বিশ্ব ব্রেইল দিবস: জ্ঞান হোক সবার নাগালে

আজ বিশ্ব ব্রেইল দিবসছবি: এএফপি

প্রতিবছর ৪ জানুয়ারি বিশ্ব ব্রেইল দিবস পালিত হয়, যা কেবল একটি তারিখ নয় বরং দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের মানবাধিকার ও শিক্ষার আলো ছড়ানোর এক বৈশ্বিক অঙ্গীকার। ২০১৮ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ব্রেইল দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা মূলত লুই ব্রেইলের জন্মদিনকে স্মরণ করে এবং ২০১৯ সাল থেকে জাতিসংঘ এ দিবসটি পালন করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো স্বাধীনভাবে তথ্য ও জ্ঞান আহরণের মাধ্যম হিসেবে ব্রেইলের গুরুত্ব ছড়িয়ে দেওয়া।

​বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রায় ২ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন, যাঁদের সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত করার কার্যকর পথ হলো এই ব্রেইল। বর্তমানে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় এই লিখনপদ্ধতি আরও আধুনিক হয়েছে। ব্রেইল উদ্ভাবনের ২০০ বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালের এই সময়ে এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুধু পাঠক হিসেবে নয়, বরং দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে।​ এটি কোনো আলাদা ভাষা নয়, বরং এটি অন্ধকারের মাঝে আলোর দিশারি এক অনন্য লিখনপদ্ধতি। মাত্র ছয়টি বিন্দুর বিন্যাসে তৈরি এই ‘ব্রেইল সেল’ আজ বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের মতপ্রকাশের প্রধান হাতিয়ার। এটি কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, গণিতের জটিল সমীকরণ থেকে শুরু করে সংগীতের স্বরলিপি—সবখানেই ব্রেইল অপরিহার্য। জাতিসংঘের ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ’ (UN CRPD) অনুযায়ী, এটি তথ্যের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার এক শক্তিশালী মাধ্যম। এমনকি ‘ম্যারাকেশ চুক্তি’র কল্যাণে এখন এক দেশের ব্রেইল বই পৌঁছে যাচ্ছে অন্য দেশে, যা ঘুচিয়ে দিচ্ছে তথ্যের বৈষম্য। মূলত ব্রেইল কেবল শিক্ষার মাধ্যম নয়, এটি দৃষ্টিহীন প্রতিটি মানুষের আত্মমর্যাদা ও মানবাধিকার রক্ষার এক জীবন্ত প্রতীক।

​বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধ এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষ স্বল্পদৃষ্টি বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতায় ভুগছেন। এর মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ব্রেইল শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সরকারিভাবে বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্রেইল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয় এবং এনসিটিবি (NCTB) প্রতিবছর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পাঠ্যবই মুদ্রণ করে। তবে ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম দিনেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি দেখা গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় ২১ শতাংশ স্কুলে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ এবং ব্রেইল উপকরণের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা ব্রেইল পদ্ধতিতে দক্ষ না হওয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্রেইল বইয়ের অপ্রাপ্যতা শিক্ষার্থীদের অডিও রেকর্ডিং বা অন্যের সাহায্য নিয়ে পড়ার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে, যা তাঁদের স্বাধীন শিখন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

​বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ব্রেইল ব্যবহারের ধারণা বদলে দিচ্ছে। কাগজের গণ্ডি পেরিয়ে এখন ‘রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লে’ ও এআই-চালিত সফটওয়্যার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ইন্টারনেটের দুয়ার খুলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভিস্পেরো (Vispero) বাজারে এনেছে ‘ফিউশন সুইট ২০২৬’, যা জেএডব্লিউএস ও জুমটেক্সট ফিচারকে আরও শক্তিশালী করেছে। ​৪ জানুয়ারি লুই ব্রেইলের ২১৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ICEVI ও WBU যৌথভাবে ‘More Braille: More Empowerment’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা শুরু করছে। তবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্তির প্রধান বাধা হলো সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবকাঠামোগত সংকট। অনেক পরিবার এখনো তাঁদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। তবে এটুআই-এর ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট ভাস্কর ভট্টাচার্যের সাফল্য এই মানসিকতা বদলাতে শুরু করেছে। তিনি বাংলাদেশে প্রথম ‘ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক’ এবং ব্রেইল পাঠ্যবই বিতরণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে ইউনেসকো পুরস্কারসহ নানা আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। ​২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে আইসিটির জন্য বরাদ্দ বাড়লেও গ্রাম ও শহরের ডিজিটাল বৈষম্য এখনো অনেক। গ্রামীণ এলাকায় ব্রেইল প্রিন্টিং বা আধুনিক ডিসপ্লের প্রাপ্যতা অনেক কম। এই সংকট উত্তরণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (PPP) জরুরি। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ দরকার। যেমন বসুন্ধরা গ্রুপ ‘ভিউ ফাউন্ডেশন’–এর সহায়তায় প্রতিবছর মেধাবী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও তারা এসএসসি উত্তীর্ণদের মাঝে এনসিটিবি অনুমোদিত আইসিটি ও ইংরেজি ব্রেইল বই বিতরণ করেছে, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

​২০২৬ সাল এবং পরবর্তী সময়ের জন্য ব্রেইল লিখন পদ্ধতির গুরুত্ব কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি একটি ডিজিটাল অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, যদিও অডিও প্রযুক্তি সহজলভ্য, কিন্তু একজন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য পঠন-পাঠন (reading-writing) অপরিহার্য, যা কেবল ব্রেইলের মাধ্যমেই সম্ভব। ​লুই ব্রেইল মাত্র ১৫ বছর বয়সে যে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, তা আজ ২০০ বছর পর ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে মিলে পূর্ণতা পেয়েছে। ৪ জানুয়ারি বিশ্ব ব্রেইল দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি অন্ধত্বমুক্ত পৃথিবী কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি নির্ভর করে তথ্যের অধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর। বাংলাদেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি বিশাল অংশকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হলে ব্রেইল সাক্ষরতার কোনো বিকল্প নেই। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রচারণা এবং বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগগুলো যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবেই লুই ব্রেইলের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘Braille is knowledge, and knowledge is power’ বাস্তবে রূপ লাভ করবে। বিশ্ব ব্রেইল দিবস সফল হোক, আর প্রতিটি দৃষ্টিহীন মানুষের আঙুলের ডগায় জ্ঞানের আলো পৌঁছে যাক—এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

*লেখক: মো সাইদুর রহমান, শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।