নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস: চাকরিপ্রার্থীদের কী অপরাধ
‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’—দাউদ হায়দারের এ কথা আমাদের জন্য চিরন্তন সত্য। এ কথা অনেক বেশি সত্য হয়ে যায় এ দেশের লাখো বেকার তরুণদের জীবনে, যখন তারা দেখে, সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রক্সি, ডিভাইস পার্টি, ঘুষ তো আছেই। এ যেন ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা!’
একটা সরকারি চাকরির জন্য যে কতটা পরিশ্রম, ত্যাগ ও অনিশ্চয়তা মধ্য দিয়ে একজন প্রার্থীকে যেতে হয়, তা কেবল যারা পরীক্ষায় বসে, তারা ভালো বোঝে। সেই সঙ্গে পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের চাপের কথা আর নাই–বা বলি। যেমন ধরেন, যুব অধিদপ্তরের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে আমরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে রওনা হলাম। সঙ্গে টিউশনি করে পরীক্ষার জন্য জমানো অল্প কিছু টাকা। রাস্তায় গিয়ে দেখি, প্রচুর পরীক্ষার্থী বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এত পরীক্ষার্থী সচরাচর চোখে পড়ে না। মেয়েদের সংখ্যাও ছিল অন্য যেকোনো পরীক্ষার চেয়ে বেশি। দীর্ঘ একটা সময় বাসের জন্য অপেক্ষা করে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে কিছু মানুষ বসে আর কিছু দাঁড়িয়েই ফিটনেসবিহীন একটি বাসে রওনা হলাম। অনেকে তখনো বাসের জন্য অপেক্ষমাণ। তিন ঘণ্টায় ঢাকা পৌঁছালাম। ইতিমধ্যে কয়েকজন মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে মাথাব্যথা, বমি ইত্যাদিতে। বাস থেকে নেমে আবার পরীক্ষার নির্দিষ্ট গন্তব্যে ছুটে চলা। সেখানে পৌঁছে রাস্তায় বসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করলাম। একটা ব্যাগও ভেতরে নিতে দিল না। বাইরে আবার টাকা দিয়ে ব্যাগ, মোবাইল, ম্যানিব্যাগ রাখা লাগল। এরপর কেন্দ্রে ঢুকে উত্তরপত্র পাওয়ার এক-দুই মিনিট পর শুনি, পরীক্ষা স্থগিত। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে!
ঠিক ওই মুহূর্তে যাদের সঙ্গে কথা হলো, তাদের মধ্য যে কী পরিমাণ রাগ, ক্ষোভ ছিলে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমার নিজেরই মনে হচ্ছিল, যদি দেশটা ছাড়তে পারতাম! অনেকে দেশের দূরদূরান্ত থেকে এসেছে। রংপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা—কোনো জায়গা বাকি নেই। অনেকের থাকার জায়গা নেই। ভোরে পৌঁছে রাস্তায় বসে পাঁচ–ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে। কিছু নারী পরীক্ষার্থী দেখলাম ছোট বাচ্চা নিয়ে কী নিদারুণ বিড়ম্বনা পোহাচ্ছ। আমাদের এই ভোগান্তির দায় নেবে কে? পরবর্তী সময়ে নেওয়া পরীক্ষায় যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা এবার যে আরও বেশি সতর্ক হয়ে অন্য উপায় অবলম্বন করবে না, তা ঠেকানোর নিশ্চয়তাই–বা কে দেবে?
সরকারি চাকরিরতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ধারণা, সব প্রশ্নপত্রই ফাঁস হয়। আমরা হয়তো দু-একটার খবর পাই, যেগুলোর জন্য পরীক্ষা স্থগিত হয়। প্রশ্নপত্র কীভাবে ফাঁস হচ্ছে, কারা জড়িত এগুলো বুঝতে বিজ্ঞানী হতে হবে না। হাজারো আবেদ আলী তার প্রমাণ। কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো, তা যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে। যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য অভিযুক্ত, তাদের মাধ্যমে কী তদন্ত প্রতিবেদন আসবে, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে! তাই নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। তা না হলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করতে আবার নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
আমাদের দেশের একটা মূল সমস্যা হলো, এখানে কোনো সরকারি চাকরিজীবীর চাকরি চলে যায় না। তারা ভাবে, যা–ই করি না কেন, চাকরি যাবে না। আবার বড় কোনো শাস্তিও হবে না। সর্বোচ্চ হলে কিছুদিন অব্যাহতি, শোকজ বা আরেক জায়গায় বদলি হবে। সেখানে গিয়েও তারা আগের কাজকে বজায় রাখবে। বস্তুত এ দেশে একটাও দুর্নীতিমুক্ত জায়গা নেই।
অতএব সরকারকে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে অনতিবিলম্বে নতুন আইন করে যথাযথ ও দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস, ডিভাইস পার্টি, প্রক্সি, ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত এবং যারা এসব পদ্ধতি অবলম্বন করে চাকরি নিয়েছে, তাদের চাকরি থেকে বহিষ্কার ও ফাঁসি চাই। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ফলাফল দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
* মো. মিলন হোসেন, শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]