বাংলাদেশে কমিউনিটি ফার্মেসি শক্তিশালীকরণ ও ফার্মাসিস্ট নিশ্চিতকরণ জরুরি

একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করে ওষুধ বিক্রি করেন অথবা সেবাগ্রহীতাকে দেনছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আমাদের প্রথমেই কমিউনিটি ফার্মেসি খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। সরকারিভাবে হসপিটাল ফার্মেসি বা ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি সেবা চালুর করার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে দক্ষ ফার্মাসিস্টদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।

বর্তমানে দেশে অনেক মডেল ফার্মেসি থাকলেও বাস্তবতা হলো সব জায়গায় ফার্মাসিস্টদের যথাযথ উপস্থিতি নিশ্চিত হয়নি। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ফার্মাসিস্টবিহীন কোনো মডেল ফার্মেসি চলতে দেওয়া উচিত নয়। প্রতিটি মডেল ফার্মেসিতে নিবন্ধিত ও দক্ষ ফার্মাসিস্টদের সম্মানজনকভাবে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে।

এতে অপ্রয়োজনীয় ও ভুল ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা কমবে এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়া থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। একজন প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি রোগীদের সঠিক ওষুধ ব্যবহারে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে এবং নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

এভাবে অনিয়ন্ত্রিত ও রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টবিহীন ফার্মেসি প্র্যাকটিস বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে পরিলক্ষিত হয় না, শুধু বাংলাদেশেই এ ধরনের প্র্যাকটিস প্রচলিত। অতএব একটি ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সুশৃঙ্খল ও ফার্মাসিস্ট-নিয়ন্ত্রিত ফার্মেসি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য, যা কার্যকরভাবে কমিউনিটি ফার্মেসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বাংলাদেশের হাজারো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় কমিউনিটি ফার্মেসিতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন এবং সেসব দেশের নাগরিকদের সঠিক ওষুধ ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একই দক্ষ জনশক্তিকে আমরা আমাদের দেশে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। এই ফার্মাসিস্টদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে দেশের মানুষ অবশ্যই উপকৃত হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে সরকারিভাবে ও বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে এই খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন এবং কমিউনিটি ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টদের বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফার্মাসিস্টদের সম্মানজনক বেতন নিশ্চিত করা। বর্তমানে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে, যেমন স্কয়ার ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এ কর্মজীবনের শুরুতে যে বেতনকাঠামো বিদ্যমান, কমিউনিটি ফার্মেসিতেও অন্তত সেই মানদণ্ড বজায় রাখা উচিত। আমি দৃঢ়ভাবে দাবি জানাচ্ছি, কমিউনিটি ফার্মেসিতে কর্মরত ফার্মাসিস্টদের ন্যূনতম ৪০ হাজার টাকা বেতন নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু প্রারম্ভিক বেতন নয়, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ফার্মাসিস্টদের জন্য পদোন্নতি, পৃথক পদবিকাঠামো এবং ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অন্য সুযোগ-সুবিধা, যেমন বোনাস, অবসরকালীন সুবিধা ও কল্যাণমূলক তহবিল চালু করতে হবে। এসব বিষয়কে সরকারিভাবে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকাঠামোর আওতায় আনতে হবে, যাতে ফার্মাসিস্টরা নিশ্চিন্তে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং যথাযথ সম্মান লাভ করেন।

ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিজিডিএ) প্রতি আমার জোরালো আহ্বান—মডেল ফার্মেসিগুলোতে নিয়মিত নজরদারি, তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শন আরও জোরদার করতে হবে। যদি কোথাও ফার্মাসিস্ট ছাড়া মডেল ফার্মেসি পরিচালিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উল্লেখযোগ্য জরিমানা আরোপ করতে হবে।

দেশের মানুষ যখন কমিউনিটি ফার্মেসির সুবিধাগুলো অনুধাবন করতে পারবে, তখন দেশ ও দেশের নীতিনির্ধারকেরা এই প্রয়োজনীয়তাকে আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

পরিশেষে বলতে চাই, একটি শক্তিশালী কমিউনিটি ফার্মেসি ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের উন্নত ফার্মেসি সেবার ভিত্তি। এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

*মো. আজিবুর রহমান, সভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মাসিস্টস ফোরাম

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]