জনসমুদ্রে ডানা মেলুক নির্জনতার গাঙচিল
দেশে কি বিদেশে—চারদিকে ওলটপালট একটা অবস্থা। দেশে বিরাজ করছে বিপ্লব বিপ্লব আবহ। রাষ্ট্র ও সমাজের অনেক কিছু খোলনলচে বদলে ফেলার আয়োজন সব দিকে। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এই যজ্ঞে জনতার বহুস্বর ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্তর্জাল ও শহরের অলি-গলিতে।
দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী গণবাসনা-মথিত এই সময়ে আমরা বিশাল একটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছি! এ সমুদ্রে প্রতিনিয়ত লঘুচাপ তৈরি হচ্ছে, নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে কখনো কখনো আঘাত হানছে।
এমন একটি মহাব্যস্ত সময়ে উত্তাল এই জনসমুদ্রে কত নদী-সরোবর এসে মিলিত হচ্ছে, দাবি-দাওয়ার এই জনস্রোত কোন মহাসাগরে মিলিত হতে চাইছে, এসব কিছু খতিয়ে দেখতে একধরনের নির্জনতা ও অবসর দরকার। কিন্তু অনেক সময় তা আমাদের হয়ে উঠছে না। অথচ জনসমুদ্রের গর্জনশীল উত্তুঙ্গ বাসনার নতুন সংগীতটাকে সুরে বাঁধাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এ জন্য কর্মব্যস্ত জীবনে নির্জনতা, নিজের সঙ্গে একাকী হওয়া খুব জরুরি। এটি শুধু রাজনীতিবিদ, কথাশিল্পী, চিত্রকর বা সমাজ সমালোচকের মতো মানুষদের বেলায় সত্য তা কিন্তু নয়। পেশা, লিঙ্গ ও শ্রেণি নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য, বিশেষ করে শহরবাসী মানুষের জন্য নির্জনতা জরুরি। কারণ, শহরেই নির্জনতার সবচেয়ে বেশি অভাব।
তাই বলে এ জন্য প্রাচীন মুণি-ঋষি বা সাধক-সন্ন্যাসীদের মতো লোকালয় থেকে দূরে, গহিন অরণ্যে যেতে হবে, তা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার প্রস্তাব সামান্য। বলছি দৈনিক হাজারো কাজের ভিড়ে অল্প সময়ের জন্য হলেও নিজের মুখোমুখি হওয়া, আত্মদর্শন করা। পারিপার্শ্বিক সবকিছু থেকে সাময়িক ছুটি নিয়ে কিছুটা ধ্যানমগ্ন হওয়া। অনেকটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যকের সূচনার মতো ‘সমস্ত দিন আপিসের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে গড়ের মাঠে ফোর্টের কাছ ঘেঁষিয়া বসিয়া ছিলাম। নিকটেই একটা বাদামগাছ, চুপ করিয়া খানিকটা বসিয়া বাদামগাছের সামনে ফোর্টের পরিখার ঢেউখেলানো জমিটা দেখিয়া হঠাৎ মনে হইল যেন লবটুলিয়ার উত্তর সীমানায় সরস্বতী কুণ্ডীর ধারে সন্ধ্যাবেলায় বসিয়া আছি। পরক্ষণেই পলাশী গেটের পথে মোটর হর্নের আওয়াজে সে ভ্রম ঘুচিল।’ সংসারের ঘানি টানা নাগরিকদের ক্লান্ত দিনের শেষে এমন করে বসার কথাই আমি বলছি। যাতে করে চারপাশ বা নিজের সম্পর্কে নানা ভ্রম ঘোচানো যায়। তবে যানজট ও দূষণে কাবু, ক্রম সংকুচিত জনপরিসরের এ শহরে সেই সুযোগ কতটা আছে, তা আরেকটি বড় প্রশ্ন।
কর্মব্যস্ত জীবনে নির্জন হওয়া, নিজের সঙ্গে একান্তে বসা বা আত্মদর্শন বলতে আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তার কমপক্ষে দুইটি দিক আছে। একটা হ্রস্ব, আরেকটা দীর্ঘ। হ্রস্বটা ধরাবাঁধা ১০ কি ১৫ মিনিটের ধ্যানের মতো। বর্তমানে জনপ্রিয় হতে থাকা করপোরেট মেডিটেশনের মতো কিছুটা।
অন্যদিকে সাময়িক চাপ থেকে মুক্তির পাশাপাশি জীবনধারার অংশ হিসেবে যে আত্মদর্শনের কথা আমি বলতে চাইছি সেটি অনেকটা ভিন্ন। এটি মৃত্যু-আকীর্ণ ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি সাহসী ও দরদি মনোভাব নিয়ে তাকানোর বিষয়। সাধারণভাবে এটি এমন এক চর্চা, যার মধ্য দিয়ে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষের দশাননী বা বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্ববীক্ষা গড়ে ওঠে।
কিন্তু ‘মোবাইল সংস্কৃতি’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের এই যুগে মানুষের আত্মদর্শনের, নিজের সঙ্গে একাকী হওয়ার বর্তমান ধারাটি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা জানা থাকা দরকার। কারণ, মোবাইল সংস্কৃতি নতুন ধরনের ভ্রম তৈরি করছে। সমাজবিচ্ছিন্ন নির্বান্ধব নাগরিকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবোধ কাটাতে চাইছে। এই প্রবণতা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে যতটা যুক্ত করছে, তার চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন করছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সত্যি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মুহূর্তে মুহূর্তে যোগাযোগ একটা পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিকাশ থামিয়ে দেয়। কারণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেমনই হোক, মানুষ তো বটেই প্রাণীমাত্রই সম্পর্ক থেকে আড়াল খোঁজে। তাই ব্যক্তিগত পরিসরের মতো সামাজিক পরিসরেও আড়াল দরকার। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নানা ফিচার দিয়ে এমন করে তৈরি করা, যা সব অসম্ভব সম্ভব করতে চায়, সবাইকে সারাক্ষণ মোহমুগ্ধ করে ধরে রাখতে চায়। এই মোহ ও আসক্তি থেকে মুক্তির চেষ্টাকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল ডিটক্স বা বিষমুক্ত হওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক যতক্ষণ জেগে থাকেন তার প্রায় অর্ধেকটা কাটান স্ক্রিনে চোখ রেখে। তা হতে পারে স্মার্টফোন, ট্যাবলয়েড বা কম্পিউটার।
২০১৪ সালের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন নাগরিকদের অনেকে ১৫ মিনিট নির্জনে চিন্তাভাবনা করার চেয়ে বৈদ্যুতিক ছ্যাকাকে (শক) বেশি পছন্দ করেন। এ এক সাংঘাতিক অবস্থা!
এই দুই গবেষণার অর্থ হলো, গড়পড়তা মার্কিন নাগরিকেরা প্রবলভাবে স্রোতে ভাসেন। একে অনেকে হয়তো ‘সাইট গাইস্ট’ বা কালের উদ্দীপনা বলবেন। কিন্তু জীবন নদীতে স্রোতের পাশাপাশি ভাটা না থাকলে, একটানা স্রোত মানুষকে ক্লান্ত করে, দীর্ঘ দিন ধরে এমনটি চলতে থাকলে তা মানুষকে উন্মাদ করে দেয়। এ ক্লান্তি কাটাতে বেশি বেশি পার্টি করতে হয়, নানা ধরনের ওষুধ বা মাদকের কাছে জীবনকে ছেড়ে দিতে হয়। উন্নত বিশ্বের অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা ও ভোগের সংস্কৃতিসহ সংশ্লিষ্ট সবকিছু হয়তো এমনভাবে বিকাশ করেছে যে ওই সব দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে এর বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
মার্কিন নাগরিকদের এই অবস্থা কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশের বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রেও খাটে। মার্কিন নাগরিক ও বাংলাদেশ বা ভারতের মানুষ আলাদা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে থাকলেও কারও সমস্যা কিন্তু কারও চেয়ে কম নয়। তাই রাষ্ট্র, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনের এমন সংকটকালে রোজকার জীবনে নিয়মিতভাবে কিছুটা সময় একাকী থাকতে পারাকে রীতিমতো ‘বিপ্লবী কাজ’ বলে মনে করেন মাইকেল হ্যারিস।
‘দ্য এন্ড অব অ্যাবসেন্স: রিক্লেইমিং হোয়াট উই হ্যাভ লস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড অব কন্সট্যান্ট কানেকশন’ বইয়ের এ লেখকের মতে, আমাদের নিয়ম করে ভার্চ্যুয়াল জগতের হট্টগোল থেকে দূরে থাকা দরকার। তা না হলে কোনো বিষয়ে পরিপক্ব সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আপাতত বহুস্বর বা বহুত্ববাদ একটি বিভ্রান্তিকর বিষয়। এসব বহুত্ববাদ সময় সময় পরিণত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই আগামী দিনের প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৈনন্দিন বিষাক্ত সব কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে দূরে থাকতে হবে। তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা ও না থাকা, ভিড়ে থাকা ও নির্জনে থাকার শিল্প রপ্ত করতে পারতে হবে।
একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, লোনলিনেস বা অবিরাম একাকিত্ব ও অ্যালোন বা সাময়িকভাবে একাকী থাকা এক জিনিস নয়। এটি শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা বা অসুস্থ থাকারও বিষয় নয়। বরং তা সার্বিকভাবে দৃষ্টিভঙ্গিগত ও জীবনযাপনের বিষয়। জীবন-জগৎকে কে কীভাবে দেখে এটি সে বিষয়ের মামলা। ভীষণভাবে সমাজবিচ্ছিন্নতায় ভোগা একজন মানুষও নীরবে-নিভৃতে থেকে প্রচলিত চিন্তাকে নাড়া দেওয়ার মতো কোনো কাজ করতে পারেন। তাই চরমভাবে সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষকে পাগল ভাবাও যেমন অন্যায়, ঠিক তেমনি সমাজবিচ্ছিন্নতাকে সৃষ্টিশীলতার পূর্ব শর্ত ভাবাও অপরিণত চিন্তা।
তাই বলে পরিণত চিন্তার মানুষের মধ্যে থাকা শিশুসুলভ আত্মাটিকে কবর দেওয়ার কথাও আমি বলছি না। বরং আমি জার্মান মহাকবি গ্যোটে প্রত্যাশিত সেই মানুষের কথা বলছি, যাকে সমাজ গড়ে-পিঠে মানুষ করবে, তবে সে অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করবে নির্জনতা থেকে।
অথবা রবীন্দ্রনাথের সেই সংবেদনশীল মানুষের কথাই আমি বলছি, যে একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশিরবিন্দু দেখে বিস্মিত হবে। বাস্তব বা ভার্চ্যুয়াল জগতেই শুধু বহু ক্রোশ দূরে ঘুরে বেড়াবে না। শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) হাতে নিজের পছন্দ-অপছন্দের ভার ছেড়ে দেবে না।
এমন মানুষের কথাই আমি বলতে চাইছি, যাঁরা বন্ধের দিনগুলোতে বা অবসরে চেষ্টা করবে ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকতে। অনেক দিন ধরে পড়বে পড়বে বলেও পড়া হয়নি এমন বইটি নিয়ে কাটিয়ে দেবে সারাটি দিন। অথবা শহরের রাস্তায় একাকী হাঁটতে বের হবেন, যা হবে রোজ অফিসে যাওয়া-আসার চেয়ে ভিন্ন।
মনে রাখতে হবে, নিজের সঙ্গে একাকী হওয়ার, নিজের চারপাশ ও নিজের চিন্তাভাবনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ধরা-বাঁধা কোনো নিয়ম নেই। এসব কিছু সৃষ্টিশীলভাবে অল্প অল্প করে রপ্ত করতে হয়। কোনো একটি বিষয়ে গভীর জানো-শোনা থাকার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়ে মোটামুটি জানা থাকলে চিন্তার গভীরতা তৈরি হয়। এসব কিছু নির্জনে সময় কাটাতে, নিজের সঙ্গে একাকী হতে মানুষকে শক্তি জোগায় বলে আমার ধারণা।
এ রকম একটি জীবনধারা রপ্ত হয়ে গেলে, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া না গেলেও সমস্যা জর্জরিত নশ্বর জীবন পার করা তুলনামূলক সহজ হয়। তাই চারপাশ ও নিজেকে গভীরভাবে জানতে নির্জনতাকে আলিঙ্গন করুন। জনসমুদ্রের বিস্তীর্ণ আকাশে একাকী গাঙচিল হয়ে ডানা মেলতে শিখুন।