ছোট গল্প
ভোর ৫টা। গত দুই দিন ঘুমাইনি। আমার সঙ্গে ঘুমায়নি ঘরের মধ্যে উড়ে বেড়ানো বাদামি প্রজাপতিটাও। পৃথিবীর সব ঘুমন্ত মানুষ কি একই জগতে থাকে ঘুমের মধ্যে? আমরা যখন জেগে থাকি, তখন একই রাস্তায় অনেকে হাঁটলেও সবাই সবার ভিন্ন জগতের ভেতরই হাঁটাচলা করে। রাস্তাটা সবার চোখে সমান প্রশস্ত অথবা সুন্দর নয়। আমার ঘরে যে প্রজাপতি এই মুহূর্তে ওড়াউড়িতে ব্যস্ত, ও কি সত্যিই বাদামি? বাদামি রঙের যে অনুভূতি, তা কি সবারই এক? নাকি কারও একটু গাঢ়, কারও একটু হালকা?
আমার জীবনে কোনো কিছুরই তাগিদ নেই। ছেড়ে আসা ঘর আর কিছু বইপত্তর ছাড়া কিছুই ছিল না কখনো। কিন্তু প্রতিবার শুরু করতে হয় বলেই শুরু করা।
সরি! একটু ভুল হয়েছে! এখন ভোর না বিকেল ৫টা, আমি ঠিক নিশ্চিত নই। ঘরটা অন্ধকার করা এবং দেয়ালঘড়িতে সময় দেখে বলা যাচ্ছে না সময়টা ঠিক এএম না পিএম। ফোনটা ডেড। ল্যাপটপেও চার্জ দেওয়া দরকার। শীতকাল প্রচণ্ড উদাসীন হাওয়া সঙ্গে করে নিয়ে আসে। কাঁধ ছুঁয়ে বয়ে যায় সেসব হাওয়া। আমি টের পাই প্রতিটা হাওয়ার স্পর্শ। কোনটা নাজুক, কোনটা মারাত্মক কর্কশ, বলে দিতে পারি। শুঁয়োপোকা, মথ তারপর প্রজাপতি হয়ে ওঠাটা খুব আশ্চর্য লাগে আমার কাছে। কীভাবে কুৎসিত থেকে অপরূপ হয়ে ওঠা যায়, তার একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ। আমি ঠিক জানি না এই প্রজাতি ঘরের কোন জিনিসটা পছন্দ করেছে বা করেনি। ও কোথাও বসছে না পর্দা ঝোলানোর রডটা ছাড়া। ওকে কিছু খেতে দেওয়া দরকার। শেষবার প্রজাপতি দেখে ভয় হয়েছিল বছর তিনেক আগে। খুব অদ্ভুত শোনালেও সত্যি। পেটের মধ্যে শতেক প্রজাতি যখন মাথার ভেতরের শুঁয়োপোকা হয়ে ওঠে, সেই যন্ত্রণার বয়স মনে হয় পার করেছি, তাই আর পেটের মধ্যে প্রজাপতি ওড়াউড়ি করে না এখন। কিন্তু মাথার ভেতর শুঁয়োপোকাগুলো ঠিকই জেগে জেগে ওঠে।
এই যে এখন, এই যে এখন! ওরা ঘষে ঘষে চলছে মাথার মধ্যে।
‘দরজার খোলো, আপা’
‘আপা, দরজাটা খোলো’
আমার মাথার মধ্যে ওরা হাঁটছে। আমি খানিক আয়না দেখে কাঁদতে চাই, সিমারু। তুমি কোথায়!
মা কেমন আছে? এই শীতে মায়ের সেই বিশ্রী কাশিটা কি আবার হয়েছে? জানি না! ছোটবেলায় ঘরের সামনে যে পেয়ারাগাছ আর সবুজ ডিভিডি প্লেয়ার ছিল, আমাদের তার কথা মনে পড়ে। একদিন একটা শুঁয়োপোকা আমার পেটে কামড়ে ধরেছিল। মায়ের মতোই কেউ চুল দিয়ে সেই শুঁয়োপোকার কাঁটা আমার পেট থেকে মুছে দিয়েছিল। আহারে! যদি মাথার ভেতরে কেউ চুল দিয়ে লেগে থাকা শুঁয়োপোকার কাঁটাগুলো মুছে দিতে পারত। খানিক আয়নার সামনে গিয়ে বসি। হয়তো একটু আরাম লাগবে। অন্ধকারে নিজেকে দেখতে কেমন স্যুরিয়েল লাগে। গায়ে এসে কিছুটা অন্ধকার মিশে যায় কড়াইয়ের কালির মতো করে। শরীরের বাঁকে বাঁকে যেন বয়সের নৌকা বাঁধা, যাপনের ছাপ আর সবকিছুর স্মৃতির ভারে নুয়ে পড়া পিঠ। এই অন্ধকারেও আমি দেখতে পারি৷ আমার চোখ তীক্ষ্ণ। কখনো চশমা পরতে হয়নি। মা ছোটবেলায় ছোট মাছ খাওয়াত, ফল খাওয়াত তো, তাই।
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
এখন বোধ হয় বিকেল। যদি পৃথিবী মানুষশূন্য হয়ে যেত, তাহলে ভোর আর সন্ধ্যার তফাত করা যেত না। কেমন যেন একই রকম। শুধু মানুষ আছে বলে সন্ধ্যাকে এত দুঃখী লাগে আর সকালকে সঞ্জীবনী।
এত ক্লান্তি যদি এক রাতের ঘুমে ঝেড়ে ফেলা যেত! আমার সকালে জাগতে হবে। কাজ আছে। কেউ বাসায় নেই বোধ হয়। আমার ঘুমানো প্রয়োজন। কিন্তু ওরা ফিরলে আবার দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু হবে। অযথা কাঁচা ঘুম ভেঙে মাথাব্যথা। এর চেয়ে শুয়ে শুয়ে প্রজাপতিটাকে দেখি।
কেউ দিনের আলোর মতো করে আমার ঘরে ঢুকছে! এ কী!
‘এসো, মা। কী সুন্দর চুল তোমার। তোমাকে বেণি করে দিই?’
‘কত দিন চুল আঁচড়াও না, মা। এসো চুলে তেল দিয়ে দিই’
আমার মাথার ভেতর কিছু শুঁয়োপোকা আছে! খুব যন্ত্রণা দেয় আমাকে প্রতিদিন৷ তুমি চুল দিয়ে মুছে দিতে পারো? আমার চুল পৌঁছায় না অত দূর।