এক মেসিকে হেয় করে আপনাদের কী সুখ?
লিওনেল মেসি ৩৯ বছর বয়সে এসে খেলেছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। যে বয়সে অধিকাংশ কিংবদন্তি ফুটবলার অবসর নেন, কোচিংয়ে চলে যান কিংবা মাঠের বাইরে নতুন জীবনে অভ্যস্ত হন, সেই বয়সেই তিনি দেশের অধিনায়ক হিসেবে দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় হিসেবে সিলভার বল, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা (অ্যাসিস্টসহ) হিসেবে সিলভার বুট জিতেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হয়েছে, পেয়েছে সম্মানসূচক রৌপ্যপদক এবং ৪০৬ কোটি টাকার মতো বিপুল অঙ্কের প্রাইজমানি। বিশ্বকাপ না জিতলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যামাত্র।
চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবার বিশ্বকাপ জিতে ৬১৫ কোটি টাকা, গোল্ডেন বল, গোল্ডেন গ্লাভস, বেস্ট ইয়াং প্লেয়ারসহ নানা সম্মান পেয়েছে। ২০২২ সালে ঠিক একইভাবে এই সব গৌরব অর্জন করেছিল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা; অর্থাৎ ফুটবলের নিয়মে একবার একজন জেতে, আরেকবার অন্যজন। এটাই খেলাধুলার সৌন্দর্য।
তবু অবাক লাগে, ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারকে ঘিরে কিছু মানুষের উল্লাস দেখে। যেন তাদের আনন্দের একমাত্র উৎস মেসির পরাজয়। অথচ প্রশ্ন হলো, এই বিশ্বকাপে মেসি আর কী পাননি? বিশ্বকাপ শিরোপা ছাড়া প্রায় সবকিছুই তো তাঁর ঝুলিতে এসেছে। আর সত্যি বলতে, তাঁর ক্যারিয়ারে এই বিশ্বকাপ ছিল একরকম বোনাস অধ্যায়। না খেললেও তাঁর কিংবদন্তি মর্যাদার কিছুই কমত না। কিন্তু তিনি খেলেছেন, দেশকে ফাইনালে তুলেছেন, এক মাস ধরে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীকে মুগ্ধ রেখেছেন। আর্জেন্টিনা তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এক দিনের জাতীয় ছুটিও ঘোষণা করেছে।
মেসির ক্যারিয়ারের দিকে তাকান। বার্সেলোনার হয়ে ৩৫টি শিরোপা, পিএসজির হয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ দুই শিরোপা, ইন্টার মায়ামির হয়ে সাফল্য, আর্জেন্টিনার হয়ে দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি বিশ্বকাপ, রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর, পেশাদার ক্যারিয়ারে ৯০০-এরও বেশি গোল—ফুটবলে এমন কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় অর্জন নেই, যা তাঁর ঝুলিতে নেই।
মাঠের বাইরেও তিনি একজন পারিবারিকভাবে সুখী মানুষ, শৈশবের ভালোবাসার মানুষ আন্তোনেলা রোকোজ্জোকেই জীবনসঙ্গী করেছেন, তিন ছেলেসন্তানের জনক হয়েছেন। দ্বিতীয় কোনো বান্ধবীর খবর পাপারাজ্জিরা এখনো দিতে পারেনি। ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে শিশুদের জন্য কাজ করছেন, গাজায় গিয়ে শিশুদের নিরাপত্তায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং মানবিক উদ্যোগে নিয়মিত অবদান রেখে চলেছেন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তাই কাউকে ছোট করে নিজের আনন্দ খোঁজার মানসিকতা আসলে ফুটবলপ্রেম নয়। এটি ব্যক্তিবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। আমরা তো পৃথিবীর সব সৌন্দর্যের অনুরাগী। পেলের ফুটবল যেমন আমাদের মুগ্ধ করে, তেমনি ম্যারাডোনা, রোনালদিনহো, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, এমবাপ্পে, ইয়ামাল কিংবা লিওনেল মেসিও করেন। একজনের প্রশংসা করতে গিয়ে আরেকজনকে অপমান করার প্রয়োজন তো দেখি না।
কিন্তু আর্জেন্টিনার হার নিয়ে কিছু মানুষের যে উল্লাস দেখি, তা কখনো কখনো এমন মনে হয়, যেন একজন অক্ষম মানুষ, যে নিজের সংসার টিকিয়ে রাখতে পারেনি, সে তার সাবেক স্ত্রীর দ্বিতীয় সংসার ভেঙে যেতে দেখে অদ্ভুত এক বিকৃত আনন্দ অনুভব করছে।
খেলাকে খেলা হিসেবে উপভোগ করুন। কিংবদন্তিদের সম্মান করতে শিখুন। কারণ, ট্রফি জেতা-হারার ঊর্ধ্বে উঠে যাঁরা যুগকে সংজ্ঞায়িত করেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই মনে রাখে।
লেখক: সাংবাদিক
২০ জুলাই ২০২৬