অক্ষরজ্ঞান থেকে সক্ষম নাগরিকত্ব হোক সাক্ষরতা দিবসের অঙ্গীকার

আজ ৮ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। দিনটি কেবল পড়তে বা লিখতে শেখার স্মারক নয়। এটি মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, সমতা, জীবিকা, পরিবেশসচেতনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক অধিকারকে নতুনভাবে স্মরণ করার দিন। কারণ, একজন মানুষ যখন একটি বাক্য পড়তে পারেন, একটি আবেদনপত্র বুঝতে পারেন, ওষুধের নির্দেশনা অনুসরণ করতে পারেন, ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে পারেন কিংবা নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তাঁর জীবনের সম্ভাবনার পরিধি বহুগুণ বিস্তৃত হয়।

২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো, ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’—এই প্রতিপাদ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাক্ষরতা আর শুধু বর্ণপরিচয় বা স্বাক্ষর দিতে পারার দক্ষতা নয়। বর্তমান বিশ্বে সাক্ষরতা মানে তথ্য বোঝা, যুক্তি দিয়ে বিচার করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সম্মানজনক জীবিকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। ইউনেসকোর আয়োজনে এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ৬০ বছর পূর্তি পালন করা হচ্ছে।

সাক্ষরতা কেন মানবমর্যাদার প্রশ্ন

সাক্ষরতা মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রথম সোপান। একজন নিরক্ষর মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি ব্যাংকের ফরম পূরণ করতে পারেন না, জমির দলিল পড়তে পারেন না, শ্রমচুক্তির শর্ত বুঝতে পারেন না, হাসপাতালে দেওয়া প্রেসক্রিপশন যাচাই করতে পারেন না, সন্তানের বিদ্যালয়ের নোটিশ পড়তে পারেন না। ফলে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত হয় এবং প্রতারণা, বৈষম্য ও শোষণের ঝুঁকি বাড়ে। একজন কৃষকের কথাই ধরা যাক। তিনি যদি বীজের প্যাকেটের নির্দেশনা, সার প্রয়োগের মাত্রা, আবহাওয়ার সতর্কবার্তা, বাজারদর কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ পড়তে ও বুঝতে পারেন, তাহলে তাঁর উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার একজন পোশাকশ্রমিক যদি নিয়োগপত্র, মজুরির হিসাব, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও শ্রম আইনের মৌলিক তথ্য বুঝতে পারেন, তবে তাঁর অধিকার আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সাক্ষরতা সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাক্ষরতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি মানুষের কণ্ঠস্বরকে দৃশ্যমান করে। যিনি পড়তে ও লিখতে পারেন, তিনি নিজের দাবি লিখে জানাতে পারেন, অভিযোগ করতে পারেন, মতপ্রকাশ করতে পারেন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে অর্থবহভাবে যুক্ত হতে পারেন। তাই সাক্ষরতাকে দয়া বা কল্যাণমূলক সহায়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নাগরিকত্বের ভিত্তি ও মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্ণপরিচয়ের বাইরে নতুন সাক্ষরতা

একবিংশ শতাব্দীতে সাক্ষরতার ধারণা অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আগে সাক্ষরতার অর্থ ছিল নাম লিখতে পারা, সহজ বাক্য পড়তে পারা এবং প্রাথমিক গণনা জানা। কিন্তু এখনকার পৃথিবীতে একজন মানুষকে কার্যকরভাবে অংশ নিতে হলে বহুমাত্রিক সাক্ষরতা প্রয়োজন।

প্রথমত, রয়েছে কার্যকর সাক্ষরতা। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য পড়া, বোঝা ও ব্যবহার করার সক্ষমতা। শুধু একটি বাক্য পড়তে পারা যথেষ্ট নয়, সেটির অর্থ বুঝে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।

দ্বিতীয়ত, রয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতা। মুঠোফোন, ইন্টারনেট, অনলাইন ফরম, মোবাইল ব্যাংকিং, ই–মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সরকারি ডিজিটাল সেবা আজ সাধারণ জীবনের অংশ। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকা আর প্রযুক্তি বুঝে নিরাপদে ব্যবহার করতে পারা—এক বিষয় নয়। ভুয়া খবর, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি বা ভিডিও, সাইবার বুলিং—এসব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ডিজিটাল সাক্ষরতা অপরিহার্য।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

তৃতীয়ত, প্রয়োজন তথ্য ও গণমাধ্যম সাক্ষরতা। প্রতিদিন আমরা অসংখ্য খবর, ভিডিও, পোস্ট, বিজ্ঞাপন ও মতামতের মুখোমুখি হই। সব তথ্য সত্য নয়, সব শিরোনাম নিরপেক্ষ নয়, সব ভাইরাল ভিডিও বাস্তব নয়। তাই তথ্যের উৎস যাচাই করা, একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখা, ছবি বা ভিডিওর পটভূমি বোঝা এবং আবেগের বদলে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, আর্থিক সাক্ষরতা এখন অত্যন্ত জরুরি। সঞ্চয়, ঋণ, সুদ, কিস্তি, বিমা, বিনিয়োগ, ডিজিটাল লেনদেন ও প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা না থাকলে মানুষ সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। পরিবারে নারীদের আর্থিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ বাড়াতে আর্থিক সাক্ষরতা বিশেষভাবে প্রয়োজন।

পঞ্চমত, রয়েছে পরিবেশ ও জলবায়ু সাক্ষরতা। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ। পরিবেশ রক্ষা, পানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ নির্মাণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও টেকসই কৃষি সম্পর্কে সচেতনতার সঙ্গে সাক্ষরতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই এ বছরের প্রতিপাদ্যে মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধিকে একসূত্রে যুক্ত করা হয়েছে। সাক্ষরতা মানুষকে শুধু চাকরির জন্য নয়, টেকসই জীবনযাপনের জন্যও প্রস্তুত করে।

নারীশিক্ষা ও প্রজন্মগত পরিবর্তন

একটি শিক্ষিত নারী মানে শুধু একজন শিক্ষিত ব্যক্তি নন, একটি শিক্ষিত পরিবার, সচেতন প্রজন্ম ও শক্তিশালী সমাজের সম্ভাবনা। একজন মা যখন পড়তে পারেন, তিনি সন্তানের টিকাদানের সময়সূচি, স্বাস্থ্য পরামর্শ, বিদ্যালয়ের নোটিশ, পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য ও জরুরি সতর্কবার্তা বুঝতে পারেন। তিনি সন্তানকে পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারেন, বাল্যবিবাহের ক্ষতি সম্পর্কে জানেন, নিজের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে কথা বলার সাহস পান। কিন্তু বিশ্ব বাস্তবতা বলছে, সাক্ষরতায় লিঙ্গবৈষম্য এখনো দূর হয়নি। মৌলিক সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ নারী। এই বৈষম্যের পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, গৃহস্থালি কাজের চাপ, বাল্যবিবাহ, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক কুসংস্কার, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সমস্যা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযোগী পরিবেশের অভাব। বাংলাদেশে মেয়েদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির অগ্রগতি প্রশংসনীয় হলেও শিক্ষার ধারাবাহিকতা, মান, দক্ষতা ও কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে আরও কাজ করতে হবে। কোনো কিশোরী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়লে শুধু তার ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেমে যায় না, রাষ্ট্রও একজন সম্ভাবনাময় দক্ষ নাগরিককে হারায়। তাই উপবৃত্তি, নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসংবেদনশীল পরিবেশ ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ দরকার।

শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকাই কি আর্থিক মুক্তি

বাংলাদেশে গত এক দশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিসংখ্যানটি বেশ চমকপ্রদ। দেশে মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২৪ কোটি এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীর হার মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যার গহ্বরে এক বিশাল শূন্যতা বিরাজমান। অ্যাকাউন্ট থাকা মানেই যে গ্রাহক আর্থিকভাবে শিক্ষিত, সেই বিভ্রম থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা জরুরি। বাস্তব চিত্র হলো, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ গ্রাহক বড়জোর টাকা পাঠানো বা মোবাইল রিচার্জের মতো প্রাথমিক কাজের বাইরে কিছুই করতে পারেন না। ডিজিটাল ডিপিএস, ক্ষুদ্রবিমা, মিউচুয়াল ফান্ড বা সঞ্চয়পত্রের মতো আধুনিক আর্থিক সরঞ্জামগুলো তাঁদের কাছে আজও এক দুর্ভেদ্য রহস্য। বাস্তবতা হলো, অ্যাকাউন্ট থাকা মানেই ব্যবহারে দক্ষতা নয়। পর্যাপ্ত আর্থিক সাক্ষরতার অভাব আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাক্ষরতা, জলবায়ু ও সমৃদ্ধি

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, সাক্ষরতার সঙ্গে জলবায়ু বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্কটি খুবই গভীর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন একটি পরিবার বারবার দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার পরিবারে শিক্ষার ঘাটতি থাকলে মানুষ দুর্যোগসংক্রান্ত আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের নির্দেশনা, কৃষি অভিযোজন কৌশল বা স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। একইভাবে, দক্ষ ও সাক্ষর কর্মশক্তি ছাড়া কোনো দেশ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পারে না। শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ কর্মসংস্থান, আধুনিক কৃষি, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ খাত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন শেখার সক্ষমতা। সাক্ষরতা কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দেয়, কিন্তু উচ্চ মানের সাক্ষরতা মানুষকে পরিবর্তিত শ্রমবাজারে টিকে থাকার শক্তিও দেয়। বিশ্বব্যাপী তরুণদের সাক্ষরতার হার বাড়লেও নিম্ন আয়ের দেশগুলো এখনো পিছিয়ে আছে। ২০২৪ সালে এসব দেশে প্রতি চার তরুণের প্রায় একজন নিরক্ষর ছিলেন। অর্থাৎ উন্নয়নের সামগ্রিক ভাষ্য যতই আশাব্যঞ্জক হোক, বৈষম্যের বাস্তবতা উপেক্ষা করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের সামনে করণীয়

বাংলাদেশে সাক্ষরতার আলোচনা করতে গেলে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হার দিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, শিশুরা কি বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী পড়তে, বুঝতে, লিখতে এবং গণিতের মৌলিক সমস্যা সমাধান করতে পারছে? বিদ্যালয়ে উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেখা তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি শিশু কয়েক বছর বিদ্যালয়ে পড়েও একটি সহজ অনুচ্ছেদ বুঝতে না পারে, তবে তাকে প্রকৃত অর্থে সাক্ষর বলা কঠিন।

এখানে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দরকার।

*প্রাথমিক স্তরে পাঠ বোঝার দক্ষতা নিশ্চিত করা: মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বদলে গল্প বলা, উচ্চস্বরে পড়া, প্রশ্ন করা, দলগত আলোচনা ও ব্যবহারিক অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুর ভাষা ও চিন্তাশক্তি বিকশিত করতে হবে।

*শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা: একজন শিক্ষকই শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকারী শক্তি। তাঁকে শুধু পাঠ্যবই শেষ করার চাপ না দিয়ে শিশুর শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করা, আনন্দময় পাঠদান, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

*ঝরে পড়া শিশুদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ তৈরি করা: দরিদ্র পরিবার, চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়ি অঞ্চল, উপকূল, বস্তি ও শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের জন্য নমনীয় সময়সূচি, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, ব্রিজ কোর্স ও জীবনদক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু রাখতে হবে।

*প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতা কর্মসূচির পুনরুজ্জীবন করা: যাঁরা শৈশবে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি, তাঁদের জন্য রাতের স্কুল, কর্মস্থলভিত্তিক শিক্ষা, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সহজ পাঠ্যসামগ্রী ও আয়মুখী দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা কার্যকর হতে পারে।

*মাতৃভাষা ও ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা: ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগতভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা জরুরি। শিশুর পরিচিত ভাষাকে উপেক্ষা করলে তার শেখার আগ্রহ ও বোঝার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

*প্রতিবন্ধীবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী, অটিজম স্পেকট্রামভুক্ত ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল বই, সাংকেতিক ভাষা, সহায়ক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও প্রবেশগম্য অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

*গ্রন্থাগার ও পাঠাভ্যাসের পুনর্জাগরণ করা: পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে না উঠলে ভাষা, কল্পনা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও মানবিক বোধের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ডে ছোট হলেও কার্যকর পাঠাগার গড়ে তোলা প্রয়োজন।

*ডিজিটাল সেবায় সহজ বাংলা নিশ্চিত করা: সরকারি ওয়েবসাইট, স্বাস্থ্যবার্তা, কৃষি পরামর্শ, দুর্যোগ সতর্কতা ও আর্থিক সেবার ভাষা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হতে হবে। ডিজিটাল সেবা যদি কেবল ইংরেজি–নির্ভর বা জটিল ভাষার হয়, তাহলে তা বৈষম্য আরও বাড়াবে।

*শিক্ষায় সমতা ও মানসম্মত অবকাঠামো নিশ্চিত করা: সব বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, খেলার মাঠ ও শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

*শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা: বিদ্যালয়ে শিশুর মানসিক চাপ কমানো, সহিংসতা ও শারীরিক শাস্তি বন্ধ করা এবং কাউন্সেলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আনন্দময় ও নিরাপদ শেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

*প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষা সম্প্রসারণ করা: বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই শিশুদের ভাষা, সামাজিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত প্রাক্‌–প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

*শিক্ষায় অভিভাবকের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা: শিশুর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং ঘরে পড়াশোনার সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

*কারিগরি ও জীবনদক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করা: শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যোগাযোগে দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, আর্থিক সচেতনতা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।

*শিক্ষার মান মূল্যায়নে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা: শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ব্যবহারিক দক্ষতা ও শেখার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।

*বিদ্যালয়ভিত্তিক ঝরে পড়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা: নিয়মিত অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করে পরিবার, শিক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে।

*শিক্ষায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা: অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট, ই–লাইব্রেরি ও শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং প্রযুক্তিকে শিক্ষকের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

*জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্যোগকালীন শেখার সুযোগ এবং জলবায়ু সচেতনতা শিক্ষা চালু করতে হবে।

*শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করা: বিদ্যালয়ের উপস্থিতি, শিক্ষার মান, অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

*বিজ্ঞান, গণিত ও সৃজনশীল শিক্ষার প্রসার ঘটানো: ছোটবেলা থেকেই অনুসন্ধানমূলক শেখা, পরীক্ষণ, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও সৃজনশীল চিন্তার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

*নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা জোরদার করা: শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, পরিবেশসচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে শিক্ষাক্রমে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেষ কথা

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আমাদের সামনে একটি সহজ, কিন্তু গভীর সত্য তুলে ধরে। অক্ষরজ্ঞান মানুষকে শব্দ পড়তে শেখায়, আর প্রকৃত সাক্ষরতা তাকে পৃথিবী পড়তে শেখায়। একটি শিক্ষিত সমাজ শুধু বেশি পরীক্ষায় পাস করা মানুষ তৈরি করে না; এটি এমন নাগরিক তৈরি করে, যারা প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি বুঝতে পারে, ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে পারে, পরিবেশ রক্ষা করতে পারে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সাক্ষরতার আলো একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আলো পৌঁছাতে হবে শ্রমজীবী মানুষের কাছে, গ্রামীণ নারীর কাছে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর কাছে, দুর্গম অঞ্চলের শিশুর কাছে, ঝরে পড়া কিশোরের কাছে এবং প্রযুক্তির বাইরে পড়ে থাকা প্রবীণ মানুষের কাছে। শিক্ষা হবে তখনই সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক, যখন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটিও বলবেন, ‘আমি পড়তে পারি, বুঝতে পারি, সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’ এই আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জ্ঞানের বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সাক্ষরতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বর্ণ চেনা থেকে শুরু হওয়া যাত্রাটির প্রকৃত গন্তব্য হলো একজন মানুষের অর্থনৈতিক আত্মমর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

পরিশেষে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছি, আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি কি আপনাকে কেবল অক্ষরই চেনায়, নাকি আপনার উপার্জিত অর্থের সঠিক সুরক্ষা দিতেও সাহায্য করে? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

ফয়সাল হাবিব, প্রভাষক, বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া