কুটিরশিল্প: বাংলার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অমূল্য সম্পদ হলো কুটিরশিল্প। মাটির তৈরি পাত্র থেকে শুরু করে জামদানি শাড়ি, নকশিকাঁথা, বেত-বাঁশের কাজ, মৃৎশিল্প, এসব শুধু হাতের নৈপুণ্যের ফল নয়, বরং হাজার বছর ধরে লালিত একটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থারই অংশ। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির গতিপ্রবাহে, বিশেষত ক্ষুদ্র উদ্যোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে কুটিরশিল্পের গুরুত্ব অসামান্য। একে শুধু অতীতের ঐতিহ্য হিসেবেই না দেখে, ভবিষ্যতের সম্ভাবনামুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)–এর তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি, যার একটি বড় অংশ নারী শ্রমশক্তি। কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত দেশের জিডিপিতে প্রায় ৩ থেকে ৭ শতাংশ অবদান রাখে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ৪০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে। শুধু তাই নয়, এই খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১ থেকে ৩ শতাংশ সরবরাহ করে, যার মধ্যে হস্তচালিত তাঁতের পণ্য, নকশিকাঁথা, জামদানি, কাঁথা, পাটজাত দ্রব্য অন্যতম।
বিসিকের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি, যার একটি বড় অংশ নারী শ্রমশক্তি।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব, হস্তনির্মিত ও টেকসই পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের কুটিরশিল্প এসব বৈশিষ্ট্যের সমাহার ধারণ করে। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ‘হ্যান্ডমেড’ পণ্যের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষত জামদানি, মসলিন ও তাঁতের শাড়ি এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পে স্থান করে নিয়েছে। নকশিকাঁথা, পাটের ব্যাগ, হোম-ডেকোর আইটেম পশ্চিমা দেশের উচ্চবিত্ত বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মৃৎশিল্প ও বাঁশ-বেতের সামগ্রী ইকো-ফ্রেন্ডলি লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট হিসেবে রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, হস্তশিল্প খাত থেকে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে শুধু রপ্তানি বাজার থেকেই, যদি সঠিক বিপণন, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিকীকরণ নিশ্চিত করা যায়।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারও কুটিরশিল্পের জন্য বিশাল সম্ভাবনাময়। শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ, উৎসব-পার্বণে হস্তনির্মিত পণ্যের চাহিদা, এসব কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারেও কুটিরশিল্পের পণ্যের বিক্রি ব্যাপক হারে বাড়ছে। ঈদ, পূজা, বিবাহ মৌসুমে হস্তশিল্পের বিক্রি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা এই খাতের অর্থনৈতিক গতিশীলতারই প্রমাণ।
কুটিরশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ৭০ শতাংশ। এটি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিচ্ছে, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করছে এবং সামাজিক মর্যাদা উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী বাড়িতে বসেই নিজেদের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র বদলে দিচ্ছে এবং টেকসই উন্নয়নের পথকে সুগম করছে। বাঙালি নারী তার মেধা-মনন ও প্রতিভার সমন্বয় ঘটিয়ে কুটিরশিল্পে সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়েছে।
পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে কুটিরশিল্পের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশের হস্তশিল্প সংগ্রহ করতে চান। সিল্ক, শাড়ি, টেরাকোটা, বাঁশের কাজ, এসব পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্যুভেনির। যদি দেশের পর্যটন স্পট, ফাইভ স্টার হোটেল, বিমানবন্দরে কুটিরশিল্পের প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, তবে এটি পর্যটন ও হস্তশিল্প, উভয় খাতেরই বিকাশ ঘটাবে এবং অর্থনৈতিক যোগসূত্র আরও শক্তিশালী করবে।
কুটিরশিল্পের উন্নয়নে দেশের বিভিন্ন মাইক্রোক্রেডিট সংস্থার অবদান উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএস, ব্যুরো বাংলাদেশ ও অন্যান্য সংস্থা ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে লক্ষাধিক কুটিরশিল্পী, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথ দেখিয়েছে। শুধু মূলধনই নয়, এসব সংস্থা প্রায়ই ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, পণ্য বিপণনে পরামর্শ ও নেটওয়ার্কিং সুযোগ দিয়ে থাকে। মাইক্রোক্রেডিটের সহজলভ্যতা গ্রামীণ নারীদের বাড়ির আঙিনায় ছোট কারখানা গড়ে তুলতে, কাঁচামাল কেনার সামর্থ্য অর্জনে ও সঞ্চয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এই খাতের সম্পূর্ণ বিকাশে বাধা দিচ্ছে। এর মধ্যে মূলধন ও অর্থায়নের সংকট অন্যতম। বেশির ভাগ কারিগর বাণিজ্যিক ব্যাংক হতে ঋণ পেতে ব্যর্থ হন। উচ্চ সুদহার ও জটিল প্রক্রিয়া তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে উৎপাদনশীলতা কম, খরচ বেশি এবং উৎপাদন পরিমাণ সীমিত থাকে। অধিকাংশ কারিগর সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভের একটা বড় অংশ নিয়ে নেয়, ফলে কারিগরেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার বুঝে ডিজাইন আপডেট না হওয়ায় প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কমে যায়। রপ্তানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স, শুল্ক, সনদ, লজিস্টিক, এসব বিষয়ে জ্ঞানের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ পিছিয়ে পড়ে।
কুটিরশিল্পকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তর করতে কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কুটিরশিল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে বিশেষ ঋণ স্কিম চালু করা, কম সুদে ঋণ প্রদান এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরদের আধুনিক টুলস ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল ডিজাইন, রং ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরদের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং রকমারি, দারাজের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে সহায়তা দিতে হবে। এখানে প্রযুক্তি তাদের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করছে। অনেকেই প্রযুক্তির এসব মাধ্যমকে ব্যবহার করে বিদেশেও নিজেদের পণ্য বিক্রির একটি প্লাটফর্ম পেয়েছে। আন্তর্জাতিক হস্তশিল্প মেলায় বাংলাদেশি পণ্যের উপস্থাপনা বৃদ্ধি করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিসিককে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জামদানি, নকশিকাঁথার মতো পণ্যে জিআই সনদ পেতে উদ্যোগ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়বে। রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, টাঙ্গাইলের মতো ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে কুটিরশিল্প ক্লাস্টার তৈরি করে সমন্বিত উৎপাদন, ডিজাইন সেন্টার এবং বিপণন ইউনিট গড়ে তুললে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে। সর্বোপরি, তরুণ প্রজন্মকে কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের নতুন ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং জ্ঞান এই খাতকে নতুন গতি দান করতে পারে এবং প্রজন্মান্তরে এই ঐতিহ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারে।
কুটিরশিল্প শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এটি গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড, নারীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার, এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামাজিক সচেতনতা, এই চার স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে আমরা কুটিরশিল্পকে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও লাভজনক অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তরিত করতে পারি।
আমরা যদি এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দিই, বিনিয়োগ করি এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করি, তবে কুটিরশিল্প শুধু বাংলাদেশের গর্বই থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ইঞ্জিন।
লেখক: মাহমুদুল হাসান, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার, অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]