ছোট্টবেলার বৈশাখ
উঠানের মাঝখানে সাদা-লাল আলপনা আঁকা শেষ হতেই পাশের গাছের গোড়ায় আবার রং লাগানো শুরু হলো, কেউ পাতা দিয়ে গেট সাজাচ্ছে, কেউ উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে। বৈশাখের আগের দিনের এই ব্যস্ততাই যেন ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।
ছোট্টবেলার বৈশাখ মানেই এমন প্রস্তুতি। পুরো বাড়িটা যেন নতুন করে সাজানো হতো। কাঁচা সবুজ পাতায় বানানো গেট, গাছের গোড়ায় রঙের ছোঁয়া, পরিষ্কার উঠান—সব মিলিয়ে বাড়িটা হয়ে উঠত এক উৎসবের নীড়।
সকালে ঘুম ভাঙতেই চোখে পড়ত বড় বড় থালায় সাজানো পান্তাভাত। পাশে ইলিশ মাছ ভাজা, পুঁটি মাছ ভাজা আর এক সারি ভর্তা! আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, শিমভর্তা, কাঁচা মরিচভর্তা, শুটকিভর্তা, ধনেপাতাভর্তা। প্রতিটি ভর্তার স্বাদ যেন আলাদা এক গল্প বলত। সবাই মিলে বসে সেই খাবার খাওয়ার আনন্দটাই ছিল বৈশাখের আসল শুরু।
বেলা বাড়তেই সূর্য মাথার ওপর উঠে আগুন ঝরাতে থাকত। গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা, কিন্তু তার মধ্যেই এক গ্লাস লেবুর শরবত, তরমুজের শরবত বা পেঁপের শরবত যেন শরীরের ভেতর ঠান্ডা একটা স্বস্তি এনে দিত।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
দুপুর পেরোলেই অপেক্ষা থাকত মেলার জন্য। গ্রামের মেলায় পৌঁছাতেই চোখ ধাঁধিয়ে যেত। নাগরদোলার দিকে তাকিয়ে মনটা লাফিয়ে উঠত, চড়তে না পারলে যেন বৈশাখই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে! ওপরে উঠলে নিচের সবকিছু ছোট হয়ে যেত, আর বুকের ভেতর আনন্দটা বড় হয়ে উঠত।
চারপাশে রংবেরঙের খেলনার দোকান, কাঠের বাঁশি, টিনের গাড়ি, রঙিন পুতুল, বেলুন, লাটিম, ছোট ঢোল, কাগজের ঘুড়ি কোনটা ছেড়ে কোনটা নেব, সেটাই বুঝে উঠতে পারতাম না।
এক কোণে বাতাসার স্তূপ, পাশে চিনি দিয়ে বানানো ঘোড়া আর পুতুল দেখলেই মনে হতো এগুলো শুধু মিষ্টি নয়, ছোট্টবেলার স্বপ্ন। আরেক পাশে কুলা, বেতের তৈরি ডালা, ঝুড়ি, চালনি যেগুলো আমাদের ঘরের খুবই দরকারি জিনিস ছিল। পিতল আর কাঁসার থালা, গ্লাস, বাটি তখন যেগুলো খুব সাধারণ ছিল, এখন সেগুলোই যেন স্মৃতির অমূল্য অংশ।
মেলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত ঘোড়ার গাড়ি। একবার চড়ার সুযোগ পেলে মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দটা পেয়ে গেছি। ঘোড়ার টগবগ শব্দে মনে হতো যেন রাজকীয় কোনো যাত্রায় বের হয়েছি। কোথাও আবার দেখা যেত ঘোড়া দিয়ে চাষ গ্রামের সেই সহজ জীবনের ছবি।
বিকেলের বাতাস উঠলেই ছুটে যেতাম মাঠে। ঘুড়ি উড়ত আকাশে লাল, সবুজ, হলুদ। কার ঘুড়ি কারটা কাটবে, সেই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতাম সবাই।
গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ছিল একটাই ভরসা আইসক্রিম। আট আনার (৫০ পয়সা) রঙিন বরফ, এক টাকার দুধের আইসক্রিম মুখে দিলেই ঠান্ডা সুখ ছড়িয়ে পড়ত শরীরজুড়ে।
বৈশাখ এলেই দোকানে দোকানে হালখাতা শুরু হতো। নতুন খাতা খুলে পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের শুরু। নতুন জামা পরে সেখানে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ার আনন্দটা ছিল অন্য রকম।
সন্ধ্যা নামলে মেলার কোলাহল কমে যেত, কিন্তু মনটা তখনো ভরা থাকত দিনের সব আনন্দে। ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লেও চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠত নাগরদোলা, ঘুড়ি, খেলনা, আর সকালের পান্তা-ইলিশ।
ছোট্টবেলার বৈশাখ ছিল একেবারে আলাদা। সেখানে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল না কোনো বাড়তি চাহিদা। সামান্যতেই ছিল অগাধ আনন্দ। সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতিতে আছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোই আজও মনে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দেয়।
লেখক: মানিকদী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বাংলাদেশ।