বৃষ্টির পানিতে থই থই ঢাকা: বারবার ডুবে যাওয়া এক শহরের করুণ চিত্র
বর্ষার বৃষ্টি বাংলার চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীক। এই বৃষ্টি কৃষকের মাঠে নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনে, নদী-খালে ফিরিয়ে আনে প্রাণের স্রোত। কিন্তু সেই একই বৃষ্টি যখন রাজধানী ঢাকার রাজপথকে নদীতে পরিণত করে, মানুষের কর্মচাঞ্চল্য থামিয়ে দেয় এবং একটি আধুনিক মহানগরকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অচল করে ফেলে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের উন্নয়ন কি সত্যিই ভারসাম্যপূর্ণ, নাকি আমরা আকাশ ছুঁতে গিয়ে মাটির বাস্তবতাকে ভুলে গেছি?
রোববারের এই টানা অতি ভারী বর্ষণ যেন একযোগে পুরো দেশকে এক মহাসংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় রেকর্ড ১৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যার মধ্যে শেষ তিন ঘণ্টায়ই ঝরেছে ৩৮ মিলিমিটার। এই তুমুল বর্ষণে রাজধানীর মিরপুর, গুলশান, বনানী, ফকিরাপুল, আরামবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, গ্রিন রোড, কারওয়ান বাজার, ধানমণ্ডিসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার রাজপথ থেকে অলিগলি হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
এই দুর্ভোগ যে কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, তার বাস্তব চিত্র দেখেছি নিজের পরিবারেই। আমার কাজিন নাসিমুল হক রাফি তাঁর ২২ মাস বয়সী শিশুসন্তানকে চিকিৎসকের কাছে দেখানোর জন্য কুমিল্লা থেকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসছিলেন। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ অল্প সময়ে অতিক্রম করা সম্ভব, সেই যাত্রায় আজ (গতকাল রোববার) লেগেছে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে সন্তানের শারীরিক অবস্থা আর চিকিৎসকের সিরিয়াল হারানোর আশঙ্কা—এই দুই উৎকণ্ঠায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। এই একটি ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, জলাবদ্ধতা কেবল রাস্তায় পানি জমার নাম নয়; এটি চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে একসঙ্গে বিপর্যস্ত করে দেওয়া একটি বহুমাত্রিক সংকট।
তবে এবারের সংকট শুধু ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ নেই। মৌসুমি নিম্নচাপ ও মেঘালয়-আসামের পাহাড়ি ঢলে দেশের অর্ধেক জেলা চরম বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে কাঁপছে। বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত; মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদের পানি বইছে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে। শুধু দক্ষিণ-পূর্ব নয়, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বন্যা বিভীষিকা। সুরমা, কুশিয়ারা, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি উপচে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর নিচু এলাকা ও ফসলি জমি সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ, বিশেষ করে কৃষিজীবী ও দিনমজুরেরা তাঁদের ঘরবাড়ি ও ফসল হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়েছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে—এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নগর ও নদী পরিকল্পনা করা আমাদের দায়িত্ব ছিল। ঢাকাকে আমরা ক্রমান্বয়ে ‘কংক্রিটের জঙ্গলে’ পরিণত করেছি, যেখানে পানি শোষণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। একসময় ঢাকার বুকজুড়ে ছিল অসংখ্য খাল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত নিম্নাঞ্চল। আজ সেগুলোর অনেকগুলো দখল, ভরাট বা দূষণের শিকার। ২০১০ সালের পর ঢাকা হারিয়েছে ৩ হাজার ৪৪০ একর বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাশয়। কেন্দ্রীয় ঢাকায় জলাশয়ের পরিমাণ ১৯৯৫ সালে ছিল ২০.৫৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে মাত্র ২.৯ শতাংশে। গত চার বছরে দুই সিটি করপোরেশন নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়নে ২৬২ কোটি টাকা খরচ করলেও নিউমার্কেটের নিষ্কাশন পথ আজও বন্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ১৫টি দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার করলে ঢাকার জলাবদ্ধতার ৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব, অথচ সেই কাজ হয় না।
এই কাঠামোগত ব্যর্থতার বাইরেও আমরা নাগরিকেরা কম দায়ী নই। প্রতিদিন যেখানেসেখানে ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, কাপ ও প্যাকেট বৃষ্টির পানির তোড়ে গিয়ে পড়ে ড্রেন, কালভার্ট ও স্যুয়ারেজ লাইনে। প্লাস্টিক সহজে পচে না বা গলে না। এ কারণে এগুলো নালার মুখে আটকে গেলে কোটি কোটি টাকার নিষ্কাশনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। নিজের ঘরের ময়লা ফেলতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই, এই অসচেতনতাই পরে কয়েক লাখ মানুষের কোমরপানির নরকযন্ত্রণা তৈরি করে। নাগরিক দায়িত্ববোধ ছাড়া কোনো আধুনিক নগরব্যবস্থাই টেকসই হতে পারে না।
জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতিও ভয়াবহ। কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, দোকান ও গুদামে পানি ঢুকে কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়। সড়কে পানি জমে থাকায় ওয়াসা, ডিপিডিসি ও তিতাসের অপরিকল্পিত রাস্তা খননের ফলে সৃষ্ট গর্ত ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ পানির নিচে ঢাকা পড়ে মরণফাঁদে পরিণত হয়। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং নোংরা পানি ঢুকে মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে শত শত যানবাহন। একই সঙ্গে নোংরা পানি ডায়রিয়া, চর্মরোগ, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে প্রাণঘাতী করে তোলে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আমলে নিয়ে টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মাঠ প্রশাসন, দুই সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে কোনো গাফিলতি না করার কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কমলাপুর ও ধোলাইখালের পাম্প চালু রেখেছে এবং উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের কথা জানিয়েছে। কিন্তু এই সাময়িক ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান নয়। প্রতিবছর একই সংকট ফিরে আসা প্রমাণ করে, স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।
খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং এবং নগর উন্নয়নে পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা ছাড়া এই দেশকে জলাবদ্ধতা ও বন্যার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। উন্নয়ন কেবল উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা সুউচ্চ ভবনের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন শ্রমজীবী মানুষ বর্ষার দিনে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী সময়মতো বিদ্যালয়ে যেতে পারে, একজন রোগী বাধাহীনভাবে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন এবং একটি শহর তার স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
প্রতিবছর বর্ষা এলেই যদি একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তা কেবল প্রকৃতির দায় নয়; এটি আমাদের পরিকল্পনা, সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতির প্রতিফলন। রাজধানীকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে উন্নয়নের সংজ্ঞাকে নতুন করে ভাবতে হবে। আকাশছোঁয়া স্থাপনার পাশাপাশি মাটির নিচের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল, জলাশয়, উন্মুক্ত জলাধার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, একটি শহরের সভ্যতা তার সুউচ্চ ভবনে নয়; বরং সংকটের সময় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখার সক্ষমতায় প্রকাশ পায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, পরিবেশগত অবহেলা এবং সমন্বয়ের অভাব থেকে সৃষ্ট একটি সংকট, যার সমাধানও মানুষের হাতেই। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক নগর–পরিকল্পনা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর জবাবদিহি। সেই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। যেদিন উন্নয়ন কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো নয়; বরং মানুষের নিরাপত্তা, স্বস্তি ও জীবনমানের সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত হবে, সেদিন বর্ষার বৃষ্টি আবারও বাংলার সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠবে—নাগরিক দুর্ভোগের নয়। রাজধানী তখনই সত্যিকার অর্থে একটি সহনশীল, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে।
বর্ষার বৃষ্টি কখনো শত্রু নয়; শত্রু আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও অসচেতনতা। প্রকৃতি তার নিয়মে বৃষ্টি বর্ষণ করবে, কিন্তু সেই বৃষ্টিকে আশীর্বাদ না অভিশাপে পরিণত করব—সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই। আমরা যদি খালকে ফিরিয়ে দিই তার প্রবাহ, নদীকে ফিরিয়ে দিই তার বিস্তার, ড্রেনকে রাখি বর্জ্যমুক্ত এবং নাগরিক দায়িত্বকে করি জীবনের অংশ, তবে বর্ষার জল আর দুর্ভোগের প্রতীক হবে না; হয়ে উঠবে জীবন, সবুজ আর সমৃদ্ধির প্রতীক।
* লেখক: কৃষিবিদ মো. বশিরুল ইসলাম, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]