ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়া: কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা

জাদুঘরের প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরাছবি: লেখকের পাঠানো

হরিনাথ মজুমদার, যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে সমধিক পরিচিত (২০ জুলাই ১৮৩৩-১৮ এপ্রিল ১৮৯৬)। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক। তিনি বাউল সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎও ছিলেন। তিনি সবার কাছে ফকির চাঁদ বাউল নামেও পরিচিত ছিলেন। অধিকন্তু তিনি ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’ পত্রিকা প্রকাশের জন্যও প্রসিদ্ধ। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, কুষ্টিয়া তাঁর স্মরণে কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে।

অত্যাচারিত, অসহায়, নিষ্পেষিত কৃষক সম্প্রদায়কে রক্ষার হাতিয়ারস্বরূপ সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন হরিনাথ মজুমদার। অল্প শিক্ষা নিয়েই তিনি দারিদ্র্য ও সচেতনতাবিষয়ক লেখনী সংবাদপত্রে প্রকাশ করতেন। প্রথমে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় লিখতেন। প্রাচীন সংবাদপত্র হিসেবে বিবেচিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কুমারখালী এলাকা থেকে গ্রামবার্তাপ্রকাশিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি।

৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ক্লাস শেষে হুট করে সিদ্ধান্ত হয় চারণ সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি জাদুঘর দেখতে যাওয়ার, সময় নির্ধারণ হয় বেলা ১টা। ১টার আগেই আমরা কয়েকজন ক্যাম্পাসে উপস্থিত। কারণ, সিদ্ধান্ত ছিল ১টার ক্যাম্পাসের বাসই হবে আমাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর বাহন। সময় অনুযায়ী আমরা ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী যাত্রা করি আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশে।

গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর পর অনুভব করি লাল ইটের স্থাপনাটি দূর থেকেই আলাদা করে নজর কাড়ে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ গাছ, ছায়াঘেরা পথ আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অবিচল ভাস্কর্য—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে কোনো কোলাহল নেই, নেই কোনো যান্ত্রিকতা। সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি জাদুঘরের এই নীরব পরিবেশে এসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেন হঠাৎ করেই ফিরে যান ইতিহাসের গভীরে।

এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সফর ছিল না, কোনো শিক্ষক-নির্দেশিত আয়োজনও ছিল না। আমরা শিক্ষার্থীরাই নিজেদের আগ্রহ, কৌতূহল থেকে এই ভ্রমণের উদ্যোগ নিই। পাঠ্যবইয়ের পাতায় পড়ে যাওয়া একটি নামকে কাছ থেকে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমাদের এই যাত্রা। গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত কাঙাল হরিনাথের জীবন, সংগ্রাম ও সাংবাদিকতা দর্শন প্রত্যক্ষ করার সুযোগই ছিল এই সফরের মূল প্রেরণা।

স্মৃতি জাদুঘরের মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই আমাদের চোখে পড়ে কাঙাল হরিনাথের আবক্ষ ভাস্কর্য। স্থির দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকা এই ভাস্কর্য যেন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—সাংবাদিকতা কাকে বলে? সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কি আজও আমাদের আছে? এই প্রশ্ন নিয়েই আমরা সবাই একে একে ঘুরে দেখি জাদুঘরের ভেতরের অংশ।

জাদুঘরের দেয়ালে সাজানো রয়েছে কাঙাল হরিনাথের জীবনের নানা অধ্যায়। কোথাও তাঁর লেখা পত্রিকার পুরোনো কপি, কোথাও দুর্লভ আলোকচিত্র, আবার কোথাও তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী। এসব নিদর্শন শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, বরং একটি সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও তুলে ধরে। ব্রিটিশ শাসনামলের অন্যায়, জমিদারি প্রথার শোষণ এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনার চিত্র তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষার্থীরা সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন দেয়ালে টানানো লেখা। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট অংশের সামনে থেমে থাকছিলেন। সবার চোখেমুখে ছিল গভীর মনোযোগ। কারণ, এখানে লেখা প্রতিটি শব্দই সাংবাদিকতার সাহসী ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। কাঙাল হরিনাথ কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই, নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই সমাজের পক্ষে কথা বলেছিলেন। এই বিষয়টি সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।

ব্লার্ব: নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

ভ্রমণে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা ক্লাসে সাংবাদিকতার নৈতিকতা, দায়িত্ব আর স্বাধীনতার কথা পড়ি। কিন্তু এখানে এসে বুঝেছি, এসব শুধু তত্ত্ব নয়—এগুলো বাস্তব জীবনের সংগ্রামের ফল।’ তাঁর মতে, কাঙাল হরিনাথের জীবন আজকের সাংবাদিকদের জন্য একধরনের আয়না, যেখানে নিজেদের অবস্থান নতুন করে যাচাই করা যায়।

স্মৃতি জাদুঘরের ভেতরে ঘুরে দেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে সাংবাদিকতার বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে। আধুনিক মিডিয়ায় প্রযুক্তির প্রভাব, বাণিজ্যিক চাপ ও দ্রুততার সংস্কৃতির ভিড়ে কাঙাল হরিনাথের সাংবাদিকতা কতটা প্রাসঙ্গিক—এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। অনেকেই মনে করেন, আজকের দিনে সত্য বলার ঝুঁকি হয়তো আরও বেড়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে দায়িত্বও।

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘কাঙাল হরিনাথ আমাদের শেখান, সাংবাদিকতা মানে শুধু খবর প্রকাশ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। আজকের দিনে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন।’ তাঁর মতে, এই ভ্রমণ তাঁদের ভবিষ্যৎ পেশাগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।

জাদুঘরের পরিবেশ আমাদের সবার মধ্যে একধরনের শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে। এখানে কোনো উচ্চ স্বরে কথা নেই, নেই হইচই। সবাই যেন নিজ নিজ ভাবনায় ডুবে যান। কেউ ভাবেন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে, কেউ নিজের দায়িত্ব নিয়ে। কাঙাল হরিনাথের জীবনসংগ্রাম যেন প্রত্যেককে আলাদা করে প্রশ্ন করে—তোমরা কীভাবে কলম ধরবে?

পরিদর্শনের একপর্যায়ে জাদুঘরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে দলগত তোলা ছবিটি আমাদের কাছে শুধু একটি স্মৃতি নয় বরং একটি প্রতীক—ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের সংযোগের প্রতীক। ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হলে এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেবে, আমরা কোন আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলাম।

দিনের শেষ দিকে জাদুঘর প্রাঙ্গণ ছেড়ে বের হওয়ার সময় আমাদের সবার চোখেমুখে ছিল একধরনের প্রশান্তি। প্রত্যেকের অনুভূতি এমন ছিল, যেন কেবল একটি জায়গা দেখে আসেনি, বরং সাংবাদিকতার আত্মাকে ছুঁয়ে দেখেছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে বাস্তব ইতিহাস জানার এই সুযোগ আমাদের শিক্ষাজীবনে আলাদা গুরুত্ব বহন করবে।

এই স্বতঃস্ফূর্ত শিক্ষাসফর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এক নীরব অঙ্গীকারের মতো। ভবিষ্যতে সংবাদ সংগ্রহ, লেখা বা প্রচারের সময় , কাঙাল হরিনাথের আদর্শ—সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা, ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করা এবং মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা আমাদের অনুপ্রাণিত করবে আমাদের কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকতে। কাঙাল হরিনাথের স্মৃতি জাদুঘর এই শিক্ষাই নীরবে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে আমাদের মনে গেঁথে দেয়।

*লেখক: মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস, শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়