখার যে সংস্কৃতি এ দেশে তৈরি হয়েছে, একটি মহল তা বহাল রাখতে যেন মরিয়া। আর সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের অবহেলা তো রয়েছেই। এই সরকারের পূর্ববর্তী সময়কালে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতনকাঠামোর কথা আমরা শুনেছি, কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই সেই শাসনকাল পার হয়ে গেছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু একটি দিবস নয়। শিক্ষকসমাজ একটি দিনে তাদের অবদান সম্পর্কে অন্যের মূল্যায়ন ও অভিব্যক্তি জানার পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবেন এবং তা পালন করতে নতুন করে সংকল্পবদ্ধ হবেন। শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের দাবি আদায়ের জন্য নয়, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের ভূমিকাই যে সবচেয়ে বেশি সে কথা মনে করিয়ে দেয়। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রের সব ধরনের সমস্যা ও অসামঞ্জস্যতা দূর করে একটি পরিকল্পিত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনও বাধাগ্রস্ত হবে। এ দিবস উদ্‌যাপনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শিক্ষকসমাজ তাদের অধিকার সুরক্ষা ও দায়িত্ব পালনের প্রত্যয় ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে সফলভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক সম্মানিত ও স্বীকৃতি লাভ করার প্রত্যাশাটুকু করতেই পারেন। ইউনেসকোর মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পাশে থেকে সমর্থন জোগালে তাঁরা লক্ষ্যে পৌঁছাবেন বলে বিশ্বাস করতে সাহস জাগে।

শিক্ষক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষকেরা কেবল জ্ঞান দান করেন না; বরং শিক্ষার্থীর আদর্শ-মূল্যবোধ, দক্ষতা ও স্বপ্ন গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। নবপ্রযুক্তি, শিক্ষণপদ্ধতি আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে শিক্ষকেরা আগামীর বিশ্বনাগরিক তৈরি করতে সহায়তা করেন। তাই শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও স্বীকৃতি দিতে পারলে, তাঁরা আরও সামর্থ্য ও অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। ইউনেসকো এবং বিশ্বজুড়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর মূল আহ্বান হলো: শিক্ষকদের কেবল মৌখিক সম্মান নয়; বরং সুনির্দিষ্ট নীতি, বাজেট বরাদ্দ এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই একটি বৈষম্যহীন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

* লেখক: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা-৯২০৩।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]