তিস্তাপারের মানুষের অ্যাম্বুলেন্স যখন একটি চৌকি

ছবি: এআই/প্রথম আলো

গঙ্গাচড়ার দুর্গম চর চিরাখাল। সেখানকারই বাসিন্দা আজমিরা খাতুন। অল্প বয়সে বিবাহিত এই বধূ দুই সন্তানের মা। অসুস্থতা তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। নদীভাঙনে জীবন-জীবিকার সংকট আর অসুস্থতার ভারে নুয়ে পড়া সংসারে তাঁর সুচিৎিকসা কল্পনামাত্র। তারপরও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ছিল তীব্র। কিন্তু ন্যূনতম চিকিৎসার নাগালের বাইরে থাকা এসব মানুষের জীবন কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরেই থেকেছে। চরম বৈষম্যের দরুন জীবন–মরণ যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে তাঁদের। আজমিরাকে বহন করার ছবিটির দিকে তাকিয়ে প্রথমে হয়তো মনে হবে, স্বজনেরা মিলে একজন অসুস্থ মানুষকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন। একটু গভীরভাবে তাকালেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। এটি কোনো অ্যাম্বুলেন্স নয়। এটি একটি সাধারণ শোয়ার চৌকি—দড়ি দিয়ে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে সেটিকেই অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়েছে। আর সেই চৌকিতে শুয়ে আছেন একজন অসুস্থ মানুষ।

তিস্তাপারের মানুষের স্বাস্থ্যসেবাসংকট ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

চারপাশে তিস্তার বিশাল জলরাশি। সামনে নদী, পেছনে চর। হাসপাতালে যাওয়ার জন্য আধুনিক কোনো যান নেই। আছে মানুষের কাঁধ, একটি চৌকি আর বেঁচে থাকার আকুতি। এ দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের দুর্ভোগের ছবি নয়; এটি তিস্তাপারের মানুষের রাষ্ট্রীয় নাগরিক অধিকারের বাস্তব চিত্র। যে দেশে মহাসড়ক, উড়ালসেতু, মেট্রোরেল, আধুনিক হাসপাতাল ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার কথা বলা হয়, সেই দেশেরই একটি নদীবেষ্টিত জনপদে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে হয় বিছানার চৌকিতে শুইয়ে।

একজন মা প্রসববেদনায় কাতরাচ্ছেন, একজন বৃদ্ধ শ্বাসকষ্টে ছটফট করছেন, কোনো শিশু জ্বরে অচেতন—তাঁদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছায় না। পৌঁছায় মানুষের কাঁধ। তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষের কাছে এই চৌকিই যেন ‘তেলবিহীন অ্যাম্বুলেন্স’। জ্বালানি লাগে না, চালক লাগে না, হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হয় না—দু-চারজন মানুষ কাঁধে তুলে নিলেই হলো। কিন্তু এই অ্যাম্বুলেন্সের গতি কতটা? একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষের জীবন যেখানে প্রতি মিনিটে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে বালুচর, কাদামাটি, ভাঙা রাস্তা আর নদী পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়, তখন চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই অনেক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

তিস্তাপারের মানুষের স্বাস্থ্যসেবাসংকট চরম আকার ধারণ করেছে, যেখানে চৌকি এখন অ্যাম্বুলেন্স। উন্নয়নে বৈষম্য ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

কতজন যে এ পথেই চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মারা গেছেন—তার হিসাব কি কেউ রাখে? এই ছবিতে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো মানুষের অসহায়ত্বের পাশাপাশি মানুষের অসাধারণ মানবিকতা। নিজের কাঁধে অন্য একজনের জীবন তুলে নিয়েছেন কয়েকজন মানুষ। তাঁরা জানেন না, রোগী শেষ পর্যন্ত বাঁচবেন কি না। তাঁরা শুধু জানেন—তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছাতেই হবে। এ একদিকে তিস্তাপারের মানুষের পারস্পরিক সহমর্মিতার ছবি, অন্যদিকে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার গভীর বৈষম্যেরও ছবি। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার এত বছর পরও তিস্তাপারের মানুষ কেন এমন একটি জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবেন? কেন তাঁদের সন্তানদের স্কুলে যেতে নদী, চর ও ভাঙা পথ পাড়ি দিতে হবে? কেন একজন প্রসূতি মাকে হাসপাতালে নিতে মানুষের কাঁধই হবে একমাত্র ভরসা? কেন একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য নৌকা খুঁজতে হবে? কেন তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষের কাছে একটি নিরাপদ সড়ক, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কিংবা একটি কার্যকর জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো স্বপ্ন হয়ে থাকবে? এর উত্তর শুধু একটি নতুন রাস্তা বানিয়ে পাওয়া যাবে না।

তিস্তার সংকট আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাস্থ্য বা যোগাযোগ সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর গতিপথ, ভাঙন, বন্যা, পানির অসম বণ্টন, চর জেগে ওঠা ও বিলীন হওয়া, কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ, যোগাযোগ এবং মানুষের পুনর্বাসনের প্রশ্ন। তাই তিস্তাপারের মানুষের জন্য স্থায়ী সমাধানও বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্পে সম্ভব নয়। সেখানেই সামনে আসে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল নদী খননের পরিকল্পনা নয়; এটি তিস্তা অববাহিকার মানুষ, নদী, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার সম্ভাবনা। নদীর মূল প্রবাহকে সচল করা, প্রয়োজনীয় স্থানে নদীশাসন ও তীররক্ষা, জলাধার ও পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশ পুনরুদ্ধার, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন এই ছবির চৌকিটি আর অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে হবে না। যেদিন তিস্তার চরাঞ্চলের একজন অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালের উদ্দেশে বের হতে মানুষের কাঁধের ওপর নির্ভর করতে হবে না; যেদিন চর থেকে ইউনিয়ন বা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য নিরাপদ যোগাযোগ থাকবে; যেদিন নদীপথে জরুরি রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে; যেদিন প্রসূতি নারী, শিশু ও বৃদ্ধের জীবন বাঁচাতে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে যাবে—সেদিনই বলা যাবে, তিস্তাপারের মানুষের উন্নয়ন শুরু হয়েছে।

আমরা প্রায়ই উন্নয়নের হিসাব করি মাথাপিছু আয়, সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎ কিংবা অবকাঠামোর সংখ্যা দিয়ে। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে মানবিক সূচকটি আরও সহজ—একজন অসুস্থ মানুষ কত দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারেন? এই ছবিটি সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে ছুড়ে দিয়েছে। তিস্তাপারের মানুষ করুণা চান না। তাঁরা দয়া চান না। তাঁরা ভিক্ষা চান না। তাঁরা চান তাঁদের নাগরিক অধিকার। তাঁরা চান নদীকে বুঝে নদীর সঙ্গে সহাবস্থানের একটি টেকসই ব্যবস্থা। তাঁরা চান এমন একটি তিস্তা, যে তিস্তা তাঁদের ঘরবাড়ি ভাঙবে না, জীবন-জীবিকা কেড়ে নেবে না; আবার প্রয়োজনের সময় পানি থেকেও বঞ্চিত করবে না। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু একটি প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে। পরিকল্পনার বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের সুফল যেন শুধু নদীর পানি বা কৃষিতে সীমাবদ্ধ না থাকে—চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানেও তার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটাতে হবে। ছবির চৌকিতে শুয়ে থাকা মানুষটির মুখ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু তিনি একজন মানুষ—তাঁরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাঁরও স্বপ্ন আছে। তাঁর পরিবারও তাঁকে হারাতে চায় না।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

তিস্তার জলরাশির পাশে মানুষের কাঁধে ঝুলে থাকা এই চৌকি তাই শুধু একটি রোগী বহনের দৃশ্য নয়; এটি আমাদের বিবেকের সামনে ঝুলে থাকা একটি প্রশ্ন। আর কত দিন তিস্তাপারের মানুষ চৌকিকে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে বাঁচবে? এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, বাস্তবায়নে দিতে হবে। আর সেই স্থায়ী উত্তরণের পথ হতে পারে—সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জনবান্ধব তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন। তিস্তার মানুষকে আর কাঁধের অ্যাম্বুলেন্সে নয়—নিরাপদ সড়ক, নৌপথ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার ওপর ভর করে হাসপাতালে যেতে হবে। সেদিনই তিস্তাপারের এই করুণ ছবিটি বদলাবে। সেদিন তিস্তা শুধু ভাঙনের নদী থাকবে না—হয়ে উঠবে মানুষের জীবন, জীবিকা ও সম্ভাবনার নদী।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সংগঠক ও সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ