কেমন হলো ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন

জাতীয় সংসদের অধিবেশন।ছবি: বিটিভির ফেসবুক লাইভ থেকে

অতীতের রুলিং পার্টি আওয়ামী লীগ (বর্তমানে রাজনীতি নিষিদ্ধ) ও গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ অধিবেশনের তুলনায় বর্তমান সংসদ অধিবেশন অধিকতর প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময় দেখলাম। এ মুহূর্তে বিএনপির নবীন ও প্রবীণ সংসদ সদস্যরা মাত্র কয়েক গজ দূরে থাকা বিরোধীদলের সদস্যদের চোখে চোখ রেখে রাজাকার, আলবদর, আলশামস, বেইমান, স্বাধীনতাবিরোধী বলতে পারছেন। এটা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগও পারত না। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ বরং শিবিরকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে গুপ্ত রাজনীতি করতে দিয়ে ওদের পাওয়ার বুস্টআপ করে দিয়ে গেছে। যে সক্ষমতা দিয়ে জামায়াত এখন সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পেয়েছে।

আবার এই সংসদ অধিবেশনেই দেখলাম মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাজায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের শীর্ষ লিডারদের জন্য শোকপ্রস্তাবও নেওয়া হয়েছে।

৩৪ দিনের প্রথম অধিবেশনে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দবন্ধ মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান।

একাত্তরের অতীতকে কীভাবে মাথার মুকুট করে রাখা যায় এবং নিকট অতীতের গণতন্ত্রহীনতার নায়কদের কীভাবে ইগনোর করে বাতিলের খাতায় রাখা যায়, এর উদাহরণ হলো শেষ হওয়া এ অধিবেশন।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

৫৫ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাহাস হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধিতা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত জামুকা আইন ও সংবিধানের আলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই আলাপের ইতি টেনেছেন এভাবে—লেজিসলেটিভলি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী। তবে অতীতের এই ইতিহাস আঁকড়ে থাকলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা যাবে না বলে শেষ ভাষণে জানিয়েছেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধ যে এখনো এ দেশে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বিষয়, শেষ দিন বিরোধী দলের উপনেতা আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা দাবির মাধ্যমেই এর প্রমাণ মেলে। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান বলে দাবি করেন। সংসদে কিশোরগঞ্জের বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করলে জামায়াতকে ডিফেন্ড করতে কথিত মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের নামে ৭৭ জামায়াতি মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা কিংবা ক্ষমা প্রার্থনা না করা জামায়াতে ইসলামীর আবার মুক্তিযোদ্ধা থাকে কীভাবে, এটি নিয়ে হাস্যরসও কম হয়নি।

এসব বাহাসকে এক পাশে রেখে স্থিতিশীল সংসদ ও সরকার নিশ্চিত করতে সরকারি দল-বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ মার্চ শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য ও অধিবেশনের সমাপনী ভাষণ একসঙ্গে দিতে গিয়ে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিভাজনের তুলনায় ঐক্য, প্রতিহিংসার পরিববর্তে সহনশীলতা, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসার সুর বেজেছে। তিনি কাজকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন বেশি।

জুলাই সনদ নিয়ে সরকারি দলের খুব বেশি তড়িঘড়ি নেই। অনুমান করা যায়, তারা এ ব্যাপারে আরও সময় নেবে। গত বৃহস্পতিবার শেষ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচন হতে না দেয়, সে জন্য আপস করে জুলাই সনদে সই করেছি।’

এবারের সংসদে সবচেয়ে আইনসংগত ও হিউমারাস কথা বলেছেন সালাউদ্দিন আহমদ। তাঁকে জুতসই সঙ্গ দিয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। দুজনই পড়ুয়া মানুষ, সেই স্বাক্ষর তাঁরা রেখেছেন। বিরোধী দলে কোনো বক্তাই শফিকুর রহমানকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি। ভবিষ্যতে উঠে আসার মতো তরুণ কোনো বক্তা জামায়াতে দেখিনি।

এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহর পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বিতার্কিক হিসেবে তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করেছেন। তিনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করে জনগণের পক্ষে কথা বলবেন, এ প্রত্যাশা রাখি।

রুমিন ফারহানার চেয়ে আলোকোজ্জ্বল ভূমিকায় অন্য কোনো স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য দেখা গেল না।

সব মিলিয়ে অন্তত এক দশক পরে সাধারণ জনগণ সংসদের আলাপ জমিয়ে উপভোগ করেছেন বলেই মনে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও শেষ দিন জাতীয় সংসদে উপস্থিত থেকে আইনপ্রণেতাদের বাতচিত শুনেছি। গণমাধ্যমের সব শাখাপ্রশাখা সদস্যদের নানামুখী বক্তব্য কোট করে নিউজ, কনটেন্ট, রিলস, শর্টস, মিম, ডিজিটাল কার্ড বানিয়ে পরিবেশন করেছে।

আমরা চাই বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ হয়ে উঠুক রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। সরকারি ও বিরোধী দলে তুমুল তর্ক হোক, সেটা যেন অতীতের মতো কোনোমতেই মুখ না দেখাদেখির পর্যায়ে না পৌঁছে।

লেখক: সাংবাদিক