অসমাপ্ত নকশিকাঁথা
সন্ধ্যার একটু পর অফিস থেকে বের হয়ে সবুজ যখন নতুনবাজার মোড়ে এল, তখনই তার এক কলিগ নাজমুল হোসেন বললেন, ‘সবুজ ভাই, নেটে দেখলাম, রাস্তায় অনেক যানজট, কী সব জানি আন্দোলন চলছে। চলুন, দুজনে গুলশান লেকে গিয়ে বসে আজ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে পরে বাসায় যাই। এর মধ্যে রাস্তার যানজট আর ঝামেলাও হয়তো শেষ হয়ে যাবে।’ কিন্তু সারা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত লাগায় সবুজের ইচ্ছা হচ্ছিল না, তাই সে বলল, ‘নাজমুল ভাই, আজ ভালো লাগছে না, অন্য আরেক দিন বসে আড্ডা দিবনে।’ উনার থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুতই সে বাসে উঠেছিল। কিন্তু বাসে ওঠার কিছু সময় পর শুনতে পেল, রাস্তা বন্ধ, বাস আর যাবে না। যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছেন বাসচালকের সহকারী (হেলপার)। সবুজের তখন মাথায় হাত। কারণ, তার মেস উত্তরায়। কুড়িল বিশ্বরোডও তখন যাইনি বাস, তাহলে সে উত্তরা যাবে কীভাবে?
সেদিন রাস্তার যানজটের কারণ ছিল ছাত্র আন্দোলন। দেশে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে, এর মধ্যে আবার বর্ষাকাল হওয়ায় অনেক জায়গায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়ে গেল। এসবের মধ্যেইও পরীক্ষা চলছে। নির্দিষ্ট কিছু জেলায় নির্দিষ্ট তারিখের কিছু পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র নাকি কঠিন হচ্ছে। এ জন্য বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলে শিক্ষার্থীরা রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করছিল। উত্তরার প্রবেশপথ বন্ধ। ভেঙে ভেঙে অনেক যানবাহনে চড়ে আর অলিগলি ঘুরে ঘুরে তারপর মেসে গিয়েছিল সেদিন সবুজ।
যখন মেসে গেল, রাত প্রায় ৯টা বেজে গিয়েছিল। বড্ড ক্লান্ত থাকায় রুমে গিয়েই কখন যে বিছানায় বসতে গিয়ে শুয়ে গেল আর ঘুমিয়ে পড়ল, বুঝতেই পারিনি সে। হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভেঙেছিল সবুজের, ঘুম ঘুম চোখে কল রিসিভ করেছিল। দেখল, অচেনা নাম্বার। মোবাইলের বিপরীত পাশ থেকে একজন তরুণী কণ্ঠ ভেসে আসছিল, ‘হ্যালো, আপনি কি সবুজ ভাই বলছেন?’ প্রত্যুত্তরে সে হ্যাঁ বলল। তারপর মেয়েটি বলল, ‘আপনি আমায় চিনবেন না, আমি সুমি, আমার মায়ের নাম কুসুম আক্তার। আপনি তাকে কাঁথা আন্টি বলে ডাকতেন। আম্মার থেকেই আমি আপনার নাম্বারটা পেয়েছি।’ ফর্মালিটি রক্ষা করতে সবুজ বলল, ‘ও আচ্ছা, চিনতে পারছি, আপনি কাঁথা আন্টির মেয়ে। আন্টি কেমন আছেন? মেয়েটি প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল, তারপর প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলল, ‘আপনি কি আমাদের বাসায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আসতে পারবেন, একটু দরকার ছিল আপনার সাথে।’
সবুজের সঙ্গে কাঁথা আন্টির মেয়ের কী দরকার থাকতে পারে, তা সে বুঝতে পারছিল না। তখন তার মোটামুটি ঘুম ভেঙে গেছে। তবু মনে করতে কিছুটা সময় লাগল কাঁথা আন্টিকে। আগে যখন নিয়মিত সকালে হাঁটতে যেত সবুজ, তখনই আন্টির সঙ্গে তার পরিচয়, নরসিংদী থেকে ঢাকা চাকরির জন্য আসার আগে কোনো এক কারণে মোবাইল নম্বরটা দিয়ে এসেছিল সবুজ। মাস ছয়েক হয়ে গেল, সে–ও তেমন নরসিংদী যায় না, আবার গেলেও তেমন সকালে হাঁটতে বের হয় না। তাই সেদিকে যাওয়া হয় না। কাঁথা আন্টির কথা ভুলেই গিয়েছিল সবুজ।
সবুজ যখন এসব মনে করছিল, তখন মোবাইলের ওপাশে মেয়েটি বলে যাচ্ছিল, ‘হ্যালো, ভাইয়া, আপনি শুনতে পারছেন? হ্যালো, হ্যালো।’ সবুজ স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি শুনতে পারছি। আজ তো মঙ্গলবার, কাল বাদে পরশু বৃহস্পতিবার, সেদিন রাতে আমি বাড়ি যাব। শুক্রবার সকালে হাঁটতে গিয়ে আমি আন্টির সঙ্গে দেখা করে আসব।’ মেয়েটি বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে ভাইয়া।’ আর কিছু না বলে কলটা কেটে দিয়েছিল মেয়েটি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
বৃহস্পতিবার রাতে নরসিংদী বাড়িতে গিয়ে পরদিন শুক্রবার সকালে সবুজ হাঁটতে বের হলো। বাড়ি থেকে বের হয়ে বড় বাজার ব্রিজ হতে থানার ঘাট বেড়িবাঁধের রাস্তা দিয়ে সাধারণত সে হাঁটাহাঁটি করে। এই হাঁটা শেষ হয় নতুন লঞ্চঘাট ও বাউলঘাটের পর একটা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের রাস্তায় গিয়ে। এরপর ফিরতি পথে নতুন লঞ্চঘাট বরাবর মেইন রোডে হাঁটবে। কয়েকটা গ্যারেজ রয়েছে সে রাস্তায়, সেগুলোর পর একটা হলুদ রঙের গেট, সেটাই সবুজের কাঁথা আন্টির বাড়ি। হাঁটতে হাঁটতে আন্টির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার ও মাঝেমধ্যে সে যে গিয়ে দেখা করত, কথা বলত, সেসব স্মৃতি মনে পড়তে লাগল তার।
বছরখানেক আগের কথা, একদিন সকালে হাঁটতে বের হওয়ার পর হঠাৎ জল তৃষ্ণা পেয়েছিল সবুজের। এত সকালে দোকানপাট একটাও খোলেনি, কাছাকাছি কোথাও চাপকলও দেখতে পেল না সে। তারও সচরাচর এমন হয় না, সেদিন কেন এমন হলো, কে জানে। অনেক ক্ষণ হাঁটার পর যখন আর পারছিল না, তখন রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া একটা হলুদ রঙের গেট দেখতে পেল সবুজ। গেটটা খোলাই ছিল এবং দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল, কোন এক মধ্যবয়স্ক মহিলা বসে কিছু করছেন। উনাকে সবুজ এদিকে হাঁটতে গিয়ে প্রায়ই দেখত সকালবেলা উঠানে বসে কাপড় নিয়ে কিছু একটা সেলাই করেন। মাঝেমধ্যে কৌতূহল হতো তার, সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে, কথা বলতে ইচ্ছা হতো। কিন্তু উনি কি ভাববেন, এসব ভেবে ভেবে আর কথা বলা হয়নি। কিন্তু আজ তার প্রয়োজন, জলের পিপাসাও অনেক পেয়েছে। তাই লজ্জা, ভয়, কৌতূহল সব বাদ দিয়ে গেট দিয়ে প্রবেশ করে উঠানে গেল সবুজ। সে সামনে গিয়ে উনাকে সালাম দিল, তারপর বলল, ‘আন্টি আমার খুব জল তৃষ্ণা পেয়েছে, এক গ্লাস জল খাওয়াবেন।’
সবুজ একটা বিষয় দেখে অবাক হলো। তা হলো সে যে অপরিচিত একজন মানুষ, সে কে, নাম কী, হঠাৎ করে কিছু না বলে গেট দিয়ে কেন এল ইত্যাদি কোনো প্রশ্ন না করেই উনি যে মোড়ায় বসে সেলাই করছিলেন, সেটা থেকে উঠে সে মোড়াটা সবুজের দিকে দিয়ে বললেন, ‘তুমি এটাতে বসো বাবা, আমি ঘর থ্যাইক্কা পানি নিয়া আইতাসি।’ সবুজ সেখানে বসল, তারপর সে দেখল, তিনি একটা নকশিকাঁথা সেলাই করছিলেন শীতলপাটিতে রেখে। সাদা রঙের কাপড়ের মধ্যে লাল, হলুদ, সবুজ, নীলসহ বিভিন্ন নকশায় নানা রঙের সুতার কাজ। কাঁথাটা ধরে দেখছিল সবুজ আগ্রহ নিয়ে, এর মধ্যে মহিলাটি তাড়াতাড়িই ফিরে এ একটা কাচের গ্লাসে জল নিয়ে। সবুজ জল খেল। এক গ্লাস খাওয়ার পর সে আবার আরেক গ্লাস জল চেয়ে খেল। এরপর মহিলাটি ঘর থেকে প্লেটে করে বিস্কুট এনে দিলেন আর জোর করে খাওয়ালেন সবুজকে। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল সেদিন উনার সঙ্গে তার।
এর পর থেকে প্রায়ই যেত সবুজ সেই মহিলার সঙ্গে দেখা করতে, তাকে কাঁথা আন্টি বলে সম্বোধন করত সে। নকশিকাঁথা সেলাই করা নিয়ে একদিন সে উনাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা আন্টি, এত কিছু থাকতে আপনি নকশিকাঁথা সেলাই করেন কেন?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আব্বাজান, ছোট্টবেলা নানির কাছ থেকে এই কাঁথা সেলাই করা শিখেছিলাম। তার পর থেকে প্রায়ই ঘরের প্রয়োজনে কাঁথা সেলাই করেছি। ফুল, ফল, গাছ, পাখি ইত্যাদি নকশা করতে ভালো লাগত। সে নকশায় সুতা দিয়ে প্লেইন, চেইন, সাবুদানা, ভরাটসহ বিভিন্ন রকমভাবে সেলাই করে আনন্দ পেতাম। তাই এই কাজ সব সময় ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে করি। আর এখন তো আমার তেমন কোনো কাজ থাকে না সংসারের, ছেলে–মেয়ে বাড়িতে থাকে না, তোমার আঙ্কেল দিনের বেশির ভাগ সময় থাকেন অফিসে, তাই সময় পেলেই কাঁথা সেলাই করতে বসে যাই।’
সবুজ অবাক হয়ে তার কাঁথা আন্টির কথা শুনত আর মনে কোনো প্রশ্ন জাগলে সেটা করত। আরেক দিন সবুজ প্রশ্ন করল, ‘কাঁথা আন্টি, আপনি কি শুধু সকালবেলাই সেলাই করেন? অন্য সময় কি সেলাই করেন না?
উত্তরে কুসুম আক্তার বলেছিলেন, ‘ভোরবেলা তেমন কেউ ওঠে না বাবা, চারদিকে শব্দ কম হয়। তাই সক্কাল সক্কাল উঠে ঠান্ডা মেজাজে এই কাঁথা সেলাই করি। এ ছাড়া বয়স হচ্ছে, চোখের জ্যোতিও কমে যাচ্ছে, তাই বেশির ভাগ সময় দিনের বেলাই সেলাইকাজ করি। সন্ধ্যারাতে সেলাই করতে গেলে চোখ ব্যথা করে আর সুইয়ে সুতা লাগাতেও সময় লাগে।
সবুজ প্রশ্ন করত, ‘আপনি কি শুধু নিজের জন্যই সেলাই করেন, নাকি অন্যদেরও করে দেন?’ জবাবে তার কাঁথা আন্টি বলেছিল, ‘কী যে কও বাবা, জীবনটা কি শুধু নিজের একার, যে শুধু নিজের জন্য সেলাই করমু। ছেলে–মেয়ের জন্য কত কাঁথা সেলাই করেছি। ভাই, বোন, ভাবি, চাচিদেরকেও সেলাই করে দিয়েছি। এমনকি পছন্দের মানুষদের কত উপহার দিয়েছি, মাঝেমধ্যে কয়েকটা বিক্রিও করেছি। তোমাগো চাচায় তো এসব পছন্দ করে না, তাই যতটা পারি তারে লুকাইয়া সেলাই করি। তোমার চাচায় কয়, “আমাগো কি টাকার অভাব যে তুমি এই বয়সে কাঁথা সেলাই করো, আবার বেচো।” কিন্তু সে তো এটা বোঝে না, আমার সেলাই করতে কত ভালো লাগে, তাই করি।’
এভাবেই সকালে হাঁটতে গিয়ে সবুজ মাঝেমধ্যে তার কাঁথা আন্টির সঙ্গে আলাপ করত। মহিলাটি সরল মনে অনেক কথা বলতে থাকতেন আর সবুজ শান্ত হয়ে সেগুলো শুনে যেত। কথায় কথায় সবুজ জানতে পারল, কাঁথা আন্টির স্বামী জুবায়ের আহমেদ একজন সরকারি কর্মকর্তা, সোনালী ব্যাংকে জব করেন, কয়েক বছরের মধ্যে রিটায়ার্ড করবেন। এক ছেলে ও মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে ঢাকা ও খুলনা থাকে, মাঝেমধ্যে বাড়ি আসে। বাড়িতে একটা ভাড়াটেও আছে। সকালবেলার জলের তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে সবুজ যে এমন আপনমনা একজন কাঁথা আন্টি পেয়ে যাবে, তা সে কখনো ভাবেনি। মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মার সম্পর্ক হয়তো এমন করেই হয়। কখন কোথায় কীভাবে আর কোন পরিস্থিতিতে যে কার সঙ্গে কার সুসম্পর্ক তৈরি হয়, তা কখনো আগে থেকে আন্দাজ করে বোঝা যায় না।
একবার এক সকালে এই কাঁথা আন্টি তাকে একটা লাল রঙের কাঁথা দেখিয়ে বলেছিল, ‘এই কাঁথাডা আমি তোমারে দিমু বাপজান। তোমার কথা চিন্তা করেই আমি এই কাঁথাডা সেলাই করছি। সেলাই শ্যাষ হলেই তোমারে আমি জানামু, তোমার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে যাইয়ো তো।’ সবুজও সেদিন মোবাইল নাম্বার দেওয়ার আগে বলেছিল, ‘তাহলে আপনাকেও তো আমার কিছু দিতে হবে আন্টি। কী দিমু, কন তো আন্টি?’
কাঁথা আন্টি হেসে হেসে বলেছিল, ‘তোমার কিছু দেওয়া লাগবে না বাবা। তুমি বেকার মানুষ, চাকরিবাকরি করে বিয়া করো। আমি তোমার বিয়েতে যামু।’ সবুজ বলেছিল, ‘তা বললে তো হয় না কাঁথা আন্টি। আমি আপনারে আপনার পছন্দের রঙের একটা শাড়ি দিতে চাই। আপনাকে সেটা নিতেই হবে। তা আন্টি, আপনার প্রিয় রং কী, বলুন তো?’ তখন কুসুম আক্তার হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে বাবা। তাহলে আমারে একটা বেগুনি রঙের শাড়ি দিওয়ো। আমার অনেক প্রিয় রং এটা।’
যেদিন সবুজ তার মোবাইল নাম্বারটা কাঁথা আন্টিকে দিয়েছিল, তার মাসখানেক পর সে নরসিংদী থেকে ঢাকা চলে যায় প্রাইভেট একটা কোম্পানিতে চাকরি হওয়ার কারণে। এর মধ্যে বাড়ি গেলেও হাঁটার জন্য ওই দিকে আর তেমন যেত না সে। আজ অনেক দিন পর আন্টির সঙ্গে দেখা হবে তার। মন খুলে বিন্দাস কথা হবে, ভাবতেই ভালো লাগছিল সবুজের। আন্টির জন্য পছন্দ করে বেগুনি রঙের একটা শাড়িও কিনেছিল সে গত মাসে। সেটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।
নতুন লঞ্চঘাট পর্যন্ত গিয়ে কেন জানি আর সামনে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না সবুজের। বাঁয়ো মোড় দিয়ে মেইন রোডে হাঁটতে লাগল সে। কিছুদূর যাওয়ার পর কাঁথা আন্টিদের হলুদ গেটটা দেখতে পেল সবুজ। এগিয়ে গিয়ে গেটটা বন্ধ থাকায় বেশ কয়েকবার জোরে হাত দিয়ে বাড়ি দিল আর আন্টি আন্টি বলে ডাক দিল। বোঝা যাচ্ছে, ভোরে হয়তো তেমন কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। কিন্তু সবুজ জানে, তার কাঁথা আন্টি নিয়মিত ভোরে উঠে কাঁথা সেলাই করতে বসে আর গেটও খোলা থাকে। খুব বেশি অসুস্থ কিংবা সমস্যা না থাকলে তার কাঁথা আন্টি অভ্যাসমতো কাঁথা নিয়ে বসে প্রতি ভোরে। সবুজ মনে মনে ভাবল, আন্টির কি কিছু হয়েছে? তিনি কি অসুস্থ? এর জন্য কি তার মেয়ে সবুজকে আসতে বলেছে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
বার কয়েক গেটে ডাকাডাকির পর প্রায় মিনিট দশেক পর একজন এসে গেট খুলল। তরুণ বয়সের একটা মেয়ে, বয়স ১৮–২০ হবে। তাকে সবুজ নিজের পরিচয় দিল। মেয়েটি বলল, ‘আপনি ভেতরে আসুন।’ তারপর একটা ঘর দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসুন, আমি আসতাছি।’ সবুজ ঘরে গিয়ে সোফায় বসল। সে ঘরের দেয়ালে টানানো তার কাঁথা আন্টি, আংকেল ও তাদের দুই ছেলে–মেয়ের একসঙ্গে ছবি দেখল অনেকগুলো। এ ছাড়া নকশীকাঁথায় সেলাই করা একটা ওয়ালমার্টও দেখল আর ভাবল, নিশ্চয়ই এটা আন্টি করেছেন। বাইরে লোকজন উঠে হাঁটাহাঁটি করছে উঠানে, হয়তো বাড়ির ভাড়াটে হবে কিংবা অন্য কেউ। কিন্তু সবুজের কাছে কেমন জানি নীরবতায় আচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল বাড়িটার পরিবেশ। সে ভাবল, সকালবেলা বলে হয়তো চুপচাপ। কিন্তু কাঁথা আন্টির দেখা না পেয়ে সে কিছুটা অবাক হলো। সবুজ এসেছে, ডাক দিয়েছে আর তার কাঁথা আন্টি এখনো বের হলো না, এমন তো হয় না। আগে যখন গেট বন্ধ থাকত, সকালে এসে সবুজ গেটে এসে ডাকাডাকি করলে তার আন্টি দ্রুত দৌড়ে এসে গেট খুলে দিত। কিন্তু আজ এত দেরি করছে কেন, সেটা সে বুঝতে পারছিল না।
এর মধ্যে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এসে ট্রেতে করে এক গ্লাস জল, প্লেটে কয়েকটা বিস্কুট আর এক কাপ চা দিয়ে গেলেন। সবুজ উনাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাঁথা আন্টি কোথায়? উনি কি ঘুম থেকে ওঠেননি?’
প্রশ্নগুলো শুনে মহিলাটি কিছু বলছে না দেখে সবুজ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আন্টি কি অসুস্থ, কিছু হয়েছে উনার?’ এই প্রশ্নগুলো শুনেও মহিলাটি চুপ করে রইল আর উনার চেহারায় একটা বিষণ্নতার ছাপ পড়ল। সবুজের মনে হচ্ছিল, তার কথাগুলো শুনে মহিলাটি হয়তো কিছুটা অবাক হয়েছেন। কিন্তু সে তো সাধারণ প্রশ্ন করল। মহিলাটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনি বসেন, আফামনি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসতাছে,’ বলেই মহিলাটি চলে গেলেন।
সবুজের অস্বস্তি লাগা শুরু করল। কারণ, কাঁথা আন্টির সঙ্গে সে অনেকবার গেটে এসে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। কখনো কোনো ঘরে প্রবেশ করেনি। আন্টি যদিও ঘরে যেতে জোর করতেন, কিন্তু সবুজ এটা–সেটা অজুহাত, ব্যস্ততা, কাজ আছে ইত্যাদি বলে এড়িয়ে যেত। সামনে রাখা জলের গ্লাসটা নিয়ে সে জল খেল।
কিছু সময় পর মেয়েটি এল। সোফায় কিছুটা দূরত্বে বসল। মেয়েটির হাতে একটা শপিং ব্যাগ। সে শপিং ব্যাগটা সোফায় রাখল। তারপর বলল, ‘আমার নামই সুমি, আমিই আপনাকে কল দিয়েছিলাম। আপনি ভালো আছেন?’ ‘জি, ভালো আছি’, বলে সবুজ উত্তর দিল আর সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কেমন আছেন আর কাঁথা আন্টি কোথায়? আমি আপনাদের বাড়িতে এলাম আর আন্টি এখনো ঘর থেকে বের হলেন না, এমনটা তো হয় না কখনো। আন্টি কি অসুস্থ? তাহলে আমাকেই উনার ঘরে নিয়ে চলুন।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে সে দম নিল।
মেয়েটি তবু কিছু না বলে চুপ করে বসে রইল। মেয়েটির চোখজোড়ায় অল্প জল আসছে বলে মনে হচ্ছিল সবুজের কাছে। এ দৃশ্য দেখে তার তখন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে দ্রুতস্বরে বলে উঠল, ‘আন্টির কি কিছু হয়েছে? উনি ঠিক আছেন তো?’ মেয়েটি তার চোখের জল মুছে হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা সবুজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা নিন, এটা আপনার জন্য।’ সবুজ ব্যাগটা হাতে নিল। তারপর ব্যাগটায় হাত দিয়ে ভেতরে থাকা কাপড়ের মতো কিছু একটা মনে হওয়ায় সেটা বের করল। দেখল, একটা লাল রঙের নকশিকাঁথা। কাঁথাটা দেখেই সবুজ চিনতে পারল। এটা সেই নকশিকাঁথা, যেটা তার কাঁথা আন্টি বলেছিল তাকে দেবে। মাঝেমধ্যেই যখন সবুজ আসত, তখন তার আন্টি এই কাঁথা তাকে দেখিয়ে বলতেন, ‘এই দেখো বাপজান, কত সুন্দর করে নকশা তুলেছি কাঁথাটায় তোমার জন্য। তুমি কিন্তু কাঁথাটা খুব যত্ন করে রেখো।’ উত্তরে সবুজ বলত, ‘অনেক বড় কাঁথা আর অনেক নকশা দেখছি আন্টি, আপনি কত দিনে এটা সেলাই করবেন? এই বয়সে আমার মতো অচেনা একজন মানুষের জন্য এত কষ্ট করছেন, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না আন্টি, আমার খারাপ লাগে।’ কাঁথা আন্টি বলতেন, ‘কি যে কও না, বাপজান। এখনো কি তুমি আমার অচেনা কেউ আছ। তুমি আমার পোলার মতো। প্রায়ই তো আমারে দেখতে আসো, খোঁজখবর রাখো, সেটাওবা কতজন রাখে আজকাল বাবা।’
নীরবতা ভেঙে মেয়েটি বলল, ‘ভাইজান, কাঁথাটা পুরো খুলে দেখেন আগে।’ সবুজ মেয়েটির কথা শুনে কাঁথাটা খুলল। নকশিকাঁথাটার কোথাও কোথাও এখনো সেলাই হয়নি। সে বলল, ‘আন্টি তো কাঁথাটা সেলাই করা শেষ করেননি। আপনি আমায় এটা দিলেন যে? নাকি দেখালেন শুধু। পরে হয়তো আন্টি শেষ করবে?’
মেয়েটি মাথা নিচু করে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর সে বলল, ‘নকশিকাঁথাটা আর শেষ হবে না ভাইজান। আপনি এই অসমাপ্ত নকশিকাঁথাটাই নিয়া যান। আম্মা আর বেঁচে নেই, কে আর এই কাঁথা সেলাই করবে বলুন।’ বলেই মেয়েটি অঝোরে কাঁদতে লাগল। সবুজ হতবিহ্বল হয়ে গেল কিছু সময়ের জন্য। মনে হচ্ছিল, পায়ের তলা থেকে তার মাটি সরে যাচ্ছে। এটা সে কি শুনছে। আন্টিকে সে দেখতে এল, উনার জন্য উনার পছন্দের রঙের শাড়িও আনল আর উনি বেঁচে নেই! সবুজের কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। সে চুপ করে বসে রইল। এমন কিছু একটা হবে, সেটা সে কল্পনাও করতে পারিনি। সব মানুষের মৃত্যু হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হঠাৎ করে খবরটা পেয়ে সে যেন মেনে নিতে পারছে না।
মেয়েটি তার চোখের জল মুছে সবুজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গত মাসেই আম্মা মারা গেছেন। ভোরবেলা কাঁথা সেলাই করা অবস্থায় স্ট্রোক করেছিলেন। আমরা ভাই–বোন কেউ বাড়ি ছিলাম না। বাবা ঘুম থেকে উঠে আম্মারে দেখার পর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে আম্মা আমাদের ছেড়ে বহুদূর চলে গেছেন।’ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে লাগল মেয়েটি, ‘আম্মা তো অনেকগুলো নকশিকাঁথাই সেলাই করেছিলেন। এর মধ্যে এই কাঁথাটা ধরতে গিয়ে ভেতরে একটা কাগজ পেয়েছিলাম। তাতে আপনার নাম আর মোবাইল নাম্বার ছিল। আম্মার ইদানীং অনেক কিছু মনে থাকত না, তাই লিখে রাখতেন। তেমনই হয়তো লিখে রেখেছিলেন। আর সে কাগজে লেখা ছিল, ‘এই কাঁথাটা শেষ হলে আমি আমার বাপজান সবুজরে দিমু। সে আমারে বেগুনি রঙের একটা শাড়ি দিব কইছে। কাঁথাটা সেলাই করা শেষ হলেই আমি আমার সবুজ বাপজানরে কল দিয়া আইতে কমু।’ ভাঙা ভাঙা বাংলা লেখার কাগজটা সবুজের হাতে দিল মেয়েটি।
সবুজ স্থির হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। কাঁথা আন্টির মেয়ে সুমিকে তার প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হলো, ফোনে কথা বলার সময় আন্টি বেঁচে নেই জেনেও কেন সে তাকে বলল না? এ রকম নানা প্রশ্ন ঘুরছিল তখন সবুজের মাথায়। কিন্তু সবুজ কোনো প্রশ্নই করতে পারিনি। সে মনে মনে ভাবল, ‘মেয়েটি যা ভালো মনে করেছিল, সে তা করেছে। হয়তো সে ভেবেছিল, আন্টি নেই জেনে যদি আমি আর না আসি, আমার জন্য সেলাই করা নকশিকাঁথাটা যদি সে আমাকে না দিতে পারে! হয়তো সে এসব ভেবেই সত্য বলেনি।’ এ নিয়ে সবুজ কোনো প্রশ্ন করল না মেয়েটিকে।
সুমির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোফা থেকে উঠে ঘর থেকে বের হলো সবুজ। গত রাতে অনেক বৃষ্টি হয়েছিল, উঠান ভরে গেছে কামিনী ফুলে, তীব্র গন্ধ বের হচ্ছে। সে দৃশ্য দেখে সবুজের মনে পড়ল আন্টির কথা। তিনি গত বছর এমন বর্ষায় একদিন বলেছিলেন, ‘জানো সবুজ, এই কামিনী ফুল আমার অনেক প্রিয়। গন্ধটা আমার অনেক ভালো লাগে। তোমার আঙ্কেল মেলা থেকে এই গাছ কিনে এনে লাগিয়েছে শুধু আমার জন্য।’
আন্টির জন্য আনা শাড়ির প্যাকেটটা আর সবুজ খুলতে পারেনি। ওভাবেই শাড়ি আর নকশিকাঁথার ব্যাগটা নিয়ে কাঁথা আন্টির বাসা থেকে বের হয়ে গেল সে। আন্টি আর বেঁচে নেই, এ সত্য সে মানতেই পারছে না, ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। দেখা হলে কত জমানো গল্প বলবে বলে মনে মনে ভেবে এসেছিল সবুজ। সেসব চিন্তা এখন অসম্ভব।
গেট থেকে বের হয়ে সোজা রাস্তা ধরে সবুজ হাঁটছে আর ভাবছে, আন্টি চলে গিয়েও তার যত্নভরা হাতে সেলাই করা নকশিকাঁথা দিয়ে গেলেন। অথচ সে তার কাঁথা আন্টিকে উনার প্রিয় বেগুনি রঙের শাড়িটা দিতে পারল না। শাড়িটা দেখার পর উনি কেমন খুশি হতেন, উনার সে হাসিমাখা মুখটা সে দেখতে পারল না। এই কষ্ট নিয়ে আমৃত্যু তাকে বাঁচতে হবে। করপোরেট চাকরি করতে গিয়ে এমন সহজ–সরল মানুষগুলোকে সে একেবারে ভুলে গিয়েছিল। দীর্ঘ বিরতি না দিয়ে, এক মাস পরপরও সে চাইলে হয়তো কাঁথা আন্টির খোঁজ নিতে পারত, তাহলে হয়তো এই আফসোসটা এখন তাকে করতে হতো না। এসব ভাবতেই সবুজ নতুন লঞ্চঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। নতুন লঞ্চ ছাড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাস্তায় অনেক মানুষের চলাচল শুরু হয়েছে। এত সবের ভিড়েও সবুজ তার কাঁথা আন্টির স্মৃতি মনে করছে।
লেখক: হৃদয় গোপাল সাহা, হাজীপুর, নরসিংদী