ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান: লোকদেখানো তৎপরতা, নাকি সমস্যার সমাধান

পুড়িয়ে দেওয়া গাড়িছবি: সাজিদ হোসেন

রাজধানীর মিরপুর-১০ আইডিয়াল স্কুলের সামনে নিয়মিত হকার উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা এখন সংবাদ শিরোনাম। আর কোনো ঘটনা যখন সংবাদ শিরোনাম হয়, তখন সেটি শুধু সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকে না; চায়ের আড্ডা থেকে অফিসের টেবিল, রিকশার সিট থেকে রাস্তার পাশের দোকান—সবখানেই শুরু হয়ে যায় আলোচনা, বিশ্লেষণ ও তর্কবিতর্ক।

কেউ বলবেন, ‘আগুন দিয়েছে ঠিকই করেছে। গরিব মানুষের পেটে লাথি দিতে আসছে কেন?’ কেউ বলবেন, ‘ফুটপাত কি ব্যবসা করার জায়গা?’ আবার কেউ প্রশ্ন তুলবেন, ‘সারা দেশে এত চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটপাট চলছে—সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু ফুটপাতের হকার উচ্ছেদেই এত তৎপরতা কেন?’ অন্যদিকে কেউ হয়তো বলবেন, ‘যে কারণই থাকুক, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ আবার কেউ বলবেন, ‘এ ধরনের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপকর্ম উৎসাহিত হতে পারে।’

সবাই যার যার জায়গা থেকে কথা বলবেন। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, একটি ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন দিক থাকে, আর প্রত্যেক মানুষ তার নিজের অভিজ্ঞতা, অবস্থান ও উপলব্ধি থেকে সেটিকে বিচার করেন।

আমিও একজন সাধারণ মানুষ। তাই এ বিষয়ে আমারও কিছু কথা আছে।

প্রথমেই পরিষ্কার করে বলতে চাই—কোনো ধরনের অন্যায়, বিশৃঙ্খলা কিংবা সহিংসতার পক্ষে আমি নই। অন্যায় যে-ই করুক, অন্যায়ই। ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। অপরাধের বিচার হওয়া উচিত—এ নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার—এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন?

শুধু গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। যে অভিযানকে কেন্দ্র করে এত বড় উত্তেজনা তৈরি হলো, সেই অভিযান পরিচালনার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, সমন্বয় ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আর এখানেই আসল প্রশ্নটি আসে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অভিযান হয়, সমস্যা থেকে যায়—

ফুটপাত দখলমুক্ত করা, হকার উচ্ছেদ করা কিংবা অবৈধ স্থাপনা সরানো—এসবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়, জনগণের চলাচলের জায়গা জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।

কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের দেশে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান অনেক সময় এমন এক চক্রে পরিণত হয়েছে, যার শুরু আছে, শেষ নেই।

সকালবেলা অভিযান শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামনে এগিয়ে যান। ফুটপাত খালি হয়। কিছু মালামাল জব্দ হয়, কিছু স্থাপনা সরানো হয়। ক্যামেরায় ছবি আসে, সংবাদ হয়। তারপর অভিযান শেষ।

কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেক জায়গায় আবার সেই একই চিত্র ফিরে আসে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—আমরা কি ফুটপাত দখলমুক্ত করছি, নাকি শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য ফুটপাত খালি করছি?

যদি একই জায়গা বারবার দখল হয়, একই জায়গায় বারবার অভিযান চালাতে হয়, তাহলে সমস্যাটি আসলে কোথায়—হকারের কাছে, নাকি ব্যবস্থাপনার কাঠামোর মধ্যে?

হকার একজন মানুষ। তার জীবিকার প্রয়োজন আছে। কিন্তু তার জীবিকার দায় জনগণের চলাচলের অধিকার কেড়ে নিয়ে মেটানোও যায় না। আবার শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, একজন হকারকে সরিয়ে দিলেই যদি পরদিন আরেকজন এসে একই জায়গা দখল করে, তাহলে বোঝা যায়—সমস্যাটি শুধু হকারের নয়; এর পেছনে আরও বড় কোনো ব্যবস্থা কাজ করছে।

হকার আসে কোথা থেকে, দখল টিকে থাকে কীভাবে

একজন হকার নিজের ইচ্ছায় ফুটপাত দখল করে বসে গেলেন—বিষয়টি এত সরল কি না, সেটিও ভাবার প্রয়োজন আছে।

যদি ফুটপাত দখল করা বেআইনি হয়, তাহলে বছরের পর বছর একই জায়গায় দখল কীভাবে টিকে থাকে? কে তাদের বসতে দেয়? কারা এর সুবিধা নেয়? কারা নিয়মিত টাকা নেয়? অভিযান এলেই কেন তারা আগেভাগে খবর পায়? আর অভিযান শেষ হওয়ার পর কীভাবে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে না বের করলে যত অভিযানই হোক, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের মনে এমন প্রশ্নও জন্ম নিতে পারে—অভিযান কি সত্যিই দখলমুক্ত করার জন্য, নাকি শুধু দখলদার পরিবর্তনের জন্য?

প্রশ্নটি হয়তো কঠিন। কিন্তু প্রশ্নটি উঠছে—এটিই বাস্তবতা।

বনানীর ২৬ বছরের অভিজ্ঞতা—

আমি গত ২৬ বছর ধরে বনানী এলাকায় চাকরি করছি। এই দীর্ঘ সময়ে কত শতবার যে হকার উচ্ছেদ অভিযান দেখেছি, তার কোনো হিসাব নেই।

অভিযানের দৃশ্য প্রায় একই রকম।

ম্যাজিস্ট্রেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দলবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। ফুটপাত খালি হচ্ছে। হকাররা সরে যাচ্ছেন। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো—অভিযান পরিচালনাকারী দল যত সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, পেছনের জায়গাগুলো তত দ্রুত আবার দখল হয়ে যাচ্ছে।

এ যেন দখল আর উচ্ছেদের এক অন্তহীন খেলা।

আজ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বনানীর বাণিজ্যিক এলাকার অনেক রাস্তা পর্যন্ত হকারদের দখলে চলে গেছে।

সরকার পরিবর্তন হলে আমরা যারা ওই এলাকায় কাজ করি, তারাও নতুন আশায় বুক বাঁধি—হয়তো এবার কিছু একটা হবে। হয়তো এবার ফুটপাত ও রাস্তাগুলো দখলমুক্ত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশাও বারবার হতাশায় পরিণত হয়েছে।

এক সরকার যায়, আরেক সরকার আসে। কিন্তু ফুটপাতের চিত্র খুব একটা বদলায় না। বরং অনেক সময় শুধু দখলদারের পরিচয় বদলায়—দখল থেকে যায় আগের মতোই।

সমস্যার সমাধান কি শুধু উচ্ছেদ

আমার মনে হয়, এখানে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার।

ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হলে শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই হবে না। একই সঙ্গে দেখতে হবে—হকাররা কোথায় যাবে, তাদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা কী, ফুটপাত পুনর্দখল ঠেকানোর স্থায়ী ব্যবস্থা কী, অবৈধভাবে জায়গা বরাদ্দ বা দখলের সঙ্গে কেউ জড়িত কি না এবং অভিযান পরিচালনার পর সেই জায়গার দায়িত্ব কার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযানকে উৎসব না বানিয়ে ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে।

একদিন অভিযান চালিয়ে সংবাদ শিরোনাম হওয়া সহজ; কিন্তু একটি ফুটপাত বছরের পর বছর দখলমুক্ত রাখা কঠিন। আর রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।

কারণ, ফুটপাত খালি করার চেয়ে ফুটপাত খালি রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

মিরপুর-১০-এর ঘটনার বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। যারা গাড়িতে আগুন দিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে যে পরিস্থিতি থেকে এমন ঘটনা জন্ম নিল, সেই পরিস্থিতির কারণও খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

কারণ শুধু আগুন নেভালে আগুনের কারণ দূর হয় না।

ফুটপাত দখলমুক্ত করার নামে যদি বছরের পর বছর একই নাটকের পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসবেই—এত অভিযান, এত উচ্ছেদ, এত লোকবল, এত ব্যয়—তারপরও সমস্যার সমাধান কোথায়?

আমরা কি সত্যিই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চাই, নাকি শুধু মাঝে মাঝে ফুটপাত খালি দেখাতে চাই?

আর যদি সত্যিই দখলমুক্ত করতে চাই, তাহলে হকারকে সরানোর পাশাপাশি দখলদারত্বের পুরো ব্যবস্থাটাকেই সরাতে হবে।

নইলে অভিযান চলবে, ছবি উঠবে, সংবাদ হবে, আলোচনা হবে—তারপর সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে।

ফুটপাত দখলমুক্ত হবে, আবার দখল হবে।

অভিযান হবে, আবার অভিযান হবে।

শুধু সমস্যাটাই থেকে যাবে—আগের মতোই।

*লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি ও লেখক