ফাগুনের ভালোবাসা
প্রিয়,
রাত ১১টা বেজে ৪৮ মিনিট।
লাল নীল বাতির ঢাকা শহর জেগে থাকলেও মফস্সল পুরো ঘুমিয়ে। শুধু স্টেশনের পার্শ্ববর্তী পাঁচতলা হোটেল, গুটিকয়েক রেস্তোরাঁ আর দু-চারটা চায়ের দোকান এখনো খোলা। উঁচু উঁচু গাছ ঘেরা শহরের ঘোর অমাবস্যায় এসব দোকানপাটের আলো বড্ড টিমটিমে লাগছে।
এখন মোটামুটি অফসিজনই বলা চলে। চারতলার হোটেলটায় সব মিলিয়ে হয়তো জনা বিশেষ ট্যুরিস্ট। এরচেয়ে কমও হতে পারে। আমার ডবল বেডের কামরার পাশের বিছানা খালিই আছে। এখনো কেউ আসেনি। থাকলে একটু গল্প করা যেত। টিভিতে মুভি চলছে- ‘Anacondas:hunt for the blood orchids।’ অন্য সময় হলে দেখতাম। কিন্তু এখন দেখতে ইচ্ছা করছে না। কক্ষের নীরবতা কাটাতে হালকা সাউন্ডে টিভি অন করে রেখেছি। আশেপাশে একটু শব্দ না থাকলে রীতিমতো একঘেয়ে লাগে।
মানুষ কত অদ্ভূত তা–ই না? হইচইয়ের নগরী থেকে বারবার দূরে চলে যেতে চায়, কিন্তু আবার নিঃশব্দও বেশিক্ষণ সইতে পারে না!
রাতের মেনুতে ছিল পাহাড়ি মোরগের ঝাল ভুনা আর নদীর ছোট মাছের ঝোল। অসাধারণ স্বাদ! কখনো যদি পাহাড়ে বেড়াতে যাও, তবে এই দুটো আইটেম মিস করো না। ট্রেডমার্ক আইটেম।
থাক—
হলতো অনেক অনাহেতু আলাপ, এবার আসল কথায় আসি—তোমাকে ভীষণ মনে পড়ছে...
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
ট্রেনে আসার সময় রিপ ভ্যান উইংকলের মতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। ঝুমবৃষ্টিতে ঘন সবুজ অরণ্যের সৌন্দর্য ঘোর লাগিয়ে দিয়েছিল। স্বপ্নে বিচরণ করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই।
স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমাকে নিয়ে। অসম্ভব সুন্দর একটা স্বপ্ন.. আমাদের সবুজ নিবাস।
হোটেলে চেক-ইন আর রাতের খাবারের ব্যস্ততা শেষ হওয়ার পর যেই আমি তো সেই আমিই। তোমাকে নিয়ে দেখা স্বপ্নটা আবার জেগে জেগেই দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু জোর করে কি আর স্বপ্ন আসে? তাই তোমাকে আবার চিঠি লেখা।
আচ্ছা, তোমাকে এতগুলো চিঠি দিয়েছি—তুমি আজ পর্যন্ত কোনো উত্তর দাওনি, তাও কেন বারবার লিখি জানো?
পুরোটা হৃদয় দিয়ে যে তোমাকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসলে সেখানে ইগোর কোনো স্থান নেই।
আমার হৃদস্পন্দন যদি কোনো গান হতো, তবে সেই গান আমি তোমাকে শোনাতাম। তখন বুঝতে ভালোবাসলে হৃদয়ের কম্পন কেমন শোনায়..!
এ কম্পন তুমি চোখের আড়ালে থাকলে তেপান্তরের মাঠের ওপারে থেকে ভেসে আসা উইন্ড চাইমের মতো টুংটাং স্বরে বাজতেই থাকে। আর যখন কাছে আসো, তখন বিগবেনের ঘণ্টাধ্বনির মতো গগনবিদারী স্বরে ঢং ঢং আওয়াজ তোলে।
বেড সাইড টেবিলের ওপরে রাখা মগ থেকে ধূমায়িত কফি সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে।
উত্তপ্ত এক কাপ কফি। ক্ষণিকের উষ্ণতা দেবে, কিছুক্ষণ পর হয়তো ঘুম পাড়িয়ে দেবে অথবা সহস্র সেকেন্ড জাগিয়ে রাখবে...
কিন্তু জড়িয়ে থাকার উষ্ণতা দেবে না। একটু উষ্ণতার জন্য যে শুধু তোমাকেই প্রয়োজন...!
তুমি আমার গ্রীষ্মের ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ,
বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি..
শরতের কাশ ফুল
হেমন্তের শিশির।
শীতের রাতের আগুন—
আর বসন্তের কৃষ্ণচূড়া..!
মাঝেমধ্যে তোমার ওপর বড্ড অভিমান হয়। কিন্তু পুষে রাখতে পারি না বেশিক্ষণ। অভিমান কেটে যাওয়ার পরক্ষণেই তোমাকে আরও অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলি..। তোমার জন্য এই ভালোবাসা শিমুলবাগানে একসঙ্গে ফোটা হাজারো ফুলের মতো টকটকে লাল...
কখনো যদি চলে যাই অনেক দূরে, ভালোবাসা থাকবে অটুট চিরকাল।
পুনশ্চঃ যে ছেলেটা তোমাকে চিঠি পৌঁছে দেয় ও যদি সময় ঠিক রাখে, তো আজ পহেলা ফাল্গুন। ভালোবাসার দিন। একরাশ ভালোবাসা শুধু তোমার জন্য।
ভালো থেকো।
ইতি তোমার
‘আমি’