ফ্যামিলি কার্ড: নারীর মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষার এক নতুন দিগন্ত

অনুষ্ঠানে কয়েকজন নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানছবি: লাইভ ভিডিও থেকে নেওয়া

রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ কর্মসূচি কেবল একটি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী নয়, বরং এটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক বিপ্লবের রূপরেখা। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরাসরি নগদ অর্থ বা পণ্যসহায়তা যখন নারীর হাতে পৌঁছায়, তখন সেই দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২-৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তারেক রহমানের এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নারীর ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে একটি সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণ করা, যা দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব সাধারণত পুরুষের হাতে ন্যস্ত থাকে। কিন্তু তারেক রহমান যে ফ্যামিলি কার্ডের প্রস্তাব দিয়েছেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে পরিবারের নারী সদস্যকে। এই কার্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র যখন সরাসরি একজন নারীর হাতে পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দেবে, তখন পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সেই নারীর মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। অক্সফাম ও ইউএনডিপির গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল বিশ্বে নারীরা তাঁদের উপার্জিত বা প্রাপ্ত অর্থের ৯০ শতাংশই পরিবারের পুষ্টি ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ। তারেক রহমানের এই চিন্তাধারা প্রমাণ করে যে তিনি উন্নয়নের সুফলকে কেবল শহরের আলোকসজ্জায় সীমাবদ্ধ রাখতে চান না, বরং প্রতিটি ঘরের অন্দরে নারীর ক্ষমতায়নকে স্পর্শ করতে চান। আধুনিক অর্থনীতিতে একে বলা হয় ‘জেন্ডার রেসপনসিভ সোশ্যাল প্রোটেকশন’, যার বাস্তব প্রয়োগ এই ফ্যামিলি কার্ড।

দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে ত্রাণ বিতরণ বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাগুলো অনেক সময় প্রকৃত দুস্থ মানুষের হাতে পৌঁছায় না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট এবং দুর্নীতির কারণে প্রান্তিক মানুষ বঞ্চিত হন। তারেক রহমানের প্রস্তাবিত এই কার্ড–ব্যবস্থায় প্রতিটি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি মূলত ব্রাজিলের বিখ্যাত বোলসা ফ্যামিলিয়া (Bolsa Familia) প্রকল্পের একটি উন্নত সংস্করণ হতে পারে, যা লাতিন আমেরিকায় দারিদ্র্যের হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছিল।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

দারিদ্র্য বিমোচনের প্রথম ধাপ হলো ক্ষুধার মুক্তি। যখন একটি পরিবার নিশ্চিত জানবে যে তাদের ন্যূনতম খাবারের জন্য চিন্তা করতে হবে না, তখন তারা তাদের অবশিষ্ট শ্রম ও মেধা ক্ষুদ্র শিল্প বা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হলে প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সঞ্চয় করার প্রবণতা তৈরি হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। একজন মা যখন ফ্যামিলি কার্ডের সুফল পাবেন, তখন তিনি তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে এবং নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে বেশি সচেষ্ট হবেন।

মেক্সিকোর ‘প্রগ্রেসা ’(Progresa) কর্মসূচির মতো এখানেও আর্থিক সহায়তার সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের শর্ত জুড়ে দিয়ে একটি শিক্ষিত ও সুস্থ প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব। এ কর্মসূচির ফলে গ্রামীণ বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। যখন লক্ষ লক্ষ নারী ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করবেন, তখন স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে। কেইনসীয় অর্থনৈতিক তত্ত্ব (Keynesian Economics) অনুযায়ী, প্রান্তিক মানুষের হাতে অর্থের জোগান দিলে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা উৎপাদনব্যবস্থাকে গতিশীল করে। এভাবেই দারিদ্র্য বিমোচনের প্রক্রিয়াটি মাঠপর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে সঞ্চায়িত হবে। নারীর হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকলে তা অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। তাই তারেক রহমান যখন নারীর নামে এই কার্ডের কথা বলেন, তখন তিনি মূলত একটি স্থিতিশীল ও সঞ্চয়মুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়তে চান। এটি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির (Financial Inclusion) একটি অনন্য উদাহরণ, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের বহুমুখী প্রবাহ (Multiplier Effect) নিশ্চিত করবে।

অনেকে হয়তো এই বিশাল কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তারেক রহমানের ভাবনা হলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপচয় রোধ, মেগা প্রকল্পের নামে অর্থ পাচার বন্ধ এবং কর আদায়ের পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের উন্নয়নপ্রক্রিয়ার শুরুতে এভাবেই প্রান্তিক মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনেছিল। তাঁর পরিকল্পনা হলো রাষ্ট্রের কাঠামোগত অপচয় কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া। তিনি মনে করেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকা জনগণেরই প্রাপ্য এবং রাষ্ট্র কেবল সেই প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার মাধ্যম। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে তিনি সেই সিস্টেম নিশ্চিত করতে চান, যেখানে ব্লকচেইন বা সমমানের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। এটি প্রযুক্তির সেই আসল রূপ, যা কেবল অভিজাত শ্রেণির জন্য নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে। তারেক রহমানের প্রবর্তিত এই ফ্যামিলি কার্ড–ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী প্রভাব হবে বহুমুখী। এটি গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হতে পারে। যখন প্রতিটি কার্ডধারী নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন, তখন জাতীয় অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবদান কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এটি কেবল একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি জাতীয় মুক্তির সনদ। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হবে, যেখানে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত হবে। এটি সেই ‘কল্যাণকামী রাষ্ট্র’ ধারণার বাস্তব প্রতিফলন, যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো বা আধুনিক উন্নত বিশ্বে আজ প্রতিষ্ঠিত।

পরিশেষে বলা যায়, দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং নারীকে আত্মনির্ভরশীল করতে ফ্যামিলি কার্ড হতে পারে আধুনিক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ  ‘গেম-চেঞ্জার । তারেক রহমানের এই সাহসী, বাস্তবসম্মত ও গণমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই একটি শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এটি হবে সেই বাংলাদেশ, যেখানে ভাতের হাহাকার থাকবে না এবং প্রতিটি নারী হবেন তাঁর পরিবারের ও দেশের সমৃদ্ধির সক্রিয় ও গর্বিত কারিগর।

*লেখক: মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান, পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]