খেজুরের রসে জমে ওঠা এক মিষ্টি সকাল

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে ১২টা। চোখেমুখে ঘুম ঘুম ভাব। এমন সময় ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে ফোন বেজে উঠল। ওপাশের বন্ধু উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘ভোরে রওনা হব, খেজুরের রস খেতে যাব।’ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এমন ডাক আগে কখনো পাইনি। তাই একরাশ বিস্ময় আর আনন্দ নিয়ে রাজি হয়ে গেলাম। এরপর ভোর ছয়টায় পকেট গেটে হাজির থাকতে হবে শুনেই এক লম্বা ঘুমে ঢলে পড়লাম। কিন্তু ঘুমের ভেতরও যেন বারবার ভেসে উঠছিল—কুয়াশা, মেঠো পথ আর তাজা খেজুরের রসের স্বাদ।

ভোর সাড়ে পাঁচটার অ্যালার্মে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে, ফ্রেশ হয়ে দৌড়ে গেলাম শাহ আজিজুর রহমান হলের পকেট গেটে। পকেট গেটে পৌঁছে দেখি, সবাই আগে থেকেই দাঁড়িয়ে। কারও গায়ে মোটা জ্যাকেট, কারও পরনে গ্রামীণ চাদর, শীত উপেক্ষা করার এক নীরব প্রস্তুতি। চারপাশে হালকা কুয়াশা আর ফোঁটা ফোঁটা শিশিরের শব্দ যেন ভোরের ছবি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

বললাম, ‘চলেন তাহলে, এবার যাওয়া যাক।’ আমি বলতেই তারা বলে উঠল, ‘একটু দাঁড়াও, মায়েশা আপু এখনো বাকি।’ শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস আর নরম মন–স্বভাবের এই মানুষটি দলে এলে পরিবেশটাই চনমনে হয়ে ওঠে। তিনি আসতেই দুটি ভ্যান ঠিক করা হলো আর আমরা রওনা দিলাম ত্রিবেণীর পথে।

নাগরিক সংবাদ–এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

ভ্যান ছুটতে ছুটতে ভোরের আলো ধীরে ধীরে মেঠো পথে ছড়াতে লাগল। দুই পাশে কুয়াশায় আবৃত সবুজ খেত, ভেজা মাটির গন্ধ, সূর্যোদয়ের সোনালি আলো, মাঝেমধ্যে চঞ্চল পাখির ডাক—সব মিলিয়ে এক মনোরম সকালের সূচনা। যাত্রাপথে কেউ গান গাইতে শুরু করল, কেউ আবার মোবাইল ক্যামেরায় প্রকৃতি বন্দী করতে ব্যস্ত। এমন সময়ে এক বন্ধু ‘বকুল ফুল বকুল ফুল’ গানটি গাইতে লাগল, এরপর সবাই একসঙ্গে গাইতে লাগলাম—যা ছিল ভোরের নীরবতাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার মতো।

কিছুক্ষণ পর পৌঁছালাম ত্রিবেণী বাজারে। দোকানপাট তখনো খোলেনি, নীরবতা যেন সকালের এক আলাদা সৌন্দর্য যোগ করেছে। বাজার থেকে আরও দুই কিলোমিটার ভেতরে সেই খেজুরগাছির বাড়ি। উঠানে পৌঁছে দেখি, ইতিমধ্যে আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন রসের অপেক্ষায়। খেজুরগাছি হাঁড়িতে রস ছেঁকে দিচ্ছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজ কতটা রস পেলেন?’ তিনি হেসে বললেন, ‘শীত বেশি থাকলে রসও ভালো হয় বাবুজি, আজ বেশ হয়েছে।’ সেই বাষ্প ওঠা রসের ঘ্রাণে যেন জিবে জল চলে আসে। আমি গ্লাস হাতে নিয়ে প্রথম চুমুকটা নিলাম—মিষ্টি, হালকা ঠান্ডা আর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মুহূর্তেই মনে হলো, এই ভোরের ছোট্ট যাত্রা জীবনের এক অমূল্য খেজুরের রস।

এরই মধ্যে খেজুরের রসের উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে খেজুরগাছি বলেন, খেজুরের রস একটি প্রাকৃতিক ও অত্যন্ত পুষ্টিকর পানীয়। এতে থাকা প্রাকৃতিক চিনি শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায় এবং ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করে।

তখন এক সিনিয়র ভাইকে বললাম, আচ্ছা ভাই, যেহেতু খেজুরের রসের এত উপকারিতা আছে, নিশ্চয়ই অপকারিতাও রয়েছে। উত্তরে তিনি জানান, খেজুরের রসে চিনি বেশি থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতিরিক্ত পান করলে ওজন বৃদ্ধি, পেটের সমস্যা কিংবা দাঁতের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—কাঁচা বা খোলা খেজুরের রস পান করা, যা বাদুড়ের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হতে পারে। তাই খেজুরের রস উপকারী হলেও তা অবশ্যই ফুটিয়ে, নিরাপদভাবে এবং পরিমিত মাত্রায় পান করা উচিত।

কিছুক্ষণ পর সবার হাতে তুলে দেওয়া হলো টাটকা খেজুরের রস—এক গ্লাস মাত্র ২০ টাকায়। রস ঠোঁটে ছোঁয়ামাত্র যে মোলায়েম মিষ্টি স্বাদ গলা বেয়ে নামল, তাতেই মনে হলো ভোরে ওঠার সব ক্লান্তি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে। কেউ রস খেতে খেতে ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার রসের হাঁড়ি নিয়েও ছবি তুলছে। মুহূর্তের মধ্যেই উঠানটি পরিণত হলো এক ছোট্ট মিলনমেলায়।

বন্ধু ও সিনিয়রদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা আর ছোট ছোট কথোপকথনে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন ভোরের এক জাদুকরি গল্পের অংশ। এসব দেখে বোঝা গেল, খেজুরের রসের অপকারিতার চেয়ে সবাই তার উপকারিতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মধ্যেই আমিও একজন।

ফেরার সময় একটি ভ্যান ফিরে যাওয়ায় সবাইকে এক ভ্যানে গাদাগাদি করে উঠতে হলো। আমার ভাগ্যে জুটল দাঁড়িয়ে ভ্যানযাত্রা। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সামনে বসা এক বন্ধুর মাথায় হালকা ধাক্কা লাগতেই সে বলল, ‘ভাই সাবধানে, আমি কিন্তু ভোরে রস খেতে মরতে আসিনি!’ আবারও হাসির রোল। তবু মৃদু হাওয়া, সকালের কোমল রোদ, গান আর দলগত হাসাহাসি—সব মিলিয়ে যাত্রাটা আরও উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল। মাঝপথে একটু থেমে কয়েকটি মিষ্টি আর দুষ্টুমি ভরা ছবি তোলা হলো। তারপর আবার গান গাইতে গাইতে রওনা দিলাম ক্যাম্পাসের পথে।

ক্যাম্পাসে পৌঁছে আবারও ছবি তোলা, নানা ভঙ্গিতে হাসিঠাট্টা। তারপর সকালের গরম চা খেয়ে সবাই রওনা দিলাম নিজ নিজ গন্তব্যে। আমি হলে এসেই দ্রুত রেডি হয়ে ক্লাসে যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম।

শেষ বিকেলে মনে হলো—এক ভোরের ছোট্ট যাত্রাই কত বড় স্মৃতি হয়ে থাকে! খেজুরের রসের মতোই মুহূর্তগুলোও টাটকা, সরল আর মিষ্টি। আবার কবে এমন ভোরে রসের খোঁজে পথ ধরব!

*লেখক: সুবংকর রায়, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া