নগরকৃষি: শহুরে জীবনে এক নতুন ধারা

চট্টগ্রামের একটি ছাদবাগানপ্রথম আলো ফাইল ছবি

বাংলাদেশ বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এতে করে কৃষির যে ঐতিহ্য, তার ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় এক শতাংশ হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষিজমির যে স্বল্পতা, তা অদূর ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আধুনিক জীবনধারা নগরকেন্দ্রিক হওয়ায় শহরের সীমিত স্থানকে উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহের চাকাকে নিরাপদ রাখার বিষয়টি সামনে চলে আসছে। এরই প্রেক্ষাপটে নগরকৃষির বিষয়টি সামনে চলে আসে এবং এর প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করে।

নগরকৃষি হলো কোনো নগর ও তার আশেপাশে খাদ্যশস্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিতরণ ও বাজারজাতকরণের সব কার্যক্রম। এটি কেবল শখের বশে বাগান করাকে বোঝায় না। শাকসবজি, ফলমূল, মাশরুম, মাছ ও জলজ প্রাণীর চাষ, হাঁস-মুরগি থেকে শুরু করে পশুপালন ও দুগ্ধ উৎপাদনসহ সব কার্যক্রমই নগরকৃষির আওতাভুক্ত। একটা সময় শহুরে নাগরিকদের অবসর সময় কাটানো, মানসিক প্রশান্তি কিংবা পরিবারের জন্য নিরাপদ, তাজা শাকসবজি, ফলমূলের জোগান নিশ্চিত করার চিন্তা থেকে শুরু হলেও বর্তমানে নগরকৃষি একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত হিসেবে বিবেচিত। সেই সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

নগরকৃষির উদাহরণসমূহ

* ছাদকৃষি বা ছাদবাগান: ভবনের ছাদে, বারান্দায়, অব্যবহৃত জায়গায়, ব্যালকনিতে টবে বা বেডে শাকসবজি, ফল, ফুল চাষ করা হয়। এটি নগরে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। এর মাধ্যমে পারিবারিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিবেশেও ঠান্ডা রাখা সম্ভব হয়।

* উল্লম্ব কৃষি: বহুতল ভবনের ভেতরে বা বাইরে স্তরে স্তরে তাক বা টাওয়ারে শাকসবজি আবাদ করা হয়। কম জায়গায় বেশি ফলনের জন্য ভার্টিক্যাল ফার্মিং সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত।

* হাইড্রোপনিকস ও অ্যাকোয়াপনিকস: মাটি ছাড়া পানি ও পুষ্টি দ্রবণের সাহায্যে অথবা মাছের চাষের সঙ্গে সবজি চাষ করা। এটি ইনডোর ফার্মিং এর জন্য চর্চা করা যেতে পারে। প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে ভূমির স্বল্পতা মোকাবিলায় এগুলো অত্যন্ত কার্যকর।

এগুলো ছাড়া রয়েছে ল্যান্ডস্ক্যাপ হর্টিকালচার, রোড সাইড ল্যান্ডস্ক্যাপিং, টাওয়ার গার্ডেন, হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির টাওয়ার গার্ডেন, রিসোর্ট গার্ডেনিং, বায়োওয়াল বা গ্রিনওয়াল, উচ্চমূল্যের ফসলের জন্য গ্রিনহাউস এবং প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরির মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষাবাদ ব্যবস্থা।

বর্তমান প্রেক্ষাপট:

নগরকৃষি নিয়ে পুরোনো একটি ধারণা ছিল যে ভবনের ছাদে শুধু ছোট জাতের ঝোপালো ফল, সবজিজাতীয় গাছ লাগানো ভালো। তবে এই ধারণা বর্তমান সময়ে এসে পাল্টে গেছে। ছাদবাগান পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রয়াসে বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিস্তৃত ফলের সমাহার শহরের ছাদবাগানগুলোয় দেখা যাচ্ছে। ফলের মধ্যে আম, জাম, কলা, লিচু, পেয়ারা, সিডলেস লেবু, মাল্টা, মিষ্টি তেঁতুল, জামরুল, কামরাঙা, আনার, বারোমাসি আম, রাম্বুটান, সফেদা, অ্যাভোকাডো, থাই ও মিসরীয় ডুমুর, নারকেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছপালা ছাদবাগানগুলোয় লাগানো হচ্ছে। গত ১৫-২০ বছরে বিভাগীয় শহর ও উপশহরগুলোয় ছাদবাগান পরিচালনাকারী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ছাদকৃষিতে এসেছে বৈচিত্র্য, বেড়েছে ছাদকৃষির আধিপত্য।

বৈশ্বিক উদাহরণ

বাইরের দেশগুলোয় নগরকৃষির দারুণ সব উদাহরণ রয়েছে। আমাদের দেশে নগরকৃষি বলতে এখনো পর্যন্ত আমরা মোটাদাগে ছাদবাগান বা ছাদকৃষিকেই বুঝে থাকি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার হিসেবে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৬৭ শতাংশ লোক শহর এলাকায় চলে আসবে। তাই তারা নগরকৃষিকে নিয়ে বেশি ভাবছে। জাপানের টোকিও শহরের প্রায় ৭ লাখ মানুষের সবজি আসে নগরকৃষি থেকে। নিউইয়র্কে প্রায় ১০০ একর জমি ব্যবহার করে হচ্ছে নগরকৃষিতে। এ রকম উদাহরণ অনেক আছে। ইউরোপের একটি উন্নত দেশ নেদারল্যান্ডস। এখানে বাতিল করে দেওয়া একটি ছয়তলাবিশিষ্ট ভবনে গড়ে উঠেছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় নগরকৃষির কেন্দ্র। আধুনিক নগরকৃষির জন্য সুস্পষ্ট নগরকৃষির পরিকল্পনার মাধ্যমে বাইরের দেশগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রথম আলো ফাইল ছবি

নগরকৃষি ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা

আমাদের জায়গা সীমিত। গ্রামীণ কৃষিতেও জমির পরিমাণ আস্তে আস্তে কমতে থাকবে, যদি নতুন কোনো ভূখণ্ড দেশের সীমানায় জেগে না উঠে। সে ক্ষেত্রে কোনো জায়গা খালি রাখার মতো বিলাসিতা করার সুযোগ আমাদের নেই। নগরের সীমিত জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের তাই উল্লম্ব কৃষি অর্থাৎ ভার্টিক্যাল ফার্মিং এর দিকে ধাবিত হতে হবে। এই পদ্ধতিতে একটি খোলা মাঠের তুলনায় প্রতি বর্গমিটারে ১৫ গুণ বেশি সবজি উৎপাদন করা সম্ভব, যদি উন্নত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নিয়ন্ত্রিত পুষ্টি সরবরাহ এবং এলইডি আলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। যদিও প্রাথমিকভাবে বিষয়গুলো একটু জটিল মনে হলেও বাংলাদেশের ২০৪১ সালের যে ভিশন, তাতে প্রযুক্তিগত এই অগ্রযাত্রাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এতে করে আমরা আমাদের শহর কিংবা উপশহরগুলোকে খাদ্য উৎপাদনকারী একটি সবুজ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারব।

ছাদবাগান বা ছাদকৃষি ভবনের ছাদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং ভেতরের ঘরকে শীতল রাখবে। ইটপাথরের নগরীতে দালানকোঠা, গাড়ির ধোঁয়া, জলাধার হ্রাস, কারখানার বিষাক্ত গ্যাস, ধুলার আধিক্য—গ্রামের তুলনায় শহরের তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়। ছাদবাগানের মাধ্যমে শহরের প্রতিটি ছাদকে যদি সবুজ বাগানে পরিণত করা যায়, তাহলে শহরের বুকে নির্মল বাতাস পাওয়া যাবে। এতে করে শহরে তাপের প্রশমন হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদবাগান সংশ্লিষ্ট রুমের ভেতরের তাপমাত্রা গরমকালে ১-১.২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০১ সাল থেকে টোকিও মেট্রোপলিটন সরকারের নতুন ছাদের ন্যূনতম ২০ শতাংশ জায়গায় বাগান করার বাধ্যবাধকতার যে নীতি চালু করা হয়েছে—যার ফলে টোকিও সিটির গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট হ্রাস পেয়েছে।

বিভাগীয় শহরগুলোয় অধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কার্বন ডাই–অক্সাইড,নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন গ্যাস, ক্ষুদ্র ধূলিকণা ইত্যাদি কারণে তাপমাত্রা গ্রামের তুলনায় বাড়ছে এবং শহরগুলোয় তাপদ্বীপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। এ ক্ষেত্রে ছাদবাগান কার্বন ডাই–অক্সাইডসহ অন্যান্য বায়ুদূষণকারী উপাদানের মাত্রা কমিয়ে পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছাদবাগান যে এলাকায় আছে, সেখানে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ ৭০ পিপিএম পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে ছাদবাগান যদি সারা ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে প্রসার করা যায় এবং বিভাগীয় শহরগুলোয়ও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরের তাপদ্বীপ প্রভাব ও পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখতে পারবে।

আর্থসামাজিক প্রভাব এবং জীবিকায় অবদান

গ্রামীণ কৃষিকে শহরে নিয়ে আসতে পারলে এর আর্থসামাজিক প্রভাব বহুমুখী হবে। এটি কেবল শহুরে নাগরিকদের নিরাপদ খাদ্যসরবরাহ নিশ্চিত করবে না, সেই সঙ্গে তাদের জীবনমান, সামাজিক সম্প্রীতি, মানসিক প্রশান্তি ও বাড়তি আয়বর্ধক উৎস হিসেবে বিবেচিত হবে।

১. নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য প্রাপ্তি

নগরকৃষির আওতাভুক্ত একটি এরিয়া হলো ছাদকৃষি অথবা ছাদবাগান। প্রথাগত কৃষিতে ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার, বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। নিরাপদ ফসল প্রাপ্তিতে এটি একটি অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে ছাদকৃষি এই সমস্যার পথে একটি উত্তম সমাধান হিসেবে কাজ করবে। কারণ, ছাদকৃষি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বিষমুক্ত ও তাজা ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে।এতে করে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।

২. মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক সমৃদ্ধি

নগরকৃষিকে শুধু আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে হবে না। মানসিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হবে। কর্মব্যস্ত শহুরে সমাজে মানুষের যেন দম ফেলার সময় নেই। যেটুকু সময় পায়, তা–ও যেন ডিজিটাল ডিভাইসে বন্দী হয়ে আছে। এতে করে মানবিক মূল্যবোধ সমৃদ্ধ সমাজ, শহুরে নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি—এগুলো যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। নগরকৃষি এ ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। সুস্থ বিনোদন ও অবসর সময় কাটানোর একটি স্বাস্থ্যকর মাধ্যম হলো নগরকৃষি। এটি শহুরে নাগরিকদের মাঝে মানসিক প্রশান্তি এনে তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং নান্দনিক চেতনা, মূল্যবোধ তৈরি করবে। নগরকৃষিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ, তাদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে।

৩. আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস

ছাদকৃষি পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পরিবারের বাজেট সঞ্চয়ে ছাদকৃষি ভূমিকা রাখতে পারে। কাঠামোগত আনুষ্ঠানিক বসতি ছাড়াও শহর বা উপশহরগুলোয় অনানুষ্ঠানিক অনেক বসতি থাকে। এই অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোয় শহরকৃষি জীবনধারণের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ রাজধানী ঢাকার কড়াইল বস্তির কথা বলা যেতে পারে। এই অনানুষ্ঠানিক বস্তির মানুষগুলো সংসারের অর্থনৈতিক ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে বনানী লেকের পাশের খালি জমিগুলোয় ছোট ছোট আকারে নানা ধরনের মৌসুমি ফসলের আবাদ করে থাকে। সংকটকালীন সময়ে ক্ষুদ্র এই কার্যক্রম তাদের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এভাবে নগরকৃষি শহর ও উপশহর এলাকায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোর মানুষের মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

বাণিজ্যিক ও টেকসই সম্প্রসারণের প্রধান অন্তরায়

নগরকৃষি বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষের কাছে শৌখিন কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যারা এ কাজ করছে, তারা সাধারণত শখের পর্যায় থেকে কাজটি করছে। নগরকৃষি থেকে উৎপাদিত পণ্য সাধারণত পারিবারিক চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি প্রতিবেশীদের মধ্যে আদান-প্রদান হয়ে থাকে। এটাকে টেকসই বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করা এখনো সম্ভব হয়নি। এটা সম্ভব না হওয়ার পেছনে কিছু বাধা রয়েছে। বাধাগুলোকে মোটাদাগে কারিগরি ও কাঠামোগত—এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

১. প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা

নগরকৃষি বলতে অনেকেই ছাদবাগান বা ছাদকৃষিকে মনে করে থাকে। কিন্তু নগরকৃষির আওতা আরও ব্যাপক। উল্লম্ব বা ভার্টিক্যাল ফার্মিং, ইন্ডোর ফার্মিং, ল্যান্ডস্ক্যাপ হর্টিকালচার, রোডসাইড ল্যান্ডস্ক্যাপিং ইত্যাদি বিষয়গুলোও নগরকৃষির আওতায় পড়ে। এগুলো সম্পর্কে নগরবাসীর মধ্যে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। বাজার থেকে বীজ কিনে, একটু মাটি এনে ছাদবাগান করে ফেললাম—বিষয়টা আসলে এতটা সহজ নয়। ছাদবাগান কীভাবে করতে হবে, এর বালাই ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সার প্রয়োগ কীভাবে করতে হবে এবং সর্বোপরি জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কারিগরি জ্ঞান নগরবাসীর অনেকের মাঝেই নেই। যার ফলশ্রুতিতে বাগান করার শুরুর দিকে আগ্রহ থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা আর টেকসই হয় না। এ ক্ষেত্রে যারা এ কাজে আগ্রহী, তাদের কাঠামোগত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। এটা তো শুধু নগরকৃষির একটি অধ্যায় ছাদবাগান বা ছাদকৃষির ক্ষেত্রে বলা হলো। নগরকৃষির অন্যান্য আওতাভুক্ত এরিয়াগুলো নিয়ে সাধারণ নগরবাসীর কারিগরি জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোঠায়।

২.উপকরণ প্রাপ্তিতে সমস্যা:

নগরকৃষির আওতাভুক্ত এরিয়াগুলোর জন্য যে ধরনের উপকরণ দরকার, তা সহজলভ্য নয়। মাঠের কৃষির উপকরণ এবং নগরকৃষির উপকরণ—এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন কেউ যদি ছাদে ভার্টিক্যাল পদ্ধতিতে আবাদ করতে চায়, তাহলে তার জন্য আলাদা ধরনের সরঞ্জামাদি প্রয়োজন। আবার কেউ যদি হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে আবাদ করতে চায়, তাহলে গাছের পুষ্টি সরবরাহ ঠিক রাখতে তাকে হাইড্রোপনিক্স পুষ্টি দ্রবণের প্রয়োজন হবে। এগুলো কোনটিই আসলে সহজলভ্য নয়। এর পাশাপাশি রয়েছে গুণগত মানসম্মত জৈব সারের অভাব। নগরকৃষিতে নিরাপদ ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে জৈব সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তবে এখানেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। মানসম্মত জৈব সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য উৎপাদিত হয়, কিন্তু তা থেকে মানসম্মত, দূষণমুক্ত জৈব সার উৎপাদন করা ও তা সরবরাহ করা এখনো অনেক চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। এই যে বিভিন্ন ধরনের ইনপুট পেতে নানাবিধ সমস্যা, এর কারণেও নগরকৃষির স্থায়িত্ব টেকসই হয় না।

৩.অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোয় যাঁরা ইটপাথরের দালান অথবা আধুনিক ফ্ল্যাটে বসবাস করেন, সেখানে ছাদবাগান কিংবা ভার্টিক্যাল ফার্মিং করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভবনের ছাদের সুরক্ষা। ভবনমালিকেরা এ বিষয়ে ভয়ে থাকেন যে, ছাদবাগান কিংবা উল্লম্ব ফার্মিং তার ভবনের ক্ষতি করে ফেলতে পারে। এর পাশাপাশি নগরকৃষির আওতায় ছাদবাগান কিংবা অন্যান্য যে কার্যক্রমগুলো আছে, তার যেকোনোটি প্রাথমিকভাবে স্থাপন করতে গেলে খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে ভবনের ওজনের সঙ্গে ছাদবাগানের উপকরণের সমন্বয়, ছাদের সুরক্ষা পরীক্ষা, পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা-এগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল।

আরও পড়ুন

টেকসই নগরকৃষির জন্য সমন্বিত সুপারিশমালা

নগরকৃষিকে টেকসই করতে হলে শৌখিনতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। একে মূলধারার কৃষি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে নগরবাসীর খাদ্যনিরাপত্তা এবং বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:

১. নতুন নির্মিত ভবনে (আবাসিক/বাণিজ্যিক) নগরকৃষির জন্য জায়গা রাখা: প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর ক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষ (সিটি করপোরেশন/পৌরসভা) নতুন নির্মিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য নগরকৃষি করতে নির্ধারিত কিছু স্থান রাখা বাধ্যতামূলক করতে পারে। এতে করে আমাদের শহরগুলোর গড় তাপমাত্রা কমবে। বাইরের দেশে এ রকম উদাহরণ আছে। যেমন টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার নতুন ছাদের ন্যূনতম ২০ শতাংশ জায়গায় বাগান করা বাধ্যতামূলক করে ২০০১ সালে একটি আইন পাস করেছে।

২. সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ

স্থানীয় সরকার এবং প্রকৌশল সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। যেসব ভবন মালিক অথবা ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ছাদকৃষির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে, তাদের সম্মাননা প্রদান করতে পারে। জাতীয়ভাবে এটা প্রচার করতে পারে। পাশাপাশি এসব ভবনের সুরক্ষার বিষয়টি সংস্থাগুলো নিয়মিত মূল্যায়ন করলে ভবনমালিকদের ভেতরে ছাদবাগান বা ছাদকৃষি নিয়ে যে ভয় কাজ করে, তা কমবে।

৩. বিশেষায়িত নগরকৃষি উইং তৈরি

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পেতে উন্নত দেশগুলো তাদের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় নানা ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। এর মধ্যে নগরকৃষি পরিকল্পনা অন্যতম। মাঠের কৃষির থেকে নগরকৃষির কার্যক্রম আলাদা। এ ক্ষেত্রে নগরকৃষির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ‘নগরকৃষি উইং’ নামে আলাদা একটি উইং সৃষ্টি করে এর কার্যক্রমকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।

৪. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার (ই-কৃষি)

নগরকৃষির কার্যক্রমকে বেগবান করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তথ্য সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মাধ্যমে নগরবাসীদের জন্য অনলাইন পরামর্শ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে কৃষিসংক্রান্ত প্রযুক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতে হবে।

পাশাপাশি নগরকৃষিতে আগ্রহীদের জন্য অনলাইন ডিজিটাল প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ ও সম্প্রসারণ

শুধু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নগরকৃষির উন্নয়নে কাজ করবে—এমনটা হলে চলবে না। বিভাগীয় শহরগুলোয় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। তারা ছাদকৃষির জন্য পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। রাজধানীর শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগ ছাদবাগানভিত্তিক ইকো সেন্টার স্থাপন করেছে। এ ইকো সেন্টারটি পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কম্পোস্টিং, কার্বন শোষণ ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। এ ধরনের ইকো সেন্টারের মাধ্যমে বিভাগীয় শহরগুলোয় নগরকৃষির কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দেওয়া যেতে পারে।

নগরকৃষি বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, যদি আমরা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে সঠিক ইনপুট সরবরাহ করতে পারি। এর সফলতা নির্ভর করবে সব বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর। কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, প্রকৌশল সংস্থাগুলো যদি নিজেদের মধ্যে আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ স্থাপন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে নগরকৃষি কেবল খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করবে না—এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারবে। শহুরে নাগরিকদের উন্নত জীবনমান, জীবিকা নির্বাহে নগরকৃষি রাখবে সরাসরি অবদান।

মো. হাসান ইমাম, কৃষিবিদ

নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]