টাকা দিয়ে বাড়ি-গাড়ি কেনা গেলেও ঢাকার ‘জ্যাম নেই’ কেনা যায় না কেন
রাজধানী ঢাকার পিচঢালা রাস্তাগুলো যেন এক অদ্ভুত জাদুর মঞ্চ। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই শহরের মানুষের শত শত ঘণ্টা হারিয়ে যায় চিরচেনা যানজটে। সিগন্যালে মিনিটের পর মিনিট, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করাটাই যেন ঢাকাবাসীর নিয়তি। কিন্তু এই বিরক্তিকর দুর্ভোগের মধ্যেই প্রতিদিন একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে, যা হয়তো অনেকেই খেয়াল করেন না।
আমাদের সমাজে ধনী, গরিব আর মধ্যবিত্তের মধ্যে ব্যবধান অনেক। কিন্তু ঢাকার জ্যামে এসে সেই ব্যবধান যেন এক মুহূর্তে মুছে যায়। এসি ছেড়ে আরামদায়ক গাড়িতে বসে থাকা মানুষটি যেমন জ্যামে আটকে থাকেন, ঠিক তাঁর পাশেই সিটিং সার্ভিসের ভিড়ে ঘামতে থাকা মানুষটিও একই সিগন্যালে আটকে থাকেন। দামি গাড়ি বা পকেটের টাকা—কোনো কিছুই কাউকে এক ইঞ্চি আগে যাওয়ার সুযোগ দেয় না।
মার্সিডিজ, সাধারণ প্রাইভেট কার, রিকশা কিংবা লোকাল বাস—সবাই একই রাস্তায় জ্যামের সুতোয় বাঁধা। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ধনীর ব্যস্ততা আর সাধারণ মানুষের ক্লান্তি—দুটোই একই সঙ্গে থমকে দাঁড়ায়।
সংখ্যায় বোঝা যায় সমস্যা কতটা গভীর—
শুধু মানবিক পর্যবেক্ষণ নয়, বাস্তব তথ্য-উপাত্তেও উঠে এসেছে ঢাকার এই যানজট সমস্যার ভয়াবহতা। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার। কিন্তু বর্তমানে তা নেমে এসেছে ঘণ্টায় মাত্র ৪ থেকে ৫ কিলোমিটারে—যা মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির চেয়েও কম।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক পর্যালোচনায় জানা যায়, ঢাকার যানজটে প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। এই হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা—যা দিয়ে চাইলে দুটি সম্পূর্ণ মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ করা সম্ভব। কোনো কোনো গবেষণা বলছে, ঢাকাকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট ও দূষণ মিলিয়ে দেশের জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে প্রতিবছর।
সময় সবার জন্যই সমান মূল্যবান—
ঢাকার জ্যামের কাছে একজন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আর একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার হলে পৌঁছানো—দুটোরই মূল্য যেন সমান হয়ে যায়। আধুনিক জীবনে টাকা দিয়ে প্রায় সবকিছু কেনা গেলেও, ঢাকার জ্যাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মতো এক সেকেন্ড সময়ও কেউ কিনতে পারেন না।
প্রতিদিন আমরা শ্রেণিবৈষম্য, ক্ষমতার দাপট আর সম্পদের অহংকার নিয়ে কতশত প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকি। কিন্তু ঢাকার রাজপথ যেন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—কিছু বাস্তবতার কাছে আমরা সবাই সমানভাবে নিরুপায়। জ্যামের এই দুর্ভোগের মধ্যেও একটা অদ্ভুত শিক্ষা লুকিয়ে থাকে—অর্থ আর প্রতিপত্তির পেছনে ছুটতে থাকা মানুষগুলো যখন জ্যামে আটকে পাশের বাসযাত্রীর দিকে তাকান, তখন হয়তো অজান্তেই বুঝতে পারেন, দিনশেষে সবাই একই ভোগান্তির যাত্রী।
তবে এই ‘সাম্য’ নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই—বরং এটা মনে করিয়ে দেয়, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা এতটাই গভীর যে তা ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন, সময় আর অর্থনীতিকে প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সমাধান খুঁজে বের করাটাই তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়