যে শীতে ফিরে আসে শৈশবের উষ্ণতা
ক্যাম্পাসে শীতের আগমন একটু অন্যভাবেই হয়। প্রকৃতি থেকেই এর আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। যেমন—সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় পথের ধারে দেখা যায় শিউলি ফুল পড়ে আছে। দেখে মনে হয় কেউ শিউলি ফুলের কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। এই শিউলি ফুল শীতের আগমনী বার্তা দেয়। তখন দেখা যায়, বিকেল হলেই কে.আর. কিংবা ঈশা খাঁ হলের সামনে পিঠা নিয়ে বসছে একের পর এক দোকান। সেই দোকানগুলোতে ভিড় যেন শেষ হতেই চায় না। কেউ ক্লাস শেষ করে পিঠা খেয়ে হলে ফেরেন। কেউ–বা ক্লাস শেষ করে হলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটু সেজেগুজে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বের হন। আড্ডা দেন, সঙ্গে বিভিন্ন স্বাদের পিঠা খান। সন্ধ্যার শীত শীত একটা ঠান্ডা হাওয়া, সেই সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা গরম পিঠা—এ যেন আমাদের শৈশবে নিয়ে যায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ছোটবেলায় বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হতো ডিসেম্বর মাসে। আর ডিসেম্বর মাস আসা মানেই নানুবাড়ি ছুটে যাওয়া। সেখানে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যেত চারপাশ কুয়াশায় আচ্ছন্ন। নানু পিঠা বানাচ্ছে আর সেই সঙ্গে পিঠার কি মিষ্টি সুঘ্রাণ। আমরা সবাই চারপাশে ঘিরে বসতাম আর ধোঁয়া ওঠা পিঠা খেতে খেতে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিতাম। সে গল্প যেন শেষ হওয়ার নাম নেই। সেই সময়ের পিঠা শুধু খাবার ছিল না, ছিল পরিবারের সবাই এক হওয়ার এক মিশ্র আনন্দ ও উষ্ণতা।
ভার্সিটিতে উঠে এই স্মৃতিটা আবার কিছুটা হলেও ফিরে পাই এই পিঠাপুলির দোকানগুলোয়। ক্যাম্পাসের পিঠার দোকানগুলো সেই হারিয়ে যাওয়া উষ্ণতার এক নতুন সংস্করণ তৈরি করে দেয়। চিত্র ভিন্ন হলেও যেন আবার পুরোনো দিনগুলোয় ফিরে যাই। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা, বাতাসে শীত শীত একটা ঘ্রাণ, সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম পিঠা। চারপাশে যেন একটা উৎসব উৎসব আমেজ। এই দোকানগুলোতে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, ঝাল পিঠা, মিষ্টি পিঠা পাওয়া যায়। সঙ্গে হরেক রকমের ভর্তা।
কেউ কেউ আবার নিজের গ্রামের পিঠা বানানোর রেসিপি এনে ক্যাম্পাসের পিঠা বিক্রেতাদের কাছে এসে আবদার করেন—‘ভাই, একটু এ রকমভাবে বানান না!’ এতে করে দোকানগুলোর পিঠার স্বাদেও আসে ভিন্নতা।
কোনো কোনো সন্ধ্যায় আবার সাংস্কৃতিক ক্লাব আয়োজন করে ‘শীত উৎসব’ বা ‘পিঠা উৎসব’। সেখানে নিজ হাতে বানানো পিঠা সাজিয়ে রাখেন বিভিন্ন শিক্ষার্থী। কেউ বানান পাটিসাপটা, কেউ দুধপুলি, কেউ–বা খেজুর গুড়ের মোয়া। এক জায়গায় এমন বৈচিত্র্যময় পিঠার প্রদর্শনী যেন বাংলার সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
এই পিঠার দোকানগুলো শুধু খাবার বিক্রির জায়গা নয়, এগুলো আমাদের শীতের গল্প, বন্ধুত্বের বন্ধন আর স্মৃতির এক উষ্ণ ঠিকানা। প্রতিটি পিঠার স্বাদে মিশে থাকে শীতের ছোঁয়া, ক্যাম্পাস জীবন আর এক চিলতে স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে শীতের এই অনুভূতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে যখন ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা হাতে বসে থাকি বন্ধুদের সঙ্গে, তখন মনে হয়—শীত মানেই উষ্ণতা, শীত মানেই পিঠা আর স্মৃতির মিষ্টি ঘ্রাণ।
*লেখক: সাইয়্যেদা গালিবা রুহী, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়