বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস: আমাদের প্রাপ্য ও প্রাপ্তি
২৫ সেপ্টেম্বর—বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস।
একদিন ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে গিয়েছিলাম। এমন সময় একজন রোগী এসে দোকানদারকে বললেন—
রোগী: ভাই, কাল থেকে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। ওষুধ দেন।
দোকানদার: আর কোনো সমস্যা আছে?
রোগী: খুব শুকনা কাশি, গলা ব্যথা, ঠান্ডা—সঙ্গে শ্বাসকষ্টও আছে। অনেকবার বমি হয়েছে। কিছুদিন আগেও জ্বর হয়েছিল। তখন যে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন, মনে আছে?
দোকানদার খুব স্বাভাবিকভাবেই বললেন—
দোকানদার: ভাই, সমস্যা নেই। এটা মৌসুমি সমস্যা। ওষুধ দিচ্ছি, ঠিক হয়ে যাবে। এই অ্যান্টিবায়োটিকটা পাঁচ দিন, দিনে দুইবার খাবেন। সঙ্গে কাশি ও ঠান্ডার ওষুধও দিলাম। সমস্যা হলে জানাবেন।
রোগীও সন্তুষ্ট মনে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর আমি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম—
আমি: ভাই, চিকিৎসক দেখানো বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এতগুলো উপসর্গের ভিত্তিতে কীভাবে ওষুধ দিয়ে দিলেন? বিশেষ করে কিছুদিন আগেও তিনি অ্যান্টিবায়োটিক নিয়েছেন বলছেন। ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার তো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
দোকানদার বললেন
দোকানদার: ভাই, কী করব বলেন? এরা আছে বলেই তো আমরা কিছু করে খাই। সবার কি আর ডাক্তার দেখানোর সময় আছে? আর রাত-বিরাতে ডাক্তার পাওয়া যায় কোথায়?
তখন আমার আরেকটি প্রশ্ন ছিল
আমি: আপনাদের তো মডেল ফার্মেসি বলা হয়। এখানে ফার্মাসিস্ট কোথায়?
দোকানদার: আছে তো। তবে সব সময় ডাকি না। সরকারি লোকজন এলে দেখাই। আর কিছু বলার না থাকলে ভাই, এখন আসতে পারেন—দেখতেই তো পাচ্ছেন, দোকানে অনেক কাস্টমার।
ফার্মেসি থেকে বের হয়ে মনে হলো—এখানে দায়টা কার?
দোকানদার?
রোগী?
ফার্মাসিস্ট?
না আমাদের পুরো ব্যবস্থার?
একজন দোকানদার যখন ফার্মাসিস্টের পেশাগত দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তাহলে একজন ফার্মাসিস্টকে এত বছর ধরে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নিতে হয় কেন?
ফার্মাসিস্টের কাজ কি শুধু ওষুধ বিক্রি করা?
ফার্মাসিস্ট শুধু ওষুধের নাম জানেন—বিষয়টি এমন নয়। ফার্মেসি শিক্ষা একজন পেশাজীবীকে ওষুধের গুণগত মান, নিরাপদ ব্যবহার, সংরক্ষণ, মাত্রা, ওষুধের পারস্পরিক ক্রিয়া, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ব্যবহার-নিষেধ এবং রোগীর জন্য ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজনীয় পরামর্শ সম্পর্কে পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
অন্যদিকে, একটি ওষুধ রোগীর হাতে পৌঁছানোর আগে গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন, গুণগত নিয়ন্ত্রণ, গুণগত নিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষণ ও বিতরণসহ বহু ধাপ অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহি।
তাই একজন ফার্মাসিস্টের সম্ভাবনা শুধু ওষুধ শিল্পে চাকরি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
কমিউনিটি ও হাসপাতাল ফার্মেসি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কমিউনিটি ফার্মেসি এবং হাসপাতাল ফার্মেসি একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
একজন প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীকে ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম, সঠিক সময় ও মাত্রা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে সহযোগিতা করতে পারেন।
বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার করা, ভুল মাত্রায় ব্যবহার করা অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার ব্যবহার করা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই অ্যান্টিবায়োটিকসহ সব ধরনের ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, নার্স, রোগী এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
২ টাকার ওষুধের পেছনেও থাকে বিশাল একটি ব্যবস্থা
ফার্মেসি থেকে আমরা যখন সামান্য মূল্যের একটি ওষুধ কিনে খাই, তখন হয়তো কখনো ভাবি না—এই ওষুধটি রোগীর হাতে পৌঁছানোর আগে কতগুলো ধাপ অতিক্রম করেছে।
একটি ওষুধের কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন, উৎপাদনকালীন পরীক্ষা, বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষাগার পরীক্ষা, নথিপত্র তৈরি, গুণগত নিয়ন্ত্রণ, গুণগত নিশ্চয়তা, ব্যাচ পর্যালোচনা এবং বাজারজাতকরণের অনুমোদন—প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব, যাচাই ও জবাবদিহি।
অর্থাৎ একটি ছোট ট্যাবলেটের পেছনেও রয়েছে অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত শ্রম, জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা।
শুধু একটি দিবস উদ্যাপন নয়
২৫ সেপ্টেম্বর ফুল, পোস্টার, সেমিনার কিংবা শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ফার্মাসিস্টদের পেশাগত সক্ষমতাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
কমিউনিটি ফার্মেসি ও হাসপাতাল ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টদের কার্যকর সম্পৃক্ততা বাড়ানো গেলে—
* ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়তে পারে;
* রোগীর ওষুধ-ব্যবহার বিষয়ক পরামর্শ আরও কাঠামোবদ্ধ হতে পারে;
* অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে পারে;
* ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য পারস্পরিক ক্রিয়া সম্পর্কে রোগীকে যথাযথ তথ্য দেওয়া সহজ হতে পারে;
* ওষুধ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এর জন্য শুধু ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করলেই হবে না; স্পষ্ট দায়িত্ব, যথাযথ প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা, নিয়ন্ত্রিত কর্মপরিবেশ এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।
ফার্মাসিস্টদের আরও বিস্তৃত সুযোগ প্রয়োজন—
বাংলাদেশের ফার্মাসিস্টরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। উৎপাদন থেকে শুরু করে গুণগত নিয়ন্ত্রণ, গুণগত নিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম, গবেষণা ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান রয়েছে।
এখন সময় এসেছে তাঁদের জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার ওষুধশিল্পের বাইরেও স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য উপযুক্ত ক্ষেত্রে আরও কার্যকরভাবে সম্প্রসারিত করার।
একজন ফার্মাসিস্টের পরিচয় শুধু একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মী হিসেবে নয়; তিনি হতে পারেন ওষুধের নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহারের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেজন্য প্রয়োজন—
উদ্যোগ, নীতিগত সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বীকৃতি, সঠিক কর্মপরিবেশ এবং যথাযথ সুযোগ।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়—আমাদের প্রত্যাশা হোক, দেশের প্রতিটি উপযুক্ত ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ফার্মাসিস্টদের সম্ভাবনার পরিধি আরও বিস্তৃত হোক।
নিরাপদ ও যৌক্তিক ওষুধ ব্যবহারের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হোক।
রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা আরও সুদৃঢ় হোক।
শুভ হোক বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস।
* লেখক: মনোজিৎ কুমার রায়, দেশীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত