মাঠ নেই, তবু স্বপ্ন আছে
বিশ্বকাপ ফুটবল এলে পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করেই ছোট হয়ে আসে। হাজার মাইল দূরের একটি স্টেডিয়ামে বল গড়ালেও তার ঢেউ এসে লাগে গ্রামের চায়ের দোকানে, শহরের অলিগলিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডায়, এমনকি রাতের খাবারের টেবিলেও। চার বছর পরপর আমরা আবারও ভাগ হয়ে যাই। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউবা অন্য কোনো দলের সমর্থক। পতাকা ওড়ে, তর্ক হয়, রাত জেগে খেলা দেখা হয়। ফুটবল তখন আর শুধু খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত অনুভূতির এক বিরল উৎসব। বিশ্বকাপ আমাদের যে উন্মাদনায় ভাসিয়ে নেয়, তা নিঃসন্দেহে অনন্য। কিন্তু এই উৎসবের মধ্যেও একটি প্রশ্ন জাগে, যে দেশে ফুটবল খেলার প্রতি এত ভালোবাসা ও সমর্থন, সেই দেশের শিশুরা কি ফুটবল খেলার মতো খোলা মাঠ পায়? কিংবা যে শিশুরা খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের খেলার মাঠ কোথায়?
আমাদের শৈশবে খেলার জন্য আলাদা মাঠের প্রয়োজন হতো না। ধান কাটা শেষ হলে বিস্তীর্ণ উঁচু এবং ফাঁকা জমিই হয়ে উঠত আমাদের খেলার মাঠ। বিকেল হলেই পাড়ার ছেলেরা একে একে জড়ো হতো। কোথাও দুইটা ইট বা দুইটা বাঁশ পুঁতে গোলপোস্ট তৈরি করতাম। কোনো জার্সি ছিল না, রেফারি ছিল না; ছিল শুধু দৌড়ানোর স্বাধীনতা আর অফুরন্ত আনন্দ। নিয়ম ছিল সহজ, আনন্দ ছিল বেশি। শীতের বিকেল আর বর্ষার কাদা ছিল খেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ বুঝি, আমরা শুধু বলের পেছনে ছুটিনি, আমরা ছুটেছিলাম এক মুক্ত শৈশবের পেছনে। যেখানে শীত ছিল ফুটবলের ঋতু, বর্ষা ছিল ফুটবলের উৎসব। তবে বর্তমান শৈশবের সঙ্গে আগেকার শৈশবের কোন তুলনা চলে না। এখনকার শিশুদের অবাধে দৌড়ানোর জায়গা নেই বললেই চলে।
কোভিড-১৯ এই বাস্তবতাকে আরও নির্মমভাবে দেখিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ঘরে বন্দী থেকে শিশুরা শুধু বিদ্যালয় হারায়নি, হারিয়েছে তাদের বিকেলের আকাশও। তখন আমরা বুঝেছিলাম, মানুষের শুধু খাদ্য, বাসস্থান আর চিকিৎসা নয়; প্রয়োজন খোলা বাতাস, হাঁটার জায়গা, খেলার মাঠ, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে খেলার নির্মল আনন্দ। কিন্তু মহামারির পর সেই উপলব্ধি খুব দ্রুতই যেন হারিয়ে গেল।
আমরা বিশ্বকাপে মেসির জাদু দেখি, এমবাপ্পের গতি দেখি, নতুন নতুন কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের জন্ম দেখি। অথচ খুব কমই ভাবি, প্রতিটি বড় খেলোয়াড়ের গল্পের শুরুতে একটি মাঠ থাকে। আর প্রতিটি সুস্থ সমাজের গল্পেও থাকে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত জায়গা। মেসি বা রোনালদো হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল পাড়ার মাঠ থেকে। কিন্তু আমাদের শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খালি জায়গা বা মাঠ নেই। যেটুকু আছে, তা স্কুলের ছোট্ট প্রাঙ্গণ, নয়তো বাসার ড্রয়িংরুম। যদিও স্কুলগুলোতেও নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ নেই। শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা এমন যে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই তাদের একমাত্র ক্রীড়া আয়োজন, আর সেটিও করতে হয় ভাড়া করা মাঠে। অথচ প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নিশ্চিত করা মানে একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করা। যেখানে খেলার মাঠ শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। এটি শিশুকে শেখায় দলবদ্ধতা, শৃঙ্খলা, স্বপ্ন আর লড়াইয়ের গল্প। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ ঢাকাসহ সারা দেশে ১৫ সহস্রাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো খেলার মাঠ (১ জুলাই, দৈনিক ইত্তেফাক)।
একসময় গ্রামের উঁচু জমিগুলোই ছিল শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ। যেখানে বিকেলে ফুটবল শুরু হতো, শেষ হতো অন্ধকার নামলে। কিন্তু গত দুই-তিন দশকে ভূমি ব্যবহারের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতবাড়ির সম্প্রসারণ, বাজার ও বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তার এবং কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তিত ধারা—এসব কারণে গ্রামের উন্মুক্ত স্থান ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। আগে যেখানে কয়েকটি গ্রামের জন্য অন্তত একটি খেলার মাঠ মিলত, এখন অনেক এলাকায় সেই সুযোগও আর অবশিষ্ট নেই। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলার পরিসর ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ছে। শহরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। পরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম উপাদান হিসেবে উন্মুক্ত স্থান ও খেলার মাঠের গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকৃত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শহরে আবাসন, সড়ক, পার্কিং এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের তুলনায় শিশুদের খেলার মাঠ সংরক্ষণ অগ্রাধিকার পায়নি। এর ফলে নগরের ভৌত অবকাঠামো যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি শিশুদের জন্য উন্মুক্ত খেলার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
আজ আমরা শহর তৈরি করছি কিন্তু শৈশব গড়ার কথা ভুলে যাচ্ছি। আমরা উন্নয়নের কথা ভাবছি, কিন্তু শিশুর হাসির পরিসংখ্যান রাখছি না। উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে ভবনের উচ্চতায়, কিন্তু শিশুদের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত পরিবেশ একই হারে নিশ্চিত হয়নি। উন্নয়নের নকশায় শিশুদের চাওয়া-পাওয়া যেন উপেক্ষিত থাকছে বারবার। যদিও সেই শূন্যস্থান কিছুটা পূরণ করেছে টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা ইনডোর ফুটবল কোর্ট। এই ছোট্ট কোর্টগুলোই যেন শহরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে। তবে এসব কোর্ট অধিকাংশ সময়ই কিশোর ও তরুণদের দখলে থাকে। তা ছাড়া কৃত্রিম পরিবেশে খেলাধুলা উন্মুক্ত মাঠের বিকল্প হতে পারে না। অথচ খোলা আকাশ, গাছপালা, ঋতু পরিবর্তন এবং পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত মেলামেশা—এসবই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, যে শিশুর আশপাশে কোনো মাঠ নেই, তার অবসর, সামাজিকীকরণ ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ কোথায়? যদি উন্মুক্ত খেলার জায়গার সংকোচন অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশের শৈশব কি বাস্তব মাঠের বদলে ডিজিটাল পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে? যেখানে একটি শিশুর জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন নেই—একটি বল, কয়েকজন বন্ধু আর একটু খোলা আকাশ।
বিশ্বকাপের এই উৎসব একদিন শেষ হয়ে যাবে। পতাকা গুটিয়ে যাবে। নতুন খবর পুরোনো উন্মাদনাকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু যে শিশুটি আজ একটি মাঠের অভাবে চার দেয়ালে বড় হচ্ছে, তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। আগামী কোনো বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে কি না, জানি না। কিন্তু আমরা চাইলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পারি, যেখানে প্রতিটি শিশুর শৈশবের সঙ্গে খেলার মাঠ জড়িয়ে থাকবে। তাই বিশ্বকাপের এই মৌসুমে আমার সমর্থন কোনো দলের প্রতি নয়, আমার সমর্থন প্রতিটি শিশুর জন্য একটি মাঠের পক্ষে।
লেখক: অঞ্জন কুমার রায়, ব্যাংকার
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]