আশা ভোসলে: তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

আশা ভোসলেইনস্টাগ্রাম থেকে

জীবনদাতার কৃপায় অনেকেই হয়তো শিল্পী হতে পারেন। কিন্তু একটানা সাত দশকের সুরের সাধনা দিয়ে শিল্পের মাতৃসমা হয়ে ওঠার সৌভাগ্য সবার হয় না। আশা ভোসলে ছিলেন তেমন ক্ষণজন্মা শিল্পী, যিনি গানের আরাধনায় সবার মাতার মাতা হয়ে উঠেছিলেন। উপমহাদেশের কোন ভাষায় তিনি গান করেননি? কোন মানুষের কাছে তার নিজস্ব ভাষায় এই সাধকের সুর পৌঁছায়নি? সংগীতের স্বর্ণযুগকে তাঁর চেয়ে ভালো কে রাঙাতে পারলেন আর? তাই বলব, সুরের আকাশে তুমিই অমর–অক্ষয় ধ্রুবতারা।

নবতিপর জীবন পেয়েছিলেন এই মহামহিম শিল্পী। পেয়েছিলেন নক্ষত্রসমান খ্যাতি ও বৈভব। ৯২ বছরে এসে নশ্বর দেহটাকে দেবালয়ে তুলে ধরলেন বটে, তবে আগুনের পরশমণিতে ওই দেহের আত্মাটি অবিনশ্বর অভিধায় অভিষিক্ত হয়ে রইল।

উপমহাদেশে এক ছিলেন লতা মঙ্গেশকর; তাঁরই সহোদরা আশা ছিলেন সুরের শিকড় থেকে উঠে আসা নিখাদ শিল্পী। দুই কিংবদন্তির আদি ঠিকানা এক বাড়ি। আশা ভোসলের কথায়, কাজে, চলনে কেউ কোনো দিন সামান্যতম ব্যথা পেয়েছেন—এমন শুনিনি। কিন্তু সদা হাসিখুশি তাঁর সুরে মুগ্ধ হননি—আমাদের কালে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিবিসি বাংলায় রূপসা সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘গানের জগতের সঙ্গে আশা ভোসলের সখ্য ছেলেবেলা থেকে। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকার একজন সংগীতশিল্পী ও নাট্যকার ছিলেন, দিদি লতা মঙ্গেশকারের অবদান ভারতীয় সংগীতজগতে অপরিসীম। যে সময় আশা ভোসলে সংগীতজগতে পদার্পণ করেন, তখন তিনি নাবালিকা।’

রূপসা সেনগুপ্ত আরও লেখেন, ‘আশা ভোসলেকে বলা হয়েছিল, তাঁর কণ্ঠস্বর ভজন ও ধ্রুপদি সংগীতের জন্য নয়। কিন্তু সেই ধারণাকেও “ভুল” প্রমাণ করেন তিনি। সুরকার খৈয়ামের “উমরাও জান”-এ তাঁর গাওয়া “দিল চিজ কেয়া হ্যায়’-র মতো গান তাঁকে ভার্সাটাইল সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। পাশাপাশি “পঞ্চম (আর ডি বর্মন) ও আশা ভোসলের’ জুটি একের পর হিট গান উপহার দেয়। নাসির হোসেনের ছবি “তিসরি মঞ্জিল”-এর মাধ্যমে তাদের প্রথম পেশাদারি কাজ শুরু হয়। তাঁদের যুগলবন্দী এক সৃজনশীল ও রোমান্টিক জুটি তৈরি করে, যা হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতে এক নতুন ধারার জন্ম দেয় । “ও মেরে সোনা রে”-র রোমান্টিক মাধুর্য হোক বা “ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’-র চপল ছন্দ, আশা ভোসলের কণ্ঠর জাদু সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।’

টানাপোড়েনের পরিবারে হাল ধরতে গান গেয়ে জীবিকা অর্জন শুরু করা লতা মঙ্গেশকর হয়ে উঠেছিলেন ভারতের কিংবদন্তি। ঠিক তাঁর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে আশা ভোসলের নিজের একক অবস্থান তৈরি করাটা খুব সহজ ছিল না। কিন্তু তাঁর জেদ, একাগ্রতা, শিল্পের প্রতি দায় ও নিষ্ঠা আশা ভোসলেকে আরেক কিংবদন্তিতে পরিণত করল।

হিন্দি, বাংলা, ভোজপুরিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন আশা ভোসলে। ভূষিত হয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মবিভূষণ, বঙ্গবিভূষণসসহ একাধিক সম্মানে। ১২ হাজারের বেশি গান গেয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন তিনি। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনকে পায়ে দলে কেবলই সংগীতসাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

১৯৮০ সালে নিজের দ্বিতীয় বর সুরসম্রাট রাহুল দেব দেববর্মনের সঙ্গে নিজের যূথবদ্ধতায় মুম্বাই মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি যেন প্রাণ ফিরিয়ে দেন। অনেক নারী কণ্ঠশিল্পীকে পেছনে ফেলে পাদপ্রদীপে উঠে আসেন আশা ভোসলে। ১৯৮২ সালেই ‘ওমরাও জান’ ছবিতে গান গেয়ে প্রথম ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। গান গাওয়ার পাশাপাশি ২০১৩ সালে ‘মাই’ সিনেমায় অভিনয়ও করেন তিনি।

আধুনিক কালে ওই আশাকে দিয়ে বিশ্বজয় করালেন সংগীতের আরেক বরপুত্র আল্লারাখা রহমান। একালের ওই লেজেন্ডারি মিউজিশিয়ান এআর রাহমানের (এআর রাহমান) সুরে অনেক গান গেয়েছেন আশা ভোসলে। তাঁর মৃত্যুতে মিস্টার রাহমান শোক প্রকাশ করে তাই তো লিখেছেন, ‘তিনি তার কণ্ঠ ও আভা নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন...কী অসাধারণ একজন শিল্পী ছিলেন।’

আশা ভোসলের মায়াবী ও কিন্নর কণ্ঠে ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘আর কতকাল একা থাকব’, ‘সাগর ডাকে আয়’, ‘তোমারই চলার পথে’, ‘যেখানেই থাকো সুখে থাকো’, ‘চোখে চোখে কথা বল’, ‘চোখে চোখে কথা বল’, ‘মন বলছে কেউ আসবে’ গানগুলো বাঙালির রোজকার শ্রুতিচর্চায় কাল থেকে কালান্তরে রয়ে যাবে।

অন্যদিকে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘ইয়ে মেরা দিল’, ‘দিল চিজ কি হ্যায়’, ‘ও হাসিনা জুলফোঁ ওয়ালি’, ‘রাধা কাইসে না জলে’, ‘আজ কি রাত’ হিন্দি চলচ্চিত্রের গানগুলো উপমহাদেশের শিল্প সমঝদার ও শ্রোতার মন ভরিয়ে যাবে যুগের পর যুগ।

আমাদের কালের মহান শিল্পী আশা ভোসলে তাঁর মহাকাব্যিক যাত্রা সম্পন্ন করলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘সংগীত’ প্রবন্ধে বলেন, ‘আমরা যখন কথা কহি তখনো সুরের উচ্চনীচতা ও কণ্ঠস্বরের বিচিত্র তরঙ্গলীলা থাকে। কিন্তু তাহাতেও ভাবপ্রকাশ অনেকটা অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। সেই সুরের উচ্চনীচতা ও তরঙ্গলীলা সংগীতে উৎকর্ষতা প্রাপ্ত হয়। সুতরাং সংগীত মনোভাব-প্রকাশের শ্রেষ্ঠতম উপায় মাত্র।’ আর এই উপায়ের শ্রেষ্ঠতম ধারক ও বাহক যে আশা ভোসলে ছিলেন—এই স্বীকৃতি আজ অবিসংবাদিত ও সর্বজনবিদিত।

শুধু হৃদয়গ্রাহী গান গেয়েই তার ওপর অর্পিত শিল্পের দায় মেটাননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গানে গানেই সর্বমানুষের সম্প্রীতি ও সমন্বয়বাদের জয়গান করেছেন শিল্পী আশা ভোসলে। তিনি বলতেন, ‘মানুষ যখন জন্মায়, তখন সে কেবল একটি শিশু হয়ে জন্মায়। সমাজ তাকে হিন্দু বা মুসলিম বানায়। কিন্তু আমরা যদি একটু ভালো করে দেখি, তবে দেখব সবার রক্তই লাল এবং সবার কান্নাই নোনতা। শিল্পীদের কাজ হলো সেই আদি মানবতাকে মনে করিয়ে দেওয়া।’

গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও পরম ভালোবাসায় রাবীন্দ্রিক নৈবেদ্যটুকু শিল্পীর জন‌্য রাখা থাক:

তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমানিশীথিনী-সম॥