১২ দিনে দেখা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, দুর্যোগেও জীবনের হাতছানি-৬

১৮.

কক্সবাজারে পৌঁছাই রাত ১১টা নাগাদ। এসে বাস থেকে নামতেই শীতল নোনতা হাওয়ায় স্পর্শ অনুভব করি ঠোঁট-মুখ আর নিশ্বাসে। যেন সাগরের স্বাদ-গন্ধ মিশে আছে এই বাতাসে। যেমনটা পেয়েছিলাম নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাটে গিয়ে।

মনে আছে? সেই যে নৌকা খুঁজতে গিয়েছিলাম ওখানে। সেবার অবশ্য অন্ধকারে সাগর দেখা হয়নি আমার।

তবে সাগরের কাছাকাছি গেলে প্রতিবারেই অনুভব করি এর গন্ধে কি যেন একটা আছে। এ গন্ধ নাকে গেলে কেমন যেন মাতাল মাতাল লাগে! মনে হয় গভীর তলদেশ থেকে কেউ ডাকছে নিশির মতো! তরুণী প্রেমিকার মতো সুরেলা কণ্ঠে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলছে -‘এদিকে এসো! আরও গভীরে এসো! দেখে যাও কি শান্তি এই মুক্তির দেশে!’

আচ্ছা, এসব কি কেবল আমারই মনে? গভীর সাগর থেকে সত্যিই কি কেউ ডাকে! নাকি কেবলই আমার মনের অলীক কল্পনা সব। যদি তা–ও হয়, তবু খারাপ না এই কল্পজগৎ!

পেটে মোচড় দিয়ে ক্ষুদা অনুভব করতেই—কল্পজগৎ থেকে ফিরে আসি বাস্তবতায়। সকালে আকিবের বাসা থেকে নাশতা করে বেরিয়েছিলাম। এরপর দিনভর জার্নি। মাঝখানে বিস্কুট-পানি-চা এসবের বাইরে তেমন কোনো ভারী খাবার পেটে পড়েনি। এদিকে কয়েক ঘণ্টা আগে যা দেখলাম, এতে ক্ষুধাও উবে গিয়েছিল হাইওয়ের বাতাসে। তবে কক্সবাজারে এসে নামতেই মনের ভেতরের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে, মাথাটাও হালকা অনুভব করছি।

ভেবেচিন্তে দেখলাম ৩ নং অপশনটাই উপযুক্ত হয়। তাই চুপচাপ বসে খাবারের দিকেই ফোকাস করলাম। আর এদিকে আম্মুও মূল প্রসঙ্গে ফোকাসড! - এ ব্যাপারে বিস্তারিত আরেক দিন বলব না হয়।

বাসস্ট্যান্ডের পাশেই এক হোটেল থেকে ভরপেট খাওয়াদাওয়া শেষে, অটোরিকশায় উঠলাম আমরা চারজন। সৈকতের কাছাকাছি আসতেই, সাগর তার গভীর পুরুষালি কণ্ঠে অভিবাদন জানাল আমাদের। এ কণ্ঠ অবশ্য সবাই শুনতে পাওয়ার মতো।

তুলনামূলক নগণ্য ভাড়ায়, সৈকতের কাছেই মাঝারি মানের এক রিসোর্টে উঠেছিলাম আমরা চারজর। হোটেলে চেকইন দিয়ে রুমের ভেতর লাগেজগুলো রেখেই বেরিয়ে পড়ি অন্ধকার সৈকতে। এরপরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার মতো কলমের শক্তি এখনো অর্জন করিনি আমি। কার্লোস ফুয়েন্তেসের উপন্যাসের মতো জাদুবাস্তবতার এক জগতে আমরা চারজন যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম সে রাতে।

১৯.

পরদিন দুপুরে সৈকতের পাড়েই পরিচিত হই এক নতুন অভিযাত্রীর সঙ্গে। পরবর্তী দুই দিনের সফরে সঙ্গী হয়ে যায় সে আমাদের। কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষ সে। আমাদের বোঝার উপযোগী বাংলা যদিও জানে, তবে আলাপচারিতা কালে চাটগাঁইয়া ভাষায় মাঝেমধ্যে যা বলে তার অধিকাংশই বুঝি না। উল্লেখ্য, তার সব কথাতেই টুকটুক আওয়াজের মতো একটা দোত্যনা অনুভূত হয়। চাটগাঁইয়া টান এটা, খাঁটি চাটগাঁইয়া যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন এই টান আর তার টুকটুক দোত্যনা সহজে কথা থেকে মেটে না ওদের।

যা–ই হোক, জনাবের আবার সংগীতের প্রতিও অনুরাগ আছে। কথার ফাঁকে ফাকে গুন গুন করে গান গায়। লিরিক শুনলে বোঝা যায় এগুলো স্থানীয় সৃষ্টি, কেবল সাগর থেকে উঠে আসা মানুষেরাই বাঁধতে পারে এমন গান। যেই গান সাগর আর জীবনের সম্পর্কের ছবি আকে, কী নিয়ে গেছে আর কী দিয়ে গেছে এই সাগর, তার গল্প বলে। হিসাবের খাতায় অঙ্ক না মিললেও সাগর কী করে তার জীবনের অংশ হয়ে গেল রূপকীয়ভাবে তার বর্ণনা করে। জনাবের নাম মাসুদ। পেশায় সে ম্যাসাজ থেরাপিস্ট। বয়স পাঁচ-ছয় বছরের বেশি হওয়ার কথা নয়। সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আশা পর্যটকদের বডি ম্যাসাজ করে দেয় সে। পারিশ্রমিক হিসাবে যে যা বকশিশ হিসেবে দেয়, তাই তুলে দেয় মায়ের হাতে। কথপোকথন থেকে যা জানতে পারি—সৈকত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের এক বস্তিতে মা আর ওর কয়েক বছরের বড় এক বোনকে নিয়ে মাসুদের বসবাস। মা মাছের ফ্যাক্টরির কাজ করে আর বড় বোন সৈকতে আনার ফল, ঝিনুকের মালা—এসব বিক্রি করে। এদিকে মাসুদ নিজেও খুব ভোড়ে ঘুম থেকে উঠেই রওনা দেয় সাগরপাড়ের উদ্দেশ্যে, এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত বডি ম্যাসাজ করে উপার্জনের চেষ্টা করে। মাসুদের মতো আরও অনেক শিশুকেই দেখলাম যাদের স্কুলে যাওয়ার বয়স, স্কুল শেষে বিকেলে খেলতে যাওয়ার বয়স। তবে বাস্তবতার কষাঘাত সে সুযোগ ওদের দেয়নি। ভোর থেকে মোটামুটি মাঝরাত পর্যন্ত, অর্থাৎ যতক্ষণ সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে ততক্ষণ ওদের সৈকতেই দেখা যায়। ওদের জীর্ণশীর্ণ দেহের ওপর রোদে পোড়া চামড়ায় স্পষ্ট ফুটে উঠে নিদারুণ দারিদ্র্যের ছাপ। তবে প্রচণ্ড গতিশীল এই পৃথিবীতে এসব বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করার মতো সময় কিংবা ইচ্ছা হয়তো আমাদের তেমন নেই। একদিকে যন্ত্রের মতো গতিশীল, অন্যদিকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার মতোই কৃত্তিম হয়ে যাচ্ছি আমরা দিন দিন।

মাসুদকে নিয়ে শেষদিন বিকেলে হিমছড়ি সৈকতে গিয়েছিলাম। একদিকে সবুজ পাহাড়, আরেক দিকে সাগর, মাজখানে ঘন সবুজ ঝাউবনের পর দীর্ঘ সৈকত। তবে সেদিন ঝাউবনের ভেতর খেঁকশিয়াল দম্পতির বিয়ে ছিল বোধ হয়। বিকেলে সাগরেরই একদিকে যেমন বৃষ্টি হচ্ছিল, ঝলমলে আকাশের কিরণে চিকচিক করছিল সৈকতের আরেক দিক। এই বৈপরীত্য সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক রংধনুকে ডেকে এনেছিল পাহাড়ের পেছন থেকে।

এদিকে লক্ষ করলাম, ঝাঁকে ঝাঁকে লাল কাকড়া উঠে আসছে সাগর থেকে। মানুষ দেখলে সাধারণত দৌড়ে পালায় ওরা, আমাদের দেখেও তা–ই করল। তবে লক্ষ করলাম, পর্যটকের আনাগোনা থেকে একটু দূরে সৈকতের বালিতে গর্ত খুঁড়ছে ওরা। আসন্ন জোয়ারের পানিতে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচতে এমনটা করে সাধারণত।

এই অপার্থিব ফ্রেমেরই এক কোণে মাসুদ দাঁড়িয়ে ছিল একা। একনাগাড়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখছে।

কী দেখছে—জানতে চাইলে বলল ঘটনাটা, যা ও নিজেও দেখেনি।

মাসুদের বাবা একসময় সাগরে জেলে নৌকায় কাজ করত। বেশ কয়েক বছর আগে, অর্থাৎ মাসুদের জন্মের পর পর, কোনো এক ঝড়ের সময় নৌকা থেকে পড়ে যায় সে। খুব সম্ভবত সাগরের উত্তাল ঢেউ তাঁকে গভীর তলদেশ অব্দি টেনে নিয়ে যায়। কারণ, তাঁর লাশটাও নাকি পাওয়া যায়নি পরবর্তী সময়ে।

বুঝলাম কক্সবাজারে আমি যা দেখি আর ও যা দেখে তার ভেতরে বিস্তর তফাত। এই তফাত ঘোচানোর সক্ষমতা হয়তো আমার নেই, তবে যদি সুযোগ পাই এই তফাতের গল্প কোনো একদিন আমি তুলে আনব ফ্রেমে।

রাত ৮টার পর্যটন এক্সপ্রেস ট্রেন ধরে ঢাকা পৌঁছাই পরদিন ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বাসায় এসে পৌঁছতে পৌঁছতে ভোর ছয়টা। কলিংবেল দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আম্মু দরজা খুলে দেয়। আমার পৌঁছাতে পৌঁছাতে যে ভোর হবে তা আম্মুকে বলেছিলাম সন্ধ্যায়। তাই, বোধ হয় ফজরের নামাজের পর ঘুমায়নি আর।

ফ্রেশ হয়ে যখন খাওয়াদাওয়া করছিলাম এ সময় ডাইনিং টেবিলে আম্মু এমন একটা বিষয়ে বলতে শুরু করল যার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।

বুঝতে পারছিলাম না কী বলব, আর কী করব। এমন পরিস্থিতিতে আমার কি হেসে ফেলা উচিত, রাগের ভাব দেখান উচিত, নাকি কেবল খাবারের ওপরেই ফোকাস করা উচিত।

ভেবেচিন্তে দেখলাম ৩ নং অপশনটাই উপযুক্ত হয়। তাই চুপচাপ বসে খাবারের দিকেই ফোকাস করলাম। আর এদিকে আম্মুও মূল প্রসঙ্গে ফোকাসড! - এ ব্যাপারে বিস্তারিত আরেক দিন বলব না হয়। আগে আমিও বুঝি ব্যাপারখানা কোনো দিকে গড়ায়।

এই দীর্ঘ জার্নির প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অনিশ্চিত। আগমুহূর্তেও জানতাম না পরের পর্বে কী আছে। এভাবেই কেটে গেল অফ গ্রিডে ১২ দিন। বিছানায় শুয়ে যখন ঘুমিয়ে যাব যাব, তখন কে যেন আমারই কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আবৃত্তি—

করছে আমার কানের কাছে:

‘কে তুমি?

আমি কৃষ্ণ চন্ডাল চাঁদ,

চাঁদেরও করেছি দাহ,

পুড়েছে মানব মন, পরিচয় আর অযাচিত দেহ!

দিনে আর রাত্তিরে, শুক্লপক্ষে-কৃষ্ণপক্ষে

কখনো আমি শঙ্কর শিব,

কখনোবা নেড়ি কুকুরের মতো জাহান্নামের কিট!

আমার এক হাতে অগ্নিশিখা, অন্য হাতে ভাগ্যরেখা,

আমার এক বাহুতে আপন মুখাগ্নির আগুন

কি যে জ্বলছে দারুণ,

ইস্রাফিলের দরুণ!

অন্য বাহুতে জীবনের শুভ্রবীজ,

অংকুরিত শিশু আর ব্যাসবাক্যে তরুণ,

মাঝখানেতে আমি

আমার বরাবর,

সায়াহ্ণ-অপরাহ্ণের খাঁজে

অজয় প্রক্ষীপ্ত ব্রীজ’

অনিশ্চিত গন্তব্যের সুনিশ্চিত যাত্রায় রোমাঞ্চ কখনো শেষ হয় না, বারেবারে রূপ বদলায় কেবল। শেষ...