বিশ্ব শিক্ষক দিবস–নাগরিক: ৫
গণিত কোচিং সেন্টার ও প্রবীর কুমার কর্মকার স্যার—একজন আলোকদিশারির গল্প
জীবনের পথে কিছু মানুষ আসেন, যাঁরা শুধু আমাদের পড়ান না—তাঁরা আমাদের পথ দেখান, স্বপ্ন দেখতে শেখান, আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন এবং শেষ পর্যন্ত একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করেন। সময়ের স্রোতে তাঁদের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগ হয়তো থাকে না, কিন্তু তাঁদের দেওয়া শিক্ষা, উপদেশ ও আদর্শ আমাদের জীবনের প্রতিটি বাঁকে কোনো না কোনোভাবে পথ দেখায়।
প্রবীর কুমার কর্মকার স্যার আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ—একজন শিক্ষক, একজন পথপ্রদর্শক এবং নিঃসন্দেহে একজন আলোকদিশারি।
বড় পুলের নিচের সেই ছোট্ট কোচিং সেন্টার
সিরাজগঞ্জ শহরের বড় পুলের নিচে ছিল স্যারের ছোট্ট ‘গণিত কোচিং সেন্টার’। জায়গাটি হয়তো আজকের আধুনিক কোচিং সেন্টারের মতো ছিল না—ছিল না ঝকঝকে শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা বড় কোনো অবকাঠামো। কিন্তু সেখানে ছিল এমন একজন শিক্ষক, যাঁর জ্ঞান, আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ সেই ছোট্ট জায়গাটিকে আমাদের কাছে একটি জ্ঞানচর্চার আলোকিত কেন্দ্র করে তুলেছিল।
কোচিং সেন্টারের নাম ছিল ‘গণিত কোচিং’—কিন্তু স্যারের জ্ঞানের পরিধি কোনো একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন প্রায় সব বিষয়েই দক্ষ। তাঁর কাছে পড়লে মনে হতো, একজন শিক্ষক শুধু একটি নির্দিষ্ট বই বা বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ নন; একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ তৈরি করেন।
তাঁর ক্লাসে শুধু পড়া মুখস্থ করার বিষয় ছিল না। তিনি বুঝিয়ে দিতেন, প্রশ্ন করতে শেখাতেন, চিন্তা করতে উৎসাহ দিতেন। কোনো বিষয় না বুঝলে আবার বোঝাতেন। কোথাও দুর্বলতা দেখলে শাসন করতেন, আবার একই সঙ্গে উৎসাহও দিতেন।
আজ এত বছর পর বুঝতে পারি—তখন আমরা হয়তো ভাবতাম, স্যার আমাদের শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাদের জীবনের জন্য প্রস্তুত করছিলেন।
১৯৯৯ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
আমার নিজের জীবনের সঙ্গে স্যারের সম্পর্ক আরও গভীর। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁর কাছে পড়েছি।
সেই সময়টা ছিল জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সামনে তখন নতুন স্বপ্ন—কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, নিজের ভবিষ্যৎ এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
সেই সময় একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একজন ভালো গাইডের—যিনি শুধু পড়াবেন না, বরং বলবেন কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে নিজেকে তৈরি করতে হয় এবং কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়।
প্রবীর স্যার আমাদের জন্য ঠিক সেই ভূমিকাটিই পালন করেছিলেন।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, তাঁর কাছে কাটানো সেই দিনগুলো আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তখন হয়তো তাঁর অনেক কথার গভীরতা বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করেছি—একজন শিক্ষকের কিছু কথা হয়তো পরীক্ষার খাতায় লেখা হয় না, কিন্তু সেগুলো সারা জীবন মনে থেকে যায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শুধু পড়ানো নয়—মানুষ গড়ার কাজ
সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকাতেন না। তিনি শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইতেন।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন সময়ের মূল্য, পরিশ্রমের মূল্য, শৃঙ্খলার গুরুত্ব এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখার প্রয়োজনীয়তা।
একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো বিষয়ে ভালো করতে পারত না, তখন হয়তো শাসন শুনতে হতো। কিন্তু সেই শাসনের মধ্যেও ছিল মঙ্গল কামনা। আবার কেউ একটু ভালো করলে তিনি উৎসাহ দিতেন—আরও ভালো করার জন্য।
শিক্ষকের এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না; একজন প্রকৃত শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্ভাবনাকে দেখতে পান, যখন সেই শিক্ষার্থী নিজেই হয়তো নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে না।
স্যারের শিক্ষাদানের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ছিল ২০০১ সালের ফলাফল। তাঁর কাছে পড়া প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থী সে বছর স্টার মার্কস অর্জন করেছিল। সেই সময়ের বাস্তবতায় এটি ছিল অত্যন্ত বড় একটি অর্জন।
আমাদের অনেকের জীবনে সেটি ছিল স্বপ্নপূরণের মতো একটি মুহূর্ত। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই সাফল্যের পেছনে শুধু আমাদের পরিশ্রম ছিল না; ছিল একজন শিক্ষকের অবিরাম শ্রম, দিকনির্দেশনা ও বিশ্বাস।
আর সেই সময়ের সহপাঠীদের কথা মনে পড়লে স্মৃতির পাতায় একে একে অনেকগুলো নাম ভেসে ওঠে—শান্ত, সুব্রত, অশোক, হুমায়ূন, মুর্তজা, বুদ্ধ, রিপন, রিমা, মৌসুমী, সাথী, সুপ্তি, উর্মি, পারুল, শাহনাজ—আরও অনেকেই।
আমরা তখন ছিলাম একদল তরুণ শিক্ষার্থী। স্বপ্ন ছিল অনেক, কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিততা ছিল খুব কম। আজ আমরা যে যার জীবনে ছড়িয়ে পড়েছি। কেউ পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত, কেউ পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালন করছি, কেউ হয়তো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বা দেশের বাইরে।
কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের স্মৃতির কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে সেই বড় পুলের নিচের কোচিং সেন্টার, আর রয়ে গেছেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক প্রবীর কুমার কর্মকার স্যার।
একজন শিক্ষকের সাফল্য কোথায়?
একজন শিক্ষকের সাফল্য কি শুধু তাঁর কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে, তার ওপর নির্ভর করে?
আমার কাছে উত্তর—না।
একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য হলো তাঁর শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে কেমন মানুষ হয়েছে।
একজন শিক্ষক হয়তো শত শত শিক্ষার্থীকে পড়ান। তাঁদের কেউ ডাক্তার হন, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রশাসনে, কেউ ব্যবসায়, কেউ গবেষণায়, কেউ কর্পোরেট জগতে। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জীবনে যদি সেই শিক্ষক সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করে থাকেন, তাহলে সেই শিক্ষক তাঁর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন।
এই দিক থেকে প্রবীর স্যারের অর্জন অনেক বড়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তাঁর কোচিং সেন্টারের নাম নয়, কিংবা তাঁর পড়ানো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ও নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি মানুষ গড়েছেন।
সময় বদলেছে, স্মৃতি বদলায়নি
সময় অনেক কিছু বদলে দেয়। গঞ্জ–শহর বদলেছে। বড় পুলের আশপাশ বদলেছে। শিক্ষাব্যবস্থা বদলেছে। কোচিংয়ের ধরন বদলেছে। প্রযুক্তি এসেছে। এখন শিক্ষার্থীরা মোবাইল, কম্পিউটার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পড়াশোনা করে।
কিন্তু আমাদের সময়ের সেই ছোট্ট কোচিং সেন্টারের স্মৃতি আজও মুছে যায়নি। কারণ, জায়গাটা বড় ছিল না—মানুষটি বড় ছিলেন।
সেখানে হয়তো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না, কিন্তু ছিল একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা। ছিল শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁর স্বপ্ন। ছিল আমাদের ভালো করার জন্য তাঁর কঠোর পরিশ্রম।
আজ এত বছর পরও সেই স্মৃতি মনে পড়লে মনে হয়—আমরা হয়তো তখন বুঝিনি, কিন্তু আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আমরা এমন একজন মানুষের সান্নিধ্যে কাটিয়েছি, যাঁর কাছ থেকে শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, জীবনের শিক্ষাও পেয়েছি।
শিক্ষক দিবসে ফিরে দেখা
আজ ৫ অক্টোবর—বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
এই দিনটি শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আমাদের জীবনে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আলো জ্বালিয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করারও দিন।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে হয়তো এমন একজন শিক্ষক আছেন, যাঁকে আজও মনে পড়ে। তাঁর কোনো কথা, কোনো শাসন, কোনো পরামর্শ কিংবা কোনো উৎসাহ হয়তো জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
আমার জীবনে সেই মানুষদের একজন হলেন প্রবীর কুমার কর্মকার স্যার।
আজ যখন নিজের পথচলার দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়—জীবনের সাফল্যের গল্পে কিছু মানুষের নাম কখনো বাদ দেওয়া যায় না। কারণ, তাঁরা হয়তো আমাদের সাফল্যের মঞ্চে ছিলেন না, কিন্তু সেই মঞ্চে ওঠার জন্য সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন।
বড় পুলের নিচ থেকে জীবনের বড় পথের দিকে
কখনো কখনো জীবনের বড় শিক্ষা পাওয়া যায় খুব সাধারণ জায়গা থেকে। গঞ্জের বড় পুলের নিচের সেই ছোট্ট কোচিং সেন্টার হয়তো বাহ্যিকভাবে খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সেখান থেকেই আমাদের অনেকের জীবনের বড় পথচলা শুরু হয়েছিল।
সেখান থেকে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে গেছে, কেউ কর্মজীবনে, কেউ নিজের স্বপ্নের পথে। আর সেই যাত্রার শুরুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন শিক্ষক—প্রবীর কুমার কর্মকার স্যার।
তিনি হয়তো আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সব গল্প জানেন না। আমরা হয়তো সবাই নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখি না। কিন্তু তাঁর অবদান আমাদের জীবনের গল্পের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে, যা কোনো দূরত্ব বা সময় মুছে দিতে পারে না।
একজন সত্যিকারের শিক্ষক কখনো অবসর নেন না
একজন শিক্ষক ক্লাস নেওয়া বন্ধ করতে পারেন। একটি কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একটি প্রজন্ম বড় হয়ে দূরে চলে যেতে পারে।
কিন্তু একজন সত্যিকারের শিক্ষক কখনো তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে অবসর নেন না।
আপনার আলোয় আলোকিত আমাদের প্রজন্ম আজও আপনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।