বিশ্বকাপ ফুটবল ও বাঙালির উন্মাদনা

১১ জুন শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলছবি: ফিফা

প্রতি চার বছর পর বিশ্বব্যাপী ফুটবলের জোয়ার নিয়ে আসে বিশ্বকাপ ফুটবল। সেই জোয়ারের রেশ ছড়িয়ে পড়ে এই বাংলায়। আর বাঙালি হচ্ছে খেলাপাগল জাতি। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে সেই আনন্দের পালে নতুন হাওয়া লাগে বাঙালি উন্মাদনায়। মোটাদাগে বাংলাদেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা—দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। চায়ের কাপ থেকে যেকোনো ময়দান আড্ডার মূল বিষয়বস্ত হয়ে দাঁড়ায় প্রিয় দলের জয়–পরাজয়ের হিসাব–নিকাশ ও বিশ্লেষণ।

‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ নামে পরিচিত এই প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক মানদণ্ডে উঁচু মানে অবস্থান করছে। সময়ের পরিক্রমায় দীর্ঘ বাছাইপর্ব থেকে উত্তীর্ণ ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোতে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করবে ৪৮টি দেশ। উত্তর আমেরিকার ৩টি দেশের ১৬টি শহরে যৌথভাবে আয়োজিত হবে। এই টুর্নামেন্টটি তিনটি দেশ দ্বারা আয়োজিত প্রথম এবং ১৯৯৪ সালের পর প্রথম উত্তর আমেরিকা মহাদেশে আয়োজিত হবে। এবারের আসরের পর্দা উঠবে ১১ জুন, পরিসমাপ্তি ঘটবে আগামী ১৯ জুলাই ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে। কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ সংস্করণটি নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এবারের আসর তার চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী উত্তর গ্রীষ্মকালীন সময়সূচিতে ফিরে আসবে।

নাগরিক সংবাদ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিশ্বকাপ ফুটবল হচ্ছে ক্রীড়ামুখী মানুষদের একবিন্দুতে মিলিত করার স্থল। সারা বছর কোনো খেলার খবর না রাখলেও বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই সবাই ফুটবলীয় গবেষণায় মত্ত হয়ে যায়। পাড়া, মহল্লা, রাস্তাঘাট ও পথে–প্রান্তর ছেয়ে যায় পছন্দের দলের পতাকা টাঙানোর মাধ্যমে। কে কার চেয়ে বড় পতাকা লাগাবে, প্রিয় দলের সমর্থনে কোন জার্সি নেবে—এসব কর্মযজ্ঞে বিশ্বকাপ ফুটবল পায় পূর্ণ মাত্রা। আর বাঙালিদের পূর্ণ বিনোদনের খোরাকে পরিণত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপ ফুটবল এমন একটি খেলা, যে খেলার দরুন প্রতিটি মানুষের খেলার প্রতি যে নিবেদন ও আবেদন কাজ করে, তা সুনিপুণভাবে ফুটে ওঠে। বাঙালিরা তাদের চিত্ত বিনোদন মেটানোর পাশাপাশি প্রিয় দলের বিজয়ে উল্লাস করে, যাতে মিইয়ে যায় অনেক না জানা, অদেখা দুঃখ ও ভারাক্রান্ত প্রতিক্রিয়া।

বিশ্বকাপ ফুটবল চলমান থাকবে প্রায় এক মাস। এই মাসখানেক বাঙালিরা বিশ্বকাপ–আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকে। সময়ের সেরা ফুটবলার এমবাপ্পে, কেইন, ইয়ামাল প্রমুখদের সঙ্গে মেসি, রোনালদো, নেইমার, মদরিচ—শেষ বিশ্বকাপের অংশগ্রহণের সঙ্গে সেরা তারকাদের শৈল্পিক কারুকার্য ও মাঠের সবুজের ক্যানভাসে দৃষ্টিনন্দন—সব গোল উৎসবে মাতোয়ারা হয় সাধারণ মানুষ। বিশ্বকাপ ফুটবল হচ্ছে সব শ্রেণির মানুষের জন্য আয়োজিত বিজ্ঞাপন। এর মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে খেলার বিনোদনের মাধ্যমে সবাইকে একসুতোয় গাঁথা। তবে দিনশেষে মনে রাখতে হবে, এটি নিছক খেলা। খেলাকে খেলার জায়গায় রাখাই বরং শ্রেয়। কারণ, প্রকৃত পক্ষে আমরা বাঙালিরা ঐতিহাসিকভাবে আবেগপ্রবণ। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রিয় দলের সমর্থনে যেকোনো তর্ক, মতভেদের বিপক্ষে গিয়ে কারও সঙ্গে সম্পর্কে যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে বিশেষ সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সমগ্র দেশে পতাকা টাঙানোর হিড়িক পড়ে। এই পতাকাগুলো টাঙানো বা খেলা শেষে সরিয়ে ফেলার সময় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার ইত্যাদিতে না পেচিয়ে যায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তা না হলে পরবর্তীকালে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, যার জন্য নিজেকে শুধু এই ক্ষতির ভারবহন করতে হবে। তাই খেলাকে খেলার স্থানে রেখে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ না হয়ে উপভোগ করুন বিশ্বকাপ ফুটবল, যাতে উবে যায় জীবনের ক্লান্তি ও বিষণ্নতা।

লেখক: শাহ মুনতাসির হোসেন মিহান, এমএসএস শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়