শিশুর বিকাশ মানে শুধু শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠা নয়। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শেখার সুযোগ, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার সমন্বয়েই একটি শিশুর পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত হয়। কিন্তু সিলেটের শিশুদের বাস্তবতা বলছে, এই সমন্বিত সুযোগ নিশ্চিত করতে এখনো অনেক পথ বাকি। শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে তার ওজন, উচ্চতা কিংবা বয়স অনুযায়ী শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশ, ভাষা শেখা, চিন্তাশক্তি, সামাজিক সম্পর্ক, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও শেখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। এই সমন্বিত ধারণাকেই বলা হয় সমন্বিত শিশুবিকাশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংকের লালন–পালন কাঠামো অনুযায়ী, শিশুর পূর্ণ বিকাশের জন্য পাঁচটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত—সুস্বাস্থ্য, পর্যাপ্ত পুষ্টি, সংবেদনশীল পরিচর্যা, প্রারম্ভিক শেখার সুযোগ এবং নিরাপত্তা ও সুরক্ষা। তাই শিশুর জন্য শুধু চিকিৎসক বা হাসপাতাল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক, খেলাধুলা ও শেখার সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনের সময় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা।
প্রথম পাঁচ বছর কেন গুরুত্বপূর্ণ
গর্ভাবস্থা থেকে জীবনের প্রথম পাঁচ বছর, বিশেষ করে প্রথম এক হাজার দিন, শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। জীবনের প্রথম তিন বছরের মধ্যে মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন সম্পন্ন হয়। মা–বাবা বা পরিচর্যাকারীর হাসি, কথা বলা, স্পর্শ ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মতো অভিজ্ঞতা শিশুর মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ শক্তিশালী করে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য, ভয়, পারিবারিক সহিংসতা বা অবহেলা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করতে পারে।
এই সময়ে পুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ এবং ছয় মাস পর বয়সোপযোগী ও পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিচর্যা ও পুষ্টির ঘাটতির প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উপার্জনক্ষমতা ও সামাজিক আচরণেও পড়তে পারে। প্রারম্ভিক শিশুবিকাশে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। এ খাতে ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে ১৩ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রতিদান পাওয়া যেতে পারে।
সিলেটের চিত্র উদ্বেগের
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ইউনিসেফ ও অন্যান্য অংশীদারের সহযোগিতায় পরিচালিত ২০২৫ সালের একাধিক নির্দেশক জরিপের বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে সিলেটের শিশুদের সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়।
সিলেট বিভাগে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে ৪৩ জন। জাতীয় হার ৩৩। নবজাতক মৃত্যুহার প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে ২৯ জন, জাতীয় হার ২২। এক বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার সিলেটে ৪০ জন, যেখানে জাতীয় গড় ২৯। অর্থাৎ শিশুর বেঁচে থাকা ও সুস্থ বিকাশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
খাদ্যঘাটতি ও পুষ্টি
৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সিলেটে খাদ্যদারিদ্র্যের হার ৭২ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু তীব্র খাদ্যদারিদ্র্য এবং ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি খাদ্যদারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। জাতীয় হার ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই বয়সী শিশুদের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করে, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় গড় ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। শিশুর গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকালে খাদ্যের বৈচিত্র্য ও গুণগত মানের ঘাটতি শুধু শারীরিক বৃদ্ধিকে নয়, মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
শেখার শুরুটাও পিছিয়ে—
শিশুর শেখা স্কুলে যাওয়ার পর শুরু হয় না। কথা বলা, গল্প শোনা, বই দেখা, গান শোনা ও খেলাধুলার মধ্য দিয়েই শেখার ভিত্তি তৈরি হয়। সিলেটে দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ৬৭ শতাংশ স্বাস্থ্য, শেখা ও সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে সঠিক বিকাশের পথে রয়েছে। জাতীয় গড় ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
৩৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার সিলেটে মাত্র ১৩ শতাংশ<bha>;</bha> জাতীয় হার ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আটটি বিভাগের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে আগের বছর প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে আসার হার সিলেটে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ।
ঘরের শেখার পরিবেশেও ঘাটতি রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশের ঘরে তিনটি বা তার বেশি শিশুবই রয়েছে। অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর ঘরে তিনটি বা তার বেশি বই নেই।
রক্তে সিসা, অদৃশ্য বড় ঝুঁকি—
শিশুর বিকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো সিসা দূষণ। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে। সিলেটে এই হার ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ—জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি এবং বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
সিসার সংস্পর্শ শিশুর শেখা, আচরণ, বৃদ্ধি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সিসা দূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে নয়, শিশুর মস্তিষ্ক ও বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও দেখতে হবে।
সিলেটের বিশেষ বাস্তবতা—
সিলেটের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রবাসী অভিভাবকের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ২ শতাংশের অন্তত একজন অভিভাবক বিদেশে বসবাস করেন। জাতীয় হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। অভিভাবকের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে অনেক শিশুর পরিচর্যার দায়িত্ব পড়ে দাদি, নানি বা অন্য কোনো পরিচর্যাকারীর ওপর। ফলে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা, সংবেদনশীল পরিচর্যা ও সামাজিক–আবেগীয় বিকাশের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
সিলেটের হাওর এলাকায় বছরের প্রায় ছয় মাস প্লাবন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক পরিবার নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পুষ্টিসেবা ও প্রাক্–প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে দূরে থাকে। চা–বাগান এলাকার শিশুদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, নিম্ন মজুরি, অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সীমাবদ্ধতা এবং প্রাক্–প্রাথমিক শিক্ষার সীমিত সুযোগ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সীমান্তবর্তী ও দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে দূরত্ব, যাতায়াতের ব্যয় ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতাও বাধা। তাই সিলেটের সব শিশুর জন্য একই ধরনের কর্মসূচি যথেষ্ট না–ও হতে পারে।
করণীয়
শিশুর বিকাশে বিলম্ব যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মানসম্মত বিকাশ যাচাইয়ের সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর বিশেষায়িত সেবায় পাঠানোর জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পুষ্টির ক্ষেত্রে পরিপূরক খাবার প্রস্তুতি ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুষ্টি পরামর্শ দরকার।
শিশুর শেখার জন্য ঘরে প্রাথমিক উদ্দীপনার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী বা কার্যগত সমস্যায় থাকা শিশুদের প্রাক্–প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি দূর করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ বিষয়ে সমন্বিত প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতাল ও চিকিৎসকের চেম্বারকেও শিশুর বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় শিশুর বিকাশ পর্যবেক্ষণ, অভিভাবকের উদ্বেগ শোনা, বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, পুষ্টি পরামর্শ এবং প্রয়োজন হলে বিকাশ যাচাই করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে শিশুকে বিশেষায়িত সেবায় পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সিলেটের বাস্তবতায় হাওর ও দুর্গম এলাকায় নৌযানভিত্তিক বা ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে টিকাদান, পুষ্টি ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। চা–বাগান এলাকায় মা ও শিশুর সহায়তা কর্মসূচি নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী পরিবারের বিকল্প পরিচর্যাকারীদের জন্য অভিভাবকত্ব সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে শিশুবিকাশ কমিটিকে সক্রিয় করা, বাজেট বরাদ্দ, কমিউনিটি শিশুবিকাশ কেন্দ্র ও দিবাযত্নকেন্দ্র চালু এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে বিকাশ যাচাই যুক্ত করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে জন্মনিবন্ধন থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাক্–প্রাথমিক শিক্ষা ও সুরক্ষা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
সিলেটের শিশুদের চ্যালেঞ্জগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। শিশুমৃত্যু, খাদ্যদারিদ্র্য, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রাক্–প্রাথমিক শিক্ষায় কম অংশগ্রহণ, বই ও শেখার উপকরণের ঘাটতি, সিসা দূষণ, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক–সামাজিক ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
সিলেটের হাওর, চা–বাগান, সীমান্তবর্তী এলাকা, দুর্গম গ্রাম কিংবা প্রবাসী পরিবারের শিশুর বাস্তবতা এক নয়। ফলে সমাধানও এক রকম হতে পারে না। স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল সমন্বিত পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই পারে সিলেটের শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে।
*লেখক: অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী: উপাচার্য, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়