‘পাখিবাড়ি’: হাকালুকির কূলে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়
হাকালুকি হাওরের কূলঘেঁষা গ্রামে, সন্ধ্যা নামলেই আকাশ ভরে যায় পাখির শব্দে। দল বেঁধে ঘরে ফেরে পাখিরা—ঠিকানার নাম বড়লেখার ‘পাখিবাড়ি’। গ্রামটি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত, নাম হাল্লা। এর পাশেই হাকালুকি হাওরের সুবিস্তৃত অঞ্চল। হাওরের তীরে গড়ে উঠেছে পাখিদের আশ্রয়স্থলটি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও প্রকৃতির উদারতায় এটি আজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক অনন্য উদাহরণ।
পানকৌড়ি, নিশি বক, সাদা বক, নীলটুনি, হরিয়াল, দুধরাজ, শালিক, মাছরাঙা, জলকুড়া, সরালিসহ অসংখ্য পাখি দল বেঁধে উড়ে বেড়ায় বাড়ির আঙিনাজুড়ে। বারো মাস এই বাড়ির বাঁশঝাড় ও নানা প্রজাতির গাছে পাখিরা বাসা বেঁধে বসবাস করে। শীত মৌসুমে এখানে ভিড় জমায় অগণিত অতিথি পাখি। প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বাড়িটিতে তিন থেকে চার দশক ধরে পাখিদের অবাধ বসবাস।
‘পাখিবাড়ি’ গড়ে ওঠার গল্প—
গ্রামের মনোহর আলী মাস্টারের বাড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এসে আশ্রয় নিতে থাকে। তাঁর নীরব সহনশীলতায় পাখিরা বাড়ির গাছপালায় বসত শুরু করে। তাঁর সন্তানেরাও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। নিরাপদ পরিবেশ, প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্য এবং মানুষের সহনশীল আচরণ—এই তিনের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে বাড়িটি গড়ে ওঠে ‘পাখিবাড়ি’ হিসেবে।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
‘সন্ধ্যা হয়–চারিদিকে মৃদু নীরবতা/ কুটা মুখে নিয়ে এক শালিখ যেতেছে উড়ে চুপে।’ জীবনানন্দ দাশের লেখা এই পঙ্ক্তিগুলো যেন এখানে চোখের সামনে ধরা দেয়। সারা দিনের ভ্রমণ শেষে সন্ধ্যার আগে নিজ নিজ বাসায় ফিরতে শুরু করে পাখিরা। আবার ভোরের আলো ফুটতেই উড়াল শুরু করে খোলা আকাশে। দল বেঁধে তারা আকাশে আলপনা এঁকে বেড়ায়।
হাওর অঞ্চলের হিজল, করচ, জারুলসহ নানা গাছগাছালির সমন্বয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক ক্ষুদ্র বন। হিজলগাছে ঘুঘুর ডাক সৃষ্টি করে এক অপরূপ মুহূর্ত। করচগাছে পানকৌড়ি ও বকের ঝাঁক মুহুর্মুহু উড়ে গিয়ে জানান দেয় তাদের অস্তিত্বের কথা। পাশে শর্ষেখেতসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করেন স্থানীয় কৃষকেরা—প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক সুন্দর দৃষ্টান্ত।
পাখিদের বিষ্ঠার কারণে ঘরের টিন ও ফলফলাদি নষ্ট হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন বাড়ির লোকজন। তবুও পাখিদের যত্নে তাঁরা নিয়োজিত। নিঃস্বার্থ এই ভালোবাসাই পাখিদের কাছে জায়গাটিকে করে তুলেছে সবচেয়ে নিরাপদ। গ্রামের অন্য বাড়িগুলোতে না গিয়ে পাখিরা এখানেই ফিরে আসে বারবার।
দুর্গন্ধবিহীন ও সম্ভাবনাময় এই পাখিবাড়িকে সরকারি অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এতে পাখিদের বংশবৃদ্ধি ও সংরক্ষণ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র রক্ষা এবং পর্যটনশিল্প বিকাশে এটি হতে পারে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
লেখক: রেজা করিম প্রিন্স, বড়লেখা, মৌলভীবাজার