হাজার প্রাণের সম্ভাবনা ছুঁয়ে হাওরের জলে

ছবি: লেখক

শিক্ষাসফর মানেই শুধু গন্তব্যে যাওয়া নয়। কখনো কখনো একটি দিনের ভ্রমণ হয়ে ওঠে বইয়ের পাতার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ। অ্যানিমেল হাসবেন্ড্রি অনুষদের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের হাঁস ও বিশেষায়িত পোলট্রি উৎপাদন কোর্সের শিক্ষাসফরটিও তেমনই একটি দিন। তাড়াইল, কিশোরগঞ্জের পথে এই সফরে একদিকে ছিল হ্যাচারির হাজার হাজার ডিম ও নতুন প্রাণের সম্ভাবনা, অন্যদিকে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর হাঁস পালনের বাস্তব চিত্র।

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রস্তুতির ব্যস্ততা। সাজগোজ, হাসি-আড্ডা আর আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছিল চারপাশ। সকাল সাতটার মধ্যে সবাই অনুষদ ভবনের সামনে উপস্থিত। সাড়ে সাতটার দিকে সকালের খাবার নিয়ে উঠে পড়া হলো গাড়িতে। শুরু হলো তাড়াইল, কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

গাড়ি ছুটছিল গন্তব্যের পথে। রাস্তার দুপাশের চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে গান, নাচ আর লুডু খেলায় জমে উঠেছিল আনন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া ও খুনসুটিতে কখন যে ব্যস্ত একাডেমিক জীবনের কথা ভুলে গিয়েছিলাম, তা বুঝতেই পারিনি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

প্রথম গন্তব্য দামিহা উদয়ন কলেজ। সেখানে স্থানীয় হ্যাচারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় হলো। আন্তরিকতা ও আনন্দের সঙ্গে তাঁরা আমাদের স্বাগত জানালেন। এরপর আটটি দলে ভাগ হয়ে আমরা গেলাম আটটি আলাদা হ্যাচারিতে।

ছবি: লেখক

হ্যাচারিতে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল হাজার হাজার ডিমের দিকে। প্রতিটি ডিমের ভেতর যেন লুকিয়ে আছে নতুন জীবনের সম্ভাবনা। এত দিন বইয়ের পাতায় পড়া হ্যাচারি কার্যক্রম এবার চোখের সামনে দেখার সুযোগ হলো। হ্যাচারি কর্মকর্তারা প্রতিটি কার্যক্রম অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করলেন।

তাঁরা জানালেন, হ্যাচারি পরিচালনা অনেকটা সন্তান পালনের মতো। প্রতিটি ধাপে সতর্কতা প্রয়োজন। সামান্য ভুলেরও সুযোগ নেই। কারণ, একটি ভুলের কারণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে হাজার হাজার প্রাণের সম্ভাবনা। প্রতিটি ধাপে সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে হয়। টানা ২৯ থেকে ৩০ দিনের দিন-রাতের পরিশ্রমের পর নতুন প্রাণ পৃথিবীর আলো দেখে।

পাঠ্যবইয়ে এত দিন যে বিষয়গুলো পড়েছি, এবার সেগুলোর বাস্তব রূপ দেখার সুযোগ হলো। একই সঙ্গে উপলব্ধি করলাম গ্রামীণ হ্যাচারি কর্মকর্তাদের কঠিন পরিশ্রম ও দায়িত্বের কথা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শুধু শেখায়নি, ভাবতেও শিখিয়েছে। নতুন নতুন পদ্ধতি ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি হলো। একই সঙ্গে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর প্রতি জন্ম নিল সম্মান ও শ্রদ্ধা।

ছবি: লেখক

হ্যাচারি পরিদর্শন শেষে কলেজে ফিরে কিছুটা বিশ্রাম নিলাম। এরপর দুপুরের খাবার। একাডেমিক ব্যস্ততা থেকে এবার কিছুটা বেরিয়ে আনন্দের পালা। গন্তব্য হাওর।

সারিবদ্ধভাবে হাওরে পৌঁছে দেখলাম, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বড় একটি নৌকা। সবাই একে একে উঠে পড়লাম। নৌকা ছাড়তেই যেন বদলে গেল চারপাশের দৃশ্য। দুই চোখ যত দূর যায়, শুধু পানি আর পানি। দূরে ছোট ছোট গ্রামের ছবি। পানির ওপর নৌকার তোলা ঢেউ মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল। হাওরের পানিতে চোখে পড়ল লেন্টিং হাঁস পালন পদ্ধতি, যা এত দিন শুধু পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। এবার সেটিই চোখের সামনে দেখার সুযোগ হলো। হাঁসগুলো যেন হাওরের প্রকৃতিকে আরও পূর্ণ করে তুলেছে। কারও ব্যস্ততা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়, কেউ ক্যামেরায় ধরে রাখছেন মুহূর্তগুলো, আবার কেউ নীরবে তাকিয়ে আছেন দূরের প্রকৃতির দিকে।

ছবি: লেখক

দুই ঘণ্টা কখন পেরিয়ে গেল, কেউ বুঝতেই পারলাম না। এবার ফেরার সময়। বাসে উঠে আবার শুরু হলো ক্যাম্পাসের পথ। সকালের মতো সেই উচ্ছ্বাস তখন আর নেই। কিছুক্ষণ মন পড়ে রইল হাওরের জলে, নতুন প্রাণের সম্ভাবনার কাছে। পরে আবার গান নাচে ফিরে এল আনন্দ। উৎসবমুখর পরিবেশে কখন যে পথ শেষ হয়ে গেল, টেরই পেলাম না। রাত সাড়ে আটটায় ক্যাম্পাসে পৌঁছালাম। রাতের খাবার নিয়ে সবাই ফিরে গেল নিজ নিজ হলে।

আবার শুরু হলো চেনা ব্যস্ততা। তবে এই এক দিনের সফর রেখে গেল অন্য রকম কিছু স্মৃতি। হ্যাচারির হাজার প্রাণের সম্ভাবনা, হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, হাঁস পালনের বাস্তব চিত্র আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় সময়। বইয়ের পাতার জ্ঞানকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই অভিজ্ঞতা হয়তো অনেক দিন মনে থাকবে।

মোতমাইন্না মুন্নী, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ