বাসের সিট থেকে স্মৃতির ক্যানভাস

ছবি: লেখক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) চিরচেনা বাসগুলো কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, একেকটি চাকা যেন ঘোরে হাজারো স্বপ্নের টানে। এই বাসের প্রতিটি সিটে জমা থাকে চার বছরের অজস্র গল্প, জমাট বাঁধা আড্ডা, পরীক্ষার আগের রাতের যৌথ পড়াশোনা আর আজীবন টিকে থাকার মতো কিছু গভীর বন্ধুত্ব। ক্যাম্পাস থেকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং রুটে চলাচলকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী আড়িয়াল বাসের গল্পটাও ঠিক তেমনি। প্রতিদিনের ক্লান্তি ভুলে এক ছাদের নিচে জড়ো হওয়া এই বাস পরিবারেই আজ লেগেছিল উৎসবের রং। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশে নিমতলার মডার্ন গ্রিন সিটিতে আড়িয়াল বাস পরিবারের বার্ষিক বনভোজন, নবীনবরণ ও বিদায় সংবর্ধনার এই জমকালো আয়োজন যেন রূপ নিয়েছিল একটুকরা মিনি ক্যাম্পাসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের রঙিন দিনগুলো পার করে অবশেষে বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে ১৫ ও ১৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘদিনের চেনা রুট, প্রিয় বাসের চেনা সিট আর প্রতিদিনের সহযাত্রীদের ছেড়ে যাওয়ার এই অমোঘ মুহূর্তে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বিদায়ীরা। এক বুক স্মৃতি আর কিছুটা শূন্যতা নিয়ে ১৫তম আবর্তনের বিদায়ী শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগের সাইফুল মৃধা, নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রান্ত ঘোষ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের রবিউল আওয়াল ও প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের তাজকিয়া তুসি তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেন, ‘প্রথম বর্ষে যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছিলাম, তখন থেকেই আড়িয়াল বাস আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। দেখতে দেখতে চারটা বছর কেটে গেল, আজ আমরা বিদায়ী শিক্ষার্থী। বাসের জানালা দিয়ে আসা বাতাস, জ্যামে আটকে থাকার আড্ডা; সবকিছুর কথাই মনে পড়ছে। বাসের প্রতিটি কোনায় জড়িয়ে আছে আমাদের হাসি-কান্না আর মান-অভিমানের গল্প। এই সুখকর স্মৃতিগুলো আমাদের স্মৃতিপটে চিরকাল অম্লান ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ একই সুরে সুর মেলালেন ১৬তম আবর্তনের আইন বিভাগের শেখ মোহাম্মদ আরাফাত, নৃবিজ্ঞান বিভাগের নিশু আক্তার ও গণিত বিভাগের সীমান্ত হাওলাদারও। বাস–জীবনের সোনালি দিনগুলোর কথা মনে করে তাঁরা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অন্যতম সেরা এবং প্রাণবন্ত মুহূর্তগুলো ছিল আমাদের এই বাসকেন্দ্রিক। জীবনের এই সুন্দর অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে ভাবলেই মন খারাপ হয়, তবে আড়িয়াল বাসের দিনগুলো আমাদের জীবনের এক অম্লান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।’

নবীনদের চোখে নতুন স্বপ্ন—

একদিকে যখন বিদায়ের অবাধ্য সুর, অন্যদিকে তখন নতুনদের বরণ করে নেওয়ার উৎসবমুখর আমেজ। ২১তম আবর্তনের নবাগত শিক্ষার্থীদের ফুল ও উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়ে আড়িয়াল বাস পরিবারে স্বাগত জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন আঙিনায় পা রেখে এবং বড় ভাই-বোনদের এমন ভালোবাসা পেয়ে উচ্ছ্বাস আর আনন্দের জোয়ার মেতেছেন নতুন মুখেরা। আড়িয়াল বাসের নতুন যাত্রী ফিন্যান্স বিভাগের শেখ মোহাম্মদ জাকারিয়া, প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের মির্জা সায়মা সাবিহা এবং দর্শন বিভাগের মিথিলা আক্তার তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাঁদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নাট্যকলা বিভাগের মারুয়া সাফা, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সূচনা আক্তার আঁখি, ইংরেজি বিভাগের নাদিয়া দেওয়ান এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অনন্যা মণ্ডল ও অন্তর দত্ত বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকেই এই বাসের প্রতি আমাদের অন্য রকম একটা টান তৈরি হয়েছে। আজকের এই আয়োজন সত্যি দারুণ, গোছানো ও উপভোগ্য। আমরা সবাই মিলে খুব আনন্দ করছি। বিশেষ করে সিনিয়রদের সঙ্গে এভাবে মিশতে পারা, মন খুলে আড্ডা দেওয়া এবং বিভিন্ন খেলায় একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমাদের ভীষণ ভালো লাগছে। এটি আমাদের জন্য চমৎকার কিছু স্মৃতি তৈরি করছে, যা ক্যাম্পাস–জীবনের শুরুতে একেবারেই নতুন ও ভিন্ন এক অনুভূতি।’

প্রবীণ-নবীন আর চালক-সহকারীর মেলবন্ধন—

এই আনন্দযজ্ঞ কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এতে শামিল হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকেরাও। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও উৎসবে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাসুদ। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের এমন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল আয়োজনের প্রশংসা করেন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করেন। এ ছাড়া দিনভর এই আনন্দ আয়োজনে মেতে ছিলেন আড়িয়াল বাসের চালক ও সহকারী, যাঁরা প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের নিরাপদে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেন। উৎসব সফল করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন বাস কমিটির বর্তমান সভাপতি ফিন্যান্স বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থী অর্পিতা কংসবণিক, সাধারণ সম্পাদক ও ফিন্যান্স বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থী চয়ন চৌধুরীসহ বাসে নিয়মিত যাতায়াত করা অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।

উৎসবের সমাপ্তি—

জমকালো এই উৎসবের সূচি ছিল বেশ আকর্ষণীয়। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ছিল রসনাবিলাস ও ঐতিহ্যবাহী মধ্যাহ্নভোজ। দুপুরের খাবারের পর দ্বিতীয় পর্বে শিক্ষার্থীরা মেতে ওঠেন নানামুখী ইনডোর গেমসে, যেখানে প্রবীণ ও নবীন শিক্ষার্থীদের যৌথ অংশগ্রহণ উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর সমাপনী পর্বে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। নবাগত ২১তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের ক্রেস্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয় এবং বিদায়ী ১৫ ও ১৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অতিথিরা। সবশেষে আড়িয়াল বাস পরিবারের সবার সুন্দর, সুস্থ ও মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ কামনা করে ভাঙল এ বছরের আনন্দমেলা। উৎসবের আলো নিভে গেলেও শিক্ষার্থীদের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে রইল বাসের সেই চিরচেনা হর্ন, জ্যামের ক্লান্তিহীন আড্ডা আর অন্তহীন স্মৃতির স্পন্দন।

লেখক: অন্তর কুমার দত্ত, শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]